 |
ময়মনসিংহ : অ্যানথ্রাক্স রোগ নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বিশেষজ্ঞ দল। এলাকা পরিদর্শনের মাধ্যমে সংগৃহীত নমূণা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এক গবেষণা প্রতিবেদনে তারা বলেছেন, অ্যানথ্রাক্স কবলিত সিরাজগঞ্জের প্রতি গ্রাম মাটিতে ৭ লাখ ৭০ হাজার অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণু পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই এলাকার মাটিতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু থাকায় তা বিভিন্নভাবে গবাদিপশুর শরীরে প্রবেশ করে ওই রোগ সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত পশুর মৃত্যুর ভয়ের কারণে পশু জবাই করে মাংস খাওয়া, মাংস কাটা এবং আক্রান্ত মৃত পশুর সংস্পর্শে আসায় ওই এলাকার মানুষ অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।
বাকৃবি’র ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের ৫ সদস্যের ওই বিশেষজ্ঞ দল গত মঙ্গলবার অ্যানথ্রাক্স কবলিত সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের নওকৈড় গ্রাম পরিদর্শন করেন। তারা ওই এলাকার আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে কথা বলে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য মৃত পশু, পরিবেশ বিশেষত মাটি ও আক্রান্ত মানুষ থেকে প্রায় অর্ধশত নমুনা সংগ্রহ করেন। বুধবার বাকৃবিতে ফেরেন তারা।
পরে এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বাকৃবি’র প্রতিনিধি দলের প্রধান ড কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির শনিবার এসব তথ্য জানান।
বিশেষজ্ঞ দলের আহবায়ক বাকৃবি’র মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির বাংলানিউজকে জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অর্থায়নে অ্যানথ্রাক্স গবেষণা প্রকল্পের আওতায় আমাদের সেখানে পাঠানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নওকৈড় গ্রামের অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত ৩৩ জন রোগীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং অ্যানথ্রাক্স জীবাণু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য মৃত পশু, পরিবেশ বিশেষত মাটি ও আক্রান্ত মানুষ থেকে প্রায় অর্ধশত নমুনা সংগ্রহ করেছি। পরে আমরা গবেষণাগারে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি।’
গবেষণা প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সিরাজগঞ্জের মাটি পরীক্ষা করে আমরা দেখতে পেয়েছি, সেখানকার প্রতি গ্রাম মাটিতে রয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণু। প্রতিটি জীবাণুই অ্যানথ্রাক্স রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।’
তিনি বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে দেশে বর্তমান প্রচলিত অ্যানথ্রাক্সের টিকা তৈরি করা হয়েছে। এরপর আর টিকার গুণগত মানের যেমন উন্নয়ন হয়নি, তেমনি টিকার বিশুদ্ধতাও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। এতে করে দিনের পর দিন টিকাগুলোর প্রতিষেধক ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে আক্রান্ত গবাদি পশুকে টিকা দেওয়ার পরেও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়।’
বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, প্রতি বছর দেশে প্রচুর পরিমাণ অ্যানথ্রাক্স টিকার প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান এ টিকার চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সরকার গবাদি পশুর অ্যানথ্রাক্স নিরাময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের রোগ নিরাময়ে অর্থ ব্যয় করছে।
অথচ গবাদি পশুর অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ করলেই মানুষ আর আক্রান্ত হবে না। কারণ, এ রোগ গবাদিপশু থেকেই মানুষে ছড়ায়। মানুষ থেকে মানুষে নয়।
বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করতে লোকবল বাড়াতে হবে। দ্রুত এ রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের প্রাণিসম্পদ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
মানুষের ক্ষেত্রে এ রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর করণীয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য সহকারী অধ্যাপক জায়েদুল হাসান বলেন, ‘এ রোগে আক্রান্ত এলাকার মানুষকে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। এক্ষেত্রে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ট্যাবলেট (১০ মিলি গ্রাম) ১২ ঘণ্টা পর পর টানা ৭ দিন পরামর্শকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে।’
বাংলাদেশ সময় : ০৪৪৫ ঘণ্টা, জুন ০৩, ২০১২
প্রতিবেদন : এম আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর