১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শুক্রবার মে ২৪, ২০১৩ ৮:২৫ পিএম BDST banglanew24
06 Sep 2012   03:34:16 PM   Thursday BdST
E-mail this

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর-এর গদ্য

গল্পে আমার বিরামচিহ্ন


কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
গল্পে আমার বিরামচিহ্ন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর-এর গদ্য

গল্পের সৃজনশীলতার সনে বিরামচিহ্নের কতিপয় মিত্রতা কিংবা শত্রুতা রচিত হয়— স্বভাবতই তা যাচাইয়ের বাসনা হয়। কেন হয়, এখানে তার কারণ অংকের ফর্মুলা মেলে বলা মুশকিল। তবে তা আমার মনোজগতে গোঁয়ারের মতো, প্রবল তৃষ্ণার্তের মতো ঘুরঘুর করে। এর পাল্টা কেউ বলতেও পারেন, জগতের এতকিছু থাকতে বিরামচিহ্নের প্রতি এমন মনোবাসনার কারণ কী? আসলে প্রথামুখর বিরামচিহ্নের সাথে আমাদের মনোষ্কামের, অন্তত সৃজনউন্মুখতার একটা বৈরি ভাব যেন আছে। যারা সৃজনশীলতার সাথে থাকতে চায়, তাদের সাথে জগতের যাবতীয় শৃঙ্খলার, প্রতিষ্ঠানের, আইন-কানুনের একটা নিত্য-বোঝাপড়া আছে। প্রকাশ্যে না হোক, অগোচরে কিংবা মনের অজান্তেই এসব দেখে নেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। এতে ভুলে থাকার একটা বিষয়ও থাকতে পারে। কারা ভুলে থাকবেন? কারা আবার, যারা ভুলে থাকাকেই বড়ো বেশি দরকারি কাজ মনে করেন। এই যেমন, আমরা যে বিরামচিহ্ন ব্যবহার করি, তা কি নিয়মসিদ্ধ জাতপাতমুখর কিনা এ প্রশ্ন আসে? আমরা কি এমন প্রশ্ন করতে পারি? কার কাছে করবো, যারা নিয়ম-কানুন বানায়, যারা সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের মতোই এইসব ব্যবহারের নিয়ম বাতলান তাদের কাছে কি এ প্রশ্ন হতে পারে? বিষয়টাকে খোলাসা করেই বলি, এই যে সৃজনশীলতার সাথে জড়িত-জন তারা কি মননশীল-জনদের মতো যতিচিহ্ন ব্যবহার করতে পারেন? এটা কি আদৌ কোনো ভাবনার বিষয় কিনা তাও ভেবে দেখার ব্যাপার।

আমরা যদি বিরামচিহ্ন ব্যবহারের ইতিহাস দেখি, ব্যাকরণে পাঠ নিই, ব্যাকরণবিদদের লক্ষ্য করি, তা হলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিরামচিহ্ন ব্যবহারে সৃজনশীল সাহিত্যের জন্য যেন কোনো নিয়ম নেই, এর কোনো বিধিবদ্ধ বাসনা নেই, যা আছে তার নাম একাডেমিক কিছু কায়দা-কানুন। সেই স্থানে সৃজনশীলতার বিষয়টাকে চৈতন্যেই রাখা হয়নি। আচ্ছা, সৃজনশীলতার সাথে প্রতিষ্ঠানের কোনো কাইজা-ফ্যসাদ আছে? সৃজনশীলতাকে বেজন্মা কোনো অস্তিত্ব মনে করা হয় না তো! এই প্রশ্নটি কেন আসছে, আসছে এ জন্য যে ভাষাচর্চার সবচেয়ে বড়ো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলা একাডেমি, সেখানে তো সৃজনশীলতার মৌলিকত্বের কোনো স্থানই নেই! এমনকি একে বলা হয় জাতির মননশীলতার প্রতীক! এই যে আমরা এখানে বিরামচিহ্ন নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলতে চাই, তা যে পুস্তকে সবচেয়ে শৃঙ্খলার ভিতর আলোচনা করা হয়েছে এর নাম প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। এখানে কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধের আকারে দুই খণ্ডের প্রমিত ভাষার একটা ব্যাকরণগ্রন্থ সঙ্কলিত করা হয়েছে। আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি, ওইখানকার লেখকদের ভিতর তেমন একজনও সৃজনউন্মুখ জন নেই। আমি এখানে এ আলোচনা করব না যে ব্যাকরণের যে সমাজ-সত্য নিয়ম ব্যক্তির নামে হয়, সেখানে কয়েকজনের চেষ্টায় তা হয়নি; অনেকজনের কাজকে সমন্বয় করে একটা ব্যাকরণ গ্রন্থ বলে বাজারজাত করা হয়েছে। এটা আমার চৈতন্যে আসে না। আলাদা আলাদা ব্যক্তির সার্বভৌম প্রয়াসকে সমন্বয় কী করে করা যায়! তাতে কি ব্যক্তিসাধনা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় না। যাই হোক, যতিচিহ্ন ব্যবহারের একটা ঐতিহ্যও আছে। একসময় ব্যাকরণ নিয়ে প্রথাগত কাজ করেছেন কয়েকজন। তবে একটা সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবিঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখরা ব্যাকরণে আধুনিক রূপ আনতে চেয়েছেন, একে সংস্কৃত-ইংরেজি-ফারসি-উর্দু-পর্তুগিজ প্রভাবমুক্ত করার কথা বলেছেন।

প্রায় ঐতিহ্যনির্ভর একাডেমিমুখী একটা ধারণা আমরা বাংলা একাডেমির প্রমিত ভাষার ব্যাকরণে পাই। এমনকি প্রথম আলো আর আনন্দবাজার প্রকাশনা’র (তাদের এ সংক্রান্ত প্রকাশনার কাজকে কার্যত সাংবাদিকতার কাজকে মনে রেখেই করা হয়েছে) যে নিয়ম-বিধির নমুনা পাই সেখানেও যতিচিহ্ন ব্যবহারের কোনো সৃজনশীল রূপ আমরা পাই না। কেন পাই না? এর কোনোই প্রয়োজন নাই! অবশ্যই আছে; এবং আছে বলেই এরই ধারাক্রমে কিছু কথা বলতে চাই। এসব স্বভাবতই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপের সমাহার হবে না; বরং বিরামচিহ্ন  নিত্যব্যবহারে কী ধরনের অনুভূতি, মেজাজ, আবহের সামনে দাঁড়াতে হয় তাই বলে যাবো।

নৈঃশব্দ্যের যেমন ইতিহাস আছে, নিজেকে বদলে বদলে একটা ফর্মে দাঁড় করানোর ইতিবৃত্ত আছে, তেমনি বিরামচিহ্নেরও ইতিহাস আছে। বিরাম শুধু শব্দের ভিতর, বাক্যের শেষেই নাই; প্রতিটি শব্দ এমনকি ধ্বনির গহ্বরে থাকে। আমরা যাবতীয় ধ্বনি বা শব্দ তো একনাগাড়ে উচ্চারণ করি না। তাতে গ্যাপ দিই, যাতে তার ভিতর অর্থ থাকে। ধ্বনির অর্থময়তার সমষ্টিতেই তো ভাষার সৃজন হয়। এই ভাষাব্যবহারের কৌশলেই মনুষ্যপ্রজাতি মানব হয়ে উঠেছে। মানুষতা তাহলে ভাষার ভিতর দিয়ে লালন করা এক সত্তার নাম! ভাষা আমরা ব্যবহার করি নিজেকে পূর্ণ করে-করে জীবন যাপিত করার জন্য। নিজেকেও যথার্থ করে ব্যবহার করার জন্য। ভাষার ভিতর দিয়ে আচরণকে আমরা বহন করি। আমরা কিছু করতে চাই, মানুষের সাথে, প্রকৃতির সাথে, এমনকি সৃজনকর্তার সাথে একধরনের রিলেশন আমরা গড়তে চাই। আমরা মানুষতা বহন করতে চাই। এই চাওয়াকে পরিপূর্ণ করে শব্দ বা ধ্বনির ভিতর চালু থাকা নীরবতা বা বিরামচিহ্নের ব্যবহার। যত কথা আমরা সরবে বলি, তারচেয়ে অনেক বেশি বলি নির্জনে। সেই ভাষাও বিরামচিহ্ন ব্যতীত হয় না।
 
এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে গাঙের ঢেউয়ের মতো সমস্ত বিরামচিহ্ন একই তালে কবুল কবুল বলে বাক্যের অন্তর্জগতে ঠাঁই নিয়েছে। ভাবনাকে বহন করার জন্যই এরা একে একে শব্দের ভিতরে ভিতরে জায়গা করে নিচ্ছে। যখন মুদ্রিত শব্দের ভিতর পয়ারের অন্তর্জগতে বিরামচিহ্নের ব্যবহার আমরা দেখি তখন শুধু দাঁড়ি (।) আর ডাবল দাঁড়ি (॥) ছিল। ডাবল দাঁড়িতে সাধারণত প্রশ্ন আর বিস্ময়কেই ধারণ করত। সেই ডাবল দাঁড়ি কিন্তু দুইটা দাঁড়ির চেহারা নিয়ে অবস্থান করত না; অনেকটা দাঁড়ির ছলনার মতো, গাঙের মতো বা রমণীর প্যাঁচানো শরীরের মতোই এঁকেবেঁকে চলত। তখন মনে করা হত সাহিত্য মানেই পদাবলীর ভিতর বিরাজ করা কাব্যজগৎ। সেই সময় বদলে যাওয়ার ফলে ইংরেজি সাহিত্যঘেঁষা ভাষাকৌশল প্রত্যক্ষ  করতে থাকি। নানান বিরামচিহ্ন আমাদের সাহিত্যজগতে ভিড় করতে থাকে। প্রশ্নচিহ্ন (?), বিস্ময়চিহ্ন (!), কমা (,), সেমিকোলন (;), কোলন (:), ড্যাশ (—), হাইফেন (-), কোলন-ড্যাশ (:–), সেমিকোলন-ড্যাশ (;–) বন্ধনী (({[]})), ক্রমাগত-বিন্দু (...), ডট (.), বিকল্পচিহ্ন (/), উদ্ধৃতিচিহ্ন (“”/‘’), ঊর্ধ্বকমা বা অ্যাপস্ট্রফি (’), টীকাচিহ্ন (*) ব্যবহার করে থাকি। এখন আবার কম্পিউটারে কম্পোজের সুবাদে যন্ত্রের কিছু আব্দার গ্রহণ করি। এর ভিতর সবচেয়ে ব্যবহার্য ধারণা হচ্ছে, ইটালিক, বোল্ড, নিম্নরেখা। আবার ব্লগ বা ফেসবুক নামের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সাঙ্কেতিক ভাষাও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

এ প্রশ্ন অতি স্বাভাবিকভাবেই আসে যে এইসব চিহ্ন কিভাবে কোথায় কেন ব্যবহার করতে হবে তা তো ভাষার নানাধরনের প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থ বা দপ্তরে নিত্য দেখা যাচ্ছে। তবে এর সবকটিই হয় একাডেমিক কাজের ধরনে নয়তো সংবাদপত্র বা বিভিন্ন মিডিয়াই একেবারে তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন একাডেমি তো তাদের গৎবাঁধা ফর্মুলায় তা ব্যবহার করছে। আর প্রিন্ট বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার লক্ষই থাকে তার পাঠক বা দর্শকের চোখের আরামকে আরও সৌকর্যমণ্ডিত করা। পাঠকের মন-মেজাজকে অতি-সরলীকরণে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিরামচিহ্নের অতি সরল ব্যবহারই তাদের কাম্য। কিন্তু সবচেয়ে যে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বা নিত্যআবিষ্কারের ধরনে যা ব্যবহার করা হয়, সেই ক্ষেত্র হচ্ছে সৃজনশীলতার প্রকৃত-জায়গা। সেই জায়গাতেই বিরামচিহ্নকে ব্যবহার করার বাসনা কিভাবে জাগতে পারে তাই নিয়ে আমাদের কিছু কথাবার্তা হবে।
 
বিরামচিহ্নের প্রথাগত নিয়মের বাইরে বিকল্প ব্যবহারের কিছু বিষয়ে আমি উদাহরণসহ উল্লেখ করব। কমলকুমারের অন্তজলী যাত্রার প্রারম্ভেই তিনি নিজে একটা ভূমিকার ধরনে কথাবার্তা বলেছেন— এর প্রথম প্যারাগ্রাফটি এরকম—
‘এই গ্রন্থের ভাব বিগ্রহ রামকৃষ্ণের, ইহার কাব্য বিগ্রহ রামপ্রসাদের। রামপ্রসাদ আমাদের শুদ্ধ মন আনিয়া দেন॥ মা আমারে দয়া করে শিশুর মতো করে রেখো॥ অথবা॥ যে দেশে রজনী নেই মা॥ অথবা॥ কেলে সর্ব্বনাশী আমায় সন্ন্যাসী করেছে॥ — এ সকল কাব্যে তিনি ব্যক্ত।’

উপরের বাক্যসমূহে আমরা বিরামচিহ্নের ব্যবহার দেখে চমকে উঠছি। কারণ চমকে উঠায় আমাদের অধিকার আছে। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠানই আমাদেরকে অর্পণ করেছে। ডাবল দাঁড়ি আর প্রলম্বিত ড্যাশ (ড্যাশ আবার তিনজাতের হতে পারে, ১. স্বল্পায়ু— যা হাইফেনের প্রায় দ্বিগুণ হয়, ২. মধ্যআয়ু— যা হাইফেনের প্রায় চার গুণ হয়, ৩. দীর্ঘায়ু— যা হাইফেনের প্রায় ছ’গুণ হয়।) যেভাবে তিনি বিরামচিহ্নের ব্যবহার করলেন তা সময়কে যেমন অস্বীকার করা হয়েছে তেমনি ব্যাকরণ সম্মতও হয়নি। অন্তত অতি সম্প্রতি বাংলা একাডেমি প্রযোজিত প্রমিত ভাষার ব্যাকরণ তাই সাক্ষ্য দেয়। তাহলে এখন কেউ যদি কমলের ভাবকে বহন করতে চায়, তার নামে কি রুল-নিশি জারি হবে? তাকে কি কোর্ট-কাছারির মোকাবেলা করতে হবে! অথবা আমরা যদি কমলকুমারের সুহাসিনীর পমেটম পাঠ করি, তাতে আরও ক্ষিপ্ত হতে পারি। সেই ক্ষিপ্ততার অধিকার তো আমাদের আছে। কারণ সারাটি গ্রন্থে তেমন কোনো বিরামচিহ্নই ব্যবহার করা হয়নি। তাহলে এমনতর প্রথামুখর চরিত্রহীন গ্রন্থ নিয়ে কী করব! সেখানে দৃশ্যত কোনো বিরামচিহ্নই নেই, তবে আমাদের ধারণা, অভ্যাসবশত আমরা কতিপয় চিহ্ন প্রয়োগ করে-করেই এটির পাঠ সমাপণ করি। এখানে পাঠকের সৃজনশীলতা রচিত হল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কেন পাঠককে এমন অদ্ভুত স্বাধীনতা দিবেন! সৃজনশীল সাহিত্যের আমার তো সবচেয়ে ঘাতক মনে হয় দাঁড়িকেই। মনে হয় আমার সৃজনশীলতাকে কখনও কখনও বেকায়দায় ফেলে এ চিহ্নটি। এমনকি আমার ইচ্ছা করে সৃজনশীল সাহিত্যজগতে একে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। কারণ ভাবনাকে খণ্ডিত, ম্লান, বিধ্বস্ত করার ব্যাপারে এর ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। চিহ্ন নিয়ে অনেকেরই অনেক ধরনের নেশা আছে— যেমন, মামুন হুসাইন তো ই-প্রত্যয়ের আগে হরহামেশাই একটা হাইফেন বসান। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ প্রমিত রীতির ক্রিয়া, যেমন : করে, বনে, ধরে, ইত্যাদির ঘাড়ে ক্রমাগত উর্ধ্বকমা চড়ান।

আমি যে চিহ্নটিকে ব্যববহারে সবচেয়ে ক্লান্ত-হতচকিত এমনকি বিরক্ত হই, সেটি হচ্ছে কোলন। এটিকে রাখার কোনো জায়গাই আমি করতে পারি না বা করতে যেন চাইও না। বিস্ময়চিহ্নই আমার প্রিয় চিহ্ন। আর যে চিহ্নটি ব্যবহারে সবচেয়ে আরাম পাই সেটি হচ্ছে ড্যাশ। মাঝারি মাপের, অবয়বে মাঝ-আকৃতির ড্যাশ, যেটি হয়ত মধ্যবিত্তের চলনও বহন করে, সেটিই বেশি মাত্রায় ব্যবহারের বাসনা হয় আমার। কিন্তু তা তো হয় না, কারণ এর চরম প্রতিদ্বন্দ্বী সেমিকোলন আর কমা প্রায়শই এর জায়গাটি নিয়ে নেয়। প্রথাগত নিয়ম হচ্ছে ড্যাশ-এর ডানে বায়ে খালি জায়গা না-রাখা। কিন্তু আমার তা ভালো লাগে না, এর ডানপাশে একটা স্পেস দিতেই আরাম পাই। একে দুইপাশ থেকে অন্য বর্ণ কর্তৃক ঠেসে ধরলে আমার কেবলই মনে হয় যেন এর দম আটকে মারাই যাবে!
 
প্রশ্নচিহ্নকে যুক্তিবিদ্যা আর দর্শনের একান্ত দোসরই মনে করতে পারি। কারণ প্রশ্নবিনে দর্শন আর তর্কের মন ভরে না। অথচ কার্যত আমরা দেখি, প্রশ্নচিহ্ন প্রায়ই ব্যবহার হয় অজানাকে জানার পরিধিতে এনে একটা আরামদায়ক দাঁড়ি বসিয়ে দেয়াতে। আমাদের বেশির ভাগ পাঠকই নিরীহ-আরামপ্রিয়-বিলাসি দাঁড়িতে খুব মজা পায়। আমরা দাঁড়িতে সুখ খুঁজে নেয়া জাতি; প্রশ্ন বা বিস্ময়বোধকে নিজের কব্জায় আনার ভিতরই যাবতীয় মজা খুঁজি। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্নমুখরতাকে তো ভালোবাসতেই চাই, সবচেয়ে পছন্দ করি বিস্ময়বোধকে। এই যে একটা বিস্ময়চিহ্ন এর ভিতরই যাবতীয় সৃজনশীলতার ক্ষেত্র খুঁজতে চাই। এই একটা চিহ্ন যার সদরে অন্দরে সৃজনশীলতার অনেক দায়ভারকেই সহ্য করতে হয়। এর উপর মানুষের মন-মেজাজের চাপও পড়ে বেশিই। বিস্ময় তো আছেই, আনন্দ, বিষাদ, কান্না, দ্বিধা, লাজ-শরমের অনেককিছুই একে বহন করতে হয়। বাংলাভাষায় এই চিহ্নের উপর দিয়ে যত ঝড়-তুফান যায়, তা আর কোথাও কিন্তু নাই। এই চিহ্নের স্বাধীনতা, উন্মুক্ততা যত বাড়বে আমাদের বলায়, পড়ায়, লেখনে এমনকি সৃজনে সৃজনশীলতাকেই আমরা দেখে নিতে পারব। এর পর যে চিহ্ন আমায় ভাবায় তা হচ্ছে, ড্যাশ আর সেমিকোলন। আমার লেখাজোকায় বিশেষত কথাশিল্পের জমিনে রীতিমতো সংশয়ে থাকি এর ভিতর থেকে কোন চিহ্নটি ব্যবহারে আমার বাক্যের শক্তি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পাবে। কমা আর সেমিকোলনের ভিতরও কোন চিহ্নটি ব্যবহার করব তা নিয়ে মাঝে মাঝে দর-কষাকষি চালাই আমি। বাক্যের কমা, সেমিকোলন, ড্যাশ ইত্যাদির ভিতর ট্রাডিশনাল ভুলে-ভরপুর-চিহ্ন আমি প্রায়ই হয়ত ব্যবহার করি। আসলে কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ, এ বিচারের ভার আর ক্রিয়েটিভিটির উপরই ছেড়ে দিতে পছন্দ করি। আমার চিহ্নপ্রেম আমিই বহন করতে চাই, সাজাতে চাই, এর প্রয়োগ চাই। আমার এ চাওয়ায় কোনো ধরনের মাতব্বরি আমি নিতে চাই না। আমার সৃষ্টিশীলতা নিয়ন্ত্রণকারি কেউ থাকুক, চিহ্ন ব্যবহারের প্রাতিষ্ঠানিক মাস্টারি কেউ করুক তা আমি চাইও না।

কম্পিউটারে কম্পোজ করা, ইন্টারনেট সাহিত্য, ব্লগ, ফেসবুক ইত্যাদিতে কিছু চিহ্ন ইদানীং অটোমেটিকই ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন, ইটালিক, বোল্ড, নিম্নরেখা, শব্দকে ছোট-বড়ো করা, নানাধরনের জাস্টিফাইডকরণ আমরা এখন লক্ষ্য করি। সুবিমল মিশ্র বাক্য বা শব্দ ব্যবহারে যে ক্যারিশমা দেখাতেন, আলাদা করে নিজেকে প্রকাশের দায়িত্ব নিতেন, এখন যেন তাই একধরনের ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। পাঠকের সাথে লেখকের রিলেশনের ধরনটাও নতুন কৌশল পাচ্ছে। লেখা কালো রঙের ইম্প্রেশন পার্সেন্টেজ কমিয়ে-বাড়িয়ে চোখের আরাম বা বেআরাম পয়দা করা হচ্ছে। এসব বিরামচিহ্নের জায়গাটিকে আরও বিস্তৃত করে দিচ্ছে।

তাহলে আমি চাই কী! এই যে এই মাত্র ব্যবহৃত বাক্যে আমি বিস্ময়চিহ্ন ব্যবহার করলাম তা কিন্তু প্রশ্নচিহ্ন’র দাবিই অধিক। আবার এই যে প্রশ্নচিহ্ন’র ঘাড়ে একটা অ্যাপস্ট্রফি বসিয়ে দিলাম তা কিন্তু প্রথাগত ব্যাকরণ মানবে না। এটি প্রশ্নচিহ্নের বা প্রশ্নচিহ্ন-এর হতে পারে। কিন্তু ইদানীং এইধরনের উর্ধ্বকমা ব্যবহারের মানসিক প্রস্তুতি আমার আছে। এটি ভুল কি শুদ্ধ তা চিন্তাও করছি না। এই আমার সৃজনশীল ভুল, আমার ভুলের খেসারত আমি দিতে প্রস্তুত আছি। সৃজনশীলতার কোনো চুলছেঁড়া মীমাংসা চলে না, রাষ্ট্র-ধর্ম-সমাজ-পরিবার আমায় ক্রমাগত হুঙ্কার দিক তাই আমি চাই না। বিরামচিহ্ন ব্যবহারে নৈরাজ্যিক, মুক্ত-স্বাধীন মত প্রকাশের পূজারি আমি।

বাংলাদেশ সময়: ১৪০০ ঘণ্টা, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: তানিম কবির

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান