সমস্ত বাঙালি জাতি আজ শোকে মুহ্যমান। তাঁর ভক্ত পাঠকদের মধ্যে আজ হাহাকার। কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না, তাদের প্রিয় লেখক আর তাদের জন্য লিখবে না। তাঁর আত্মা মিশে গেছে নক্ষত্রের অনন্ত বিথীতে। তাঁর লেখা ‘মেঘের উপর বাড়ি’তে যেন হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জনপ্রিয়তম, জীবনবোধশ্রেষ্ঠ লেখক হুমায়ূন আহমেদ গত ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০মিনিটে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলা ভাষার প্রতিটি মানুষের বুকে আজ শোকের মাতন। প্রতিবছর আমরা যারা তাঁর বইয়ের প্রতীক্ষায় থাকতাম, তাদের জন্য তিনি আর লিখবেন না। আমরা বিশেষ বিশেষ দিনে তাঁর নাটকের জন্য অপেক্ষা করতাম। তিনি আর আমাদের জন্য নাটক বানাবেন না। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কবি’, ‘উড়ে যায় বক পক্ষি’র মত নাটক আমরা আর দেখতে পাব না। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’র মত চলচ্চিত্র আমাদের জন্য আর কেউ বানাবে না।
গোটা জাতির সাথে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেছিলেন এক আশ্চর্য নাড়ির সম্পর্ক। তিনি একা থাকতে পারতেন না, একা কখনো খেতে পারতেন না। মানুষের সঙ্গ ছিল তাঁর অতি অতি প্রিয়। প্রিয় ছিল আড্ডা। আজ তিনি চলে গেছেন মানুষের সকল সঙ্গপ্রিয়তার উর্ধ্বে।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে ইতিবাচক দিকগুলো বেশি থাকতো। তিনি সব সময় মানুষের সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে চাইতেন। চাইতেন নেতিবাচক দিকগুলো এড়িয়ে যেতে। সুন্দরের অন্বেষণ ছিল তার সারা জীবনের প্রচেষ্টা। জোছনার এক নিটোল নকশা সারা জীবন ধরে তিনি তৈরির চেষ্টা করে গেছেন।
আমাদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো। নিলু, বিলু, জরি, আনিস, হিমু, শুভ্র, মিসির আলি প্রভৃতি চরিত্রগুলো সব সময় মনে হত আমাদেরই কেউ না কেউ। তারা বিশেষ কেউ না, ইতিহাসের কেউ না। তাই তিনি ক্রমশঃ হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের হৃদয়ের মণি। এভাবে হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিগত ভাবে হয়ে উঠেছেন আমাদেরই অতি কাছের একজন।
আমি কেন হুমায়ূন আহমেদের অসুস্থতা নিয়ে বিচলিত? আমার মেয়ে জানতে চাইল। তাকে বললাম, ‘মা, এই মানুষটির লেখালেখির হাত ধরে আমরা বেড়ে উঠেছি। তাঁর বোধের অংশীদার আমরা। এই মানুষটির প্রভাবে আমাদের ভিতরটা কমবেশি গড়ে উঠেছে। তাঁকে সব সময় মনে হয় স্বজন কেউ।’ জানি না, ও বুঝলো কিনা।
কোলকাতার লেখকদের বই অনেকদিন থেকে বাংলাদেশের বইয়ের দোকানে রাখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এই হুমায়ূন আহমেদের লেখনীর কারণে। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এই একটি মানুষের কারণে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। অসাধারণ সব বই বের হচ্ছে এখন বাংলাবাজার থেকে। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তাদের ভরসার জায়গা। বাংলাদেশের সমস্ত তরুণ লেখকদের সামনে হুমায়ূন আহমেদ আজকে আইডল। তরুণরা তাঁর মতই সহজ-সরল গদ্যে লিখছে।
প্রিয় পাঠক, আসুন, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আত্মার শান্তি কামনা করি।
বাংলাদেশ সময়: ১২৫০ ঘণ্টা, ২১ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস