ঢাকা: আজ ২৮ জুন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৭৩তম জন্মদিন। ১৯৪০ সালের এ দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও তিনি জন্মদিন পালন করেন না। দিবসটি এখন সামাজিক ব্যবসা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তিনি ‘গরীবের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিতি। তিনিই ক্ষুদ্রঋণের জনক। সেইসাথে প্রথম নোবেল জয়ী বাংলাদেশি।
‘দুনিয়ায় কেউ গরীব থাকবে না, গরীব না থাকাই মানুষের অধিকার’- এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রো ক্রেডিটের জনক হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত।
বরাবরের মতো জন্মদিন ঘিরে বিশেষ কোনো আয়োজন থাকছে না এবারও। জন্মদিনে কাজের মধ্যেই থাকবেন তিনি। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সামাজিক ব্যবসায় দিবসের আয়োজনে তিনি ব্যস্ত থাকবেন পুরো দিন। সকালে সাভারের গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিনি এর উদ্বোধন করবেন। দুটো সেশনে আলাদাভাবে বক্তব্য রাখবেন। জবাব দেবেন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া দেশি- বিদেশিদের বিভিন্ন প্রশ্নের।
তারপরেও কাজের ফাঁকেই পরিবারের সদস্যরা, গ্রামীণ পরিবার ও তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন তাকে।
পরিবারে স্ত্রী অধ্যাপক আফরোজী ইউনূস ও কন্যা দীনা আফরোজী ইউনূসকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরেই তার বসবাস। বড় মেয়ে মনিকা ইউনূস আছেন নিউইয়র্কে। বর্তমানে ইউনূস সেন্টারের হয়ে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন তিনি।
সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও বিজ্ঞানের প্রতি ইউনূসের ঝোঁক ছিলো। লামারবাজার অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে থাকতেই তেরো বছর বয়সে বয় স্কাউটের জাতীয় সমাবেশ- জাম্বুরিতে যোগদানের জন্য ১৯৫৩ সালে করাচি যান। বয়স্কাউট হিসেবে ১৯৫৫ সালে কানাডা ও ১৯৫৯ সালে ফিলিপাইন ও জাপান সফর করেন।
১৯৫৫তে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে ‘দু’পাতা’ নামে একটা লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা শুরু করেন। এ সময় তিনি কলেজের ‘সম্মিলিত ছাত্র প্রগতি সংঘের’ নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন । এ সময়ে তিনি উচ্চ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হন। অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদের সংস্পর্শে আসেন।
১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।
১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় শিল্পজাত দ্রব্যের জন্য আবশ্যক প্যাকেজিং সামগ্রীর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য একটি প্যাকেজিং শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যা সেই সময়ে প্যাকেজিং সামগ্রির চাহিদা মেটাতে অনেকটা সক্ষম হয় এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি উচ্চশিক্ষার জন্য ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান এবং ভেন্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। আমেরিকায় থাকাকালীন তিনি কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় ও মধ্য টেনেসি রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতায় নিযুক্ত থাকেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আমেরিকায মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আত্মনিয়োগ করেন। অর্থ সংগ্রহ আন্দোলন, প্রচারণা ও জনমত গঠনে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ নাগরিক সমিতির সচিব ও দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রকাশিত সংকলন সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন।
উচ্চতর লেখাপড়া এবং অধ্যাপনার সুবাদে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশের দেওয়া সুযোগ ও আকর্ষণীয় সুবিধাও সে দেশে তাঁকে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করতে পারে নি। ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে আসেন।
১৯৭২ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন। অফিসে পত্রিকা পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ না থাকায় কর্মহীন দিনগুলো কর্মপাগল ইউনূসকে ব্যথিত করে তোলে। এক পর্যায়ে কমিশনের দায়িত্বে ইস্তফা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে তিনি চলে যান চট্টগ্রামে।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তার ভাবনাকে বদলে দেয়। তার কথায়, ‘যখন ফিরে আসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তখন দেশে দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে আমাদের নানা আকুতি। আমরা জোবরা গ্রামকে দুর্ভিক্ষমুক্ত রাখার জন্য কাজ শুরু করলাম। শস্য ফলানোর চেষ্টা করলাম। তেভাগা খামার বানালাম। সেই জোবরা গ্রামেই জন্ম গ্রামীণ ব্যাংকের। শুরু হয় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই।
১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ব্যাংক। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনে প্রকল্পটি টাঙ্গাইলের সুরুয গ্রামে সম্প্রসারণ ঘটে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)-এর আর্থিক সহায়তায় ১৯৮২ সালে প্রকল্পটি ঢাকা, রংপুর এবং পটুয়াখালী জেলায় সম্প্রসারিত হয়।
সাফল্যের সাথে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পটিকে গ্রামীণ ব্যাংক নামকরণ করে একটি বিশেষায়িত ঋণদান প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সে অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ জারি করা হয় এবং একটি স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
বাংলাদেশের এই সন্তানের হাত ধরেই ১৯৮০ সালের পর ডিকশনারিতে যোগ হয় ‘micro-cradit’ শব্দটি। ড. ইউনূসের এ ক্ষুদ্রঋণতত্ত্বের সাফল্য গাঁথাকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘ ২০০৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ’ হিসেবেও পালন করে।
নিজ কর্মগুণে ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে সারাবিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশও গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বীকৃতি হিসেবে নিজ প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ড. ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক প্রেসিডেন্ট মেডেল অব ফ্রিডমসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
দিনে দিনে ড. ইউনূস হয়ে উঠলেন বিশ্বজয়ী ক্ষুদ্রঋণের স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রায়োগিক অর্থনীতির রূপকার একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিলে যাঁকে একদিন অনেকেই ‘পাগল’ সম্বোধন করতেও দ্বিধা করে নি, তাঁরাই চোখ কপালে তুলে হাঁ করে দেখতে লাগলো কীভাবে কালে কালে ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠলো ড. ইউনূসের স্বীকৃতির ঝুলি।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮’শ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ক্যামব্রিজ প্রোগ্রাম ফর ইন্ডাস্ট্রির (সিপিআই) ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা তালিকায়ও বিশ্বের ৫০ জন অগ্রণী চিন্তকের অন্যতম চিন্তক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ।
দারিদ্র্য দূর করার সংগ্রামে এত স্বীকৃতির পরও থেমে যাননি। নিরলসভাবে একের পর এক আর্থ-সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন। দারিদ্র্যের মৃত্যু ঘটানোর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। আশাবাদী ইউনূস মনে করেন ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্বের প্রথম দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। কেউ দরিদ্র নয়, কিংবা দরিদ্ররা দারিদ্র্যের জন্য দায়ী নয়। আসলে প্রতিটি মানুষই উদ্যোক্তা।`’
বাংলাদেশ সময়: ০৯৪০ঘণ্টা, জুন ২৮, ২০১২
এমআইআর/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com