আমার বা আপনার বলতে এ পৃথিবীতে কিছুই নেই। আমাদের অস্তিত্ব থেকে শুরু করে এ মহাবিশ্ব এবং এ দুয়ের মাঝে যা কিছু রয়েছে সবই পরম শক্তিমান স্রষ্টার একচ্ছত্র মালিকানাধীন। তিনি তার ইচ্ছা মতো সৃষ্টি করেন, সময় হলে তাঁর হুকুমেই সব আবার শূন্যে মিলিয়ে যায়।
আমাদের বেঁচে থাকা তাই মহান আল্লাহর সামান্য হুকুমের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমাদের থাকা না থাকা সবই তাঁর ইশারার অপেক্ষমান। মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব। আপন কুদরতি হাতে তিনি বনী আদমকে (মানুষ) সাজিয়েছেন, সব ফেরেশতাকে ডেকে প্রথম মানব আদম আলাইহি ওয়া সাল্লামকে (আ.) সিজদা করিয়েছেন সম্মানার্থে। যে সিজদা করেনি, সেই অভিশপ্ত শয়তানকে তাড়িয়ে দিয়েছেন দরবার থেকে, কারণ তিনি মানুষকে ভালোবাসেন।
আজ কি লজ্জাজনক কলঙ্ক আমাদের, স্বয়ং যে আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে আমাদেরই অপমান সহ্য করতে না পেরে এতোকালের ইবাদতকারী শয়তানকে তাড়িয়ে দিলেন নিজের দরবার থেকে, আর আমরা সেই শত্রুকে ভালোবেসে পালিয়ে বেড়াচ্ছি পরম দয়াময়ের আশ্রয় থেকে। এমন স্বার্থপরতা আর নাফরমানী দেখেও আমাদের বিনাশ না করে অপেক্ষায় থাকেন মহান স্রষ্টা করুণাময়, এর চেয়ে কে আছে আর বড় দয়াময়?
আমাদের অপরাধ আর অবাধ্যতাকে তিনি মাফ করে দেন অবলীলায়, সামান্য তওবায় তিনি আমাদের আবার কাছে টেনে নেন- এ কথা সত্য। তবে কিছু অপরাধ এমনও রয়েছে যাতে তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হন, তাঁর দরবারে এ অপরাধগুলো অমার্জনীয় হয়ে থাকে। এসব গুনাহের মধ্যে রয়েছে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, মা-বাবার সাথে অবাধ্যতা, নিজের আত্মার প্রতি অবিচার।
আত্মার প্রতি অবিচারের অনেকগুলো ধরনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়টি হচ্ছে আত্মহত্যা। মানুষ যেখানে তার সামান্য আঙুলের নখেরও মালিক নয়, সে কিভাবে নিজেকে ধ্বংস করার সাহস পায়? সে কি এ পৃথিবীতে নিজের ইচ্ছায় এসেছিল যে নিজের সিদ্ধান্তে সে এ পথ বেছে নিল? এসব কারণেই আত্মহত্যা ইসলামী শরীয়তে সর্বসম্মতভাবে হারাম এবং অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য।
আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারা ১৯৫ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা। অন্য আয়াতে তিনি বলেছেন,ÔÔতোমরা নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য বড় দয়াবান। (সূরা নিসা-২৯)
বুখারী শরীফের ৫৪৪২ ও মুসলিম শরীফের ১০৯ নং হাদীসে রাসুল (সা.) বলেছেন, পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে যদি কেউ আত্মহত্যা করে তবে চিরকাল সে জাহান্নামে এভাবেই লাফ দিয়ে দিয়ে জ্বলতে থাকবে। যদি কেউ বিষপান করে আত্মহত্যা করে তবে জাহান্নামেও সে চিরকাল বিষপান করতে থাকবে..।
এমনিভাবে এর পরবর্তী হাদীসে তিনি বলেছেন, যে এ পৃথিবীতে কোনো বস্তুদিয়ে নিজেকে আঘাত করে আত্মহত্যা করে সে জাহান্নামেও অনুরূপ কাজ করতে থাকবে। সুতরাং তার শাস্তি দ্বিগুণ হয়ে গেল। জাহান্নামের আগুন তো রয়েছেই, এর সাথে সে যেভাবে আত্মহত্যা করেছে তা সে করতেই থাকবে জ্বলন্ত অবস্থায়।
বুখারী শরীফের ৩২৭৬ ও মুসলিম শরীফের ১১৩ নং হাদীসে পূর্ববর্তী উম্মতের এক ব্যক্তির ঘটনা রাসুল (সা.) বর্ণনা করে সবাইকে সতর্ক করে দিচ্ছেন,তাদের এক লোক দুঃখ ও বিপদে জর্জরিত হয়ে একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে নিজের হাত কেটে ফেলল, তারপর রক্ত বের হতে হতে সে মরে গেল। আল্লাহ পাক তখন বলে উঠলেন, আহা! আমার বান্দা আমার চেয়েও বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলল। তার জন্য তো জান্নাত হারাম হয়ে গেল|
রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় কোনো আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির জানাজা নামাজ পড়াতেন না। যাতে এর ভয়াবহতা সবাই অনুধাবন করে এবং এমন অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। তবে তিনি অন্যদের অনুমতি দিয়েছেন তারা যেন তার জানাজা নামায আদায় করে নেয়।
আজকাল পত্র-পত্রিকায় অহরহ যেসব আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে, এসবের অধিকাংশের মূলে থাকে প্রেমে ব্যর্থতা কিংবা সংসারের অশান্তি। ঋণের দায় কিংবা অপমানেও কেউ কেউ এ পথ বেছে নেয়। কারণ যাই হোক, আত্মহত্যা কখনোই প্রকৃত সমাধান নয়। ক্ষণিকের উত্তেজনায় চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা ও জাহান্নামের যাত্রী হওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আমাদের এ ক্ষণস্থায়ী জগত সংসারে দুঃখ ও বিপদাপদ তো আসবেই। এসব তো আমাদেরই কৃতকর্মের ফল। আত্মহত্যার পথে না গিয়ে আমাদের উচিত সমস্যাটির উৎসমূল নিয়ে ভাবা এবং এর সমাধানের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। জীবনের প্রতি যার কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই, নেই সামান্য ধৈর্য ও সাহসী মনোবল, এমন ভীরু কাপুরুষরাই কেবল বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। এতেই কি তার সমাধান হচ্ছে? বরং সে যেন কড়াই থেকে এবার উনুনে ঝাঁপ দিল। আসল দুঃখের এইতো শুরু।
নিরাশা আর হতাশা কিংবা অপমান থেকে আত্মহত্যার কুমন্ত্রণা মনে আসে। কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের চিরশত্রু শয়তান এসব নিয়ে মানুষকে উসকে দেয় যাতে সে জান্নাত থেকে চিরবঞ্চিত হয়। তাই এ ধোঁকায় না পড়ে তখনই দুই রাকাত সালাত আদায় করুন, আল্লাহর কাছে খুলে বলুন সবকিছু, অসহায় বান্দার ডাকে সাড়া দিতে ভালোবাসেন বলেই তিনি রহীম ও রহমান নাম ধারণ করেছেন।
পবিত্র কুরআনে তিনিই তো বলেছেন, (আল্লাহ ছাড়া) “আর কে আছে যে এমন আর্ত ও দুঃখীর ডাকে সাড়া দেয় এবং তার বিপদকে সরিয়ে দেয় (সূরা নামল-৬২)
তাতেও যদি মনে সান্তনা না আসে তবে কোনো নেক ও আল্লাহওয়ালা বুযুর্গের কাছে গিয়ে বসুন, তার সাথে পরামর্শ করুন। আল্লাহ পাক বিপদাপদের সাথে এর সমাধানও রেখেছেন, তাই ধৈর্য ধারণ করাই বুদ্ধিমানের পরিচায়ক।
কিছু বিষয়ে আমাদের সমাজে ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। সেসব নিরসনে আমাদের জানা থাকা প্রয়োজন, আত্মহত্যা করা কুফুরি নয়, তবে এর শাস্তি অনেক ভয়াবহ। একমাত্র আল্লাহ পাকের দয়া ছাড়া তার মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।
আত্মহত্যাকারীর জন্য দুআ করতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং তার পরিবার ও স্বজনদের উচিত বেশি বেশি দুআ ও মাগফিরাত কামনা করা, হয়তো আল্লাহ পাক তাকে মার্জনা করবেন। আর ফেকাহর কিতাবসমূহে সমাজের গণ্যমান্য ও আলেমদের আত্মহত্যাকারীর জানাজায় না যেতে যে কথা বলা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য হল অন্যদের সতর্ক করা, অন্য কিছু নয়।
লেখক- কাতার করেসপন্ডেন্ট
tamimraihan@yahoo.com
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা
bn24.islam@gmail.com