৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ১৮, ২০১৩ ১১:৫৭ পিএম BDST banglanew24
24 Sep 2012   07:31:44 PM   Monday BdST
E-mail this

জুবিন ঘোষের সাথে অনলাইন আলাপ

ক্ষেপচুরিয়াসে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই...


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ক্ষেপচুরিয়াসে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই... জুবিন ঘোষের সাথে অনলাইন আলাপ

জুবিন ঘোষ প্রধানত দুই বাংলার শূন্য দশকের একজন প্রথম সারির কবি। কবিতা লেখার শুরু ২০০০ সালে। জন্ম ২১ আগস্ট ১৯৮২। কবিতার জন্য নিখিল ভারত বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন থেকে ২০০৪ সালে ‘সর্বভারতীয় প্রীতিপ্রসার পুরস্কার’ ও ‘একাডেমি অব বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ থেকে ‘সারস্বত সম্মান ২০০৯’ পুরস্কারে ভূষিত হোন। বিভিন্ন সময় কবি সম্পাদনা করেছেন সংবাদ সাতদিন, আমাদের পরিবার, এক্সক্লুসিভ হেডলাইনস, স্পার্ক, বীক্ষণ, হুগলি তাঁতঘর প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা ও সংবাদপত্র। বর্তমানে তিনি ক্ষেপচুরিয়াস নামে একটি প্রিন্টেড ম্যাগাজিন ও ফেসবুকে ক্ষেপচুরিয়াস গ্রুপের সম্পাদনার সাথে যুক্ত, পরিচালনা করছেন khepcuriyans নামের একটি জনপ্রিয় ব্লগসাইট।

কবি জুবিন ঘোষের সাথে সাম্প্রতিক অনলাইনকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা বিষয়ে আলাপচারিতা চালিয়েছেন কবি তানিম কবির। অনলাইন আলাপচারিতাটাটি বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো:


তানিম :  সমসাময়িক অনলাইনকেন্দ্রিক কবিতা তৎপরতায় আপনার নামটি বিশেষভাবে উজ্জ্বল, কেন?

জুবিন : ঠিক জানি না, আসলে এই অনলাইন ব্যাপারটায় আমি মাত্রই একবছর হলো এসেছি, এর আগে বরাবরই আমি ছাপা পত্রিকাতেই থাকতে পছন্দ করতাম, সেখানেও আমি সমানভাবেই তৎপর ছিলাম, তৎপর বলতে যদি অ্যাক্টিভিটি বলতে চান। আসলে এখানে এসে এমন অনেকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল, যাঁরা নেট জগতের বাইরে প্রায় অস্তিত্বহীন। এদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় সম্ভবত শুধুই নেট, আবার পরিচিত অনেকেই মিললো। যদিও নেটে আমার কবিতা শেয়ার মেরেকেটে ১৫ /২০ টার বেশি নয়। এখন তারপরেও আগে নাম আসে কী করে সেটা তো জানি না। কিছুটা বলতে পারো সবাইকে ভালোবেসে ফেললাম।

তানিম : এক্ষেত্রে আপনার ফেসবুককেন্দ্রিক কবিতার গ্রুপ ক্ষেপচুরিয়াসের যেকোনও টাইপের অবদানকে আপনি অস্বীকার করতে চান?

জুবিন : ক্ষেপচুরিয়াসের সৃষ্টি আমার হাতে হলেও, এটা কিন্তু আমার একার অবদান নয়, একটা সার্বিক চেষ্টা সেখানে আপনারও অবদান আছে, ক্ষেপচুরিয়াসের ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে উঠতে।

তানিম : ফেসবুকে কবিতার গ্রুপ এবং গ্রুপে কবিতা পোস্ট করা, সেই কবিতা নিয়ে আলোচনা সমালোচনার যে প্রবণতা চালু হয়েছে— এটাকে কবিতার জন্য কতোটুকু প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন?

জুবিন : আমার মতে এটা খুব ভালো দিক, পাঠক ও কবির মধ্যে ইন্টার‍-অ্যাকশন ঘটছে নিয়মিত, যার জন্য নতুন যারা আসছে তাঁরা কিন্তু এখন অনেক পরিণত, স্মার্ট, তাদের কাছে কবিতার পরিশীলন এর জায়গা পাচ্ছে কবিতার গ্রুপগুলো। এই সুযোগ কিন্তু আমরা পাই নি আমাদের প্রথম দিকে।

তানিম : কবি ও পাঠকের মধ্যে এই তাৎক্ষণিক ইন্টার-অ্যাকশন কি কবিতার ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় একটা বাধা নয়? যেমন অনেকের মধ্যেই এখন কবিতা লিখেই গ্রুপে পোস্ট করে তাৎক্ষণিক কিছু মন্তব্যপ্রাপ্তির মনোবাসনা তৈরি হয়ে গেছে...

জুবিন : আগে আমরা কবিতাকে বাইরে থেকে দেখতাম, নিজেদের কবিতার আলোচনার ভূমিকা প্রায় ছিলই না। এখন ভেতর থেকে দেখার একটা সুযোগ হয়ে গেছে, হ্যাঁ এই কথা ঠিক যে তাৎক্ষণিক পোস্ট করার প্রবণতা অনেকের মধেই দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেটাকে, না, ঋণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি না, প্রবণতাটাকে এইভাবে ধরুন: এই মানুষগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কিছু মানুষকে তাঁদের কবিতা পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে, সমৃদ্ধ হচ্ছে।

তানিম : আর পাঠকেরও তো বোধহয় খানিকটা বিশ্রাম দরকার— ঘন ঘন স্রোতের মতো এতো কবিতার আবদার, বাধ্য হয়ে কিছু প্রশংসাবাচক মন্তব্য করে পালিয়ে যাবার একটা প্রবণতা কিন্তু পাঠকের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে। একটা কবিতাকে আলাদাভাবে সে আর সময় দিতে পারছে না...

জুবিন : আমি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি, পাঠক কিন্তু ভালো কবিতা খুঁজে নেন। আমরা একটা জিনিস তো মানবো, এই গ্রুপগুলোর ফলে পাঠকের সংখ্যাটা বৃদ্ধি হয়েছে। এতে বাংলা কবিতার উপকার বৈ ক্ষতি নেই। আর পাঠকের সেই প্রশংসা বা পিঠ চাপড়ানোর আল্টিমেটলি কোনও মানে থাকে না, যখন সেটা স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। সুতরাং এই নিয়ে হা-পিত্যেশ করার সময় বোধ হয় এখনও আসেনি। পাঠক ভালো কবিতা খুঁজে নেবে।

তানিম : এখানে কবিতার পাঠক বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? কারা এই পাঠক? সেই তো, যারা দিনভর পাঠক সেজে মন্তব্য করে আর সন্ধ্যা বেলা নিজের কবিতা পোস্ট করে?

জুবিন : না তার বাইরেও পাঠক আছে, গুনে গুনে আমি নাম বলতে পারি, যারা কবিতা না লিখেও শুধু কবিতা ভালো লাগে বলে কবিতা পড়তে আসে, ভালো কবিতা খুঁজে বেড়ায় নিজের জন্য, তাঁরা খোঁজেন অন্তত একটা কবিতা যা তাঁদের রিপ্রেজেন্ট করে, তাঁদের স্টেট অফ মাইন্ডকে পরিবেশন করে, যেকথা তাঁরা বলতে পারে না, সেই লাইনগুলো হাতড়ে বেড়ায়। আর এই বেড়াতে বেড়াতেই তাঁরা দু একটা কবির সন্ধান পেয়ে গেলে, উচ্ছ্বাস দেখায়, কবিতাটা খাতায় টুকে রাখে। এই পাঠকদের আমি সম্মান করি। তাছাড়া যারা কবিতা পোস্ট করে তাঁরাও কিন্তু অন্যের কবিতা পড়ে, অন্যের বই কেনে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে তাঁদের পাঠকসত্তাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

তানিম : কিন্তু এতে করে যে প্রশংসাবিনিময়ের একটা কালচার গড়ে উঠছে, তা কি অস্বীকার করবেন? দেখা যায় অমুক, নিজের কবিতায় যাদের মন্তব্য পান— বেছে বেছে কেবল তাদের কবিতায়ই মন্তব্য করেন। এ ধরনের বিনিময়-সংস্কৃতির আড়ালে অনেক ভালো কবিতা কিন্তু চাপা পড়ে যায়, হোমপেজের নিচের দিকে হারিয়ে যায়...

জুবিন : হুম

তানিম : কবিতার কালবিবেচনায় যদিও এ ধরনের হারিয়ে যাওয়া খুব নগণ্য— তবু তাৎক্ষণিক আয়োজনে এ ধরনের পক্ষপাতমূলক বৈষম্যের শিকার হয়ে অনেকেই কিন্তু হীনমন্য বোধ করেন। উৎকৃষ্ট কবিতাটির ব্যাপারেই নিজের মধ্যে সন্দেহ পোষণ করেন।

জুবিন : তবে উপায় কী? আমরা তো বেছে বেছে বলতে পারি না। বিনিময়-সংস্কৃতি হচ্ছে এটা ঠিকই, খারাপ দিকের এর কথা আপনি উল্লেখ করলেন, সেটাও কিছুটা সত্যি, কিন্তু এইসব থাকবেই, এসবের মধ্যেও পাঠক ভালো কবিতাটা ঠিকই তুলে আনে। আসলে দলতন্ত্র একটা খারাপ দিক সব সময়েই।

তানিম : পাঠক তৈরি করার জন্য কি ভালো কবিতা লেখা আর যথেষ্ট নয়? এজন্য কি সাংগঠনিকভাবেও একজন কবির শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রয়োজন? যেটাকে আমরা ফিল্ডওয়ার্ক বলতে পারি...

জুবিন : সাংগঠনিক মনোভাবকে অস্বীকার করে প্রকৃত লেখার দিকেই কবির মন দেওয়া উচিৎ।

তানিম : সেটাতো কবিতা লেখার সময়। কিন্তু যখনই এটা তিনি অনেকের কাছে পৌঁছে দিতে চাইবেন, তখন তার করণীয় কী? ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও আগে থেকে অনেকের সাথে একটি বোঝাপড়ার সম্পর্ক স্থাপন করে পরে কবিতা প্রকাশ করা?

জুবিন : আমি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছি, পীড়াও পেয়েছি, যখন দেখেছি নিজের লেখার লাইক বা কমেন্ট বাড়াতে কিভাবে তাবেদারি করে যাচ্ছে একটা লেখক। এটা কোনও মতেই কাম্য না। আসলে কবিরা (কেউ কেউ) এটাই ভুলে যান, একটা কবিতায় লাইক দেওয়ার কোনও অর্থ শেষ পর্যন্ত থাকে না। দুটো পোস্ট তার ওপরে পড়লেই সেটা নিচে নেমে যায়। আসলে এটা বুঝতে আরও কিছুদিন পথ হাঁটতে হবে।

তানিম : এই যে তারা ভুলে যান— এই বিস্মরণপ্রবণতার জন্য গ্রুপ অ্যাডমিন হিসেবে নিজেকে দায়ী মনে হয় কখনও?

জুবিন : আমার এই গ্রুপটার একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে।

তানিম : কী সেটা?

জুবিন : এখানে ভালো লেখার পর্যাপ্ত আলোচনা হয়, এটা আসলে আমাদের একটা কমন প্ল্যাটফর্ম, সেখানে যেমন লেখক-কবি-পাঠকরা আছেন, তেমনি বিজ্ঞ আলোচকরাও আছেন, যারা কেবল গ্রুপে আলোচনা করেই থেমে থাকেন না, গ্রুপের বাইরে বৃহত্তর বৃত্তেও কবিকে ফোকাস করেন। নিম্নমানের বা বলা যায় মানসম্পন্ন নয় (আপেক্ষিক অর্থে)  যে কবিতা তাকেও কিভাবে ভালো করা যায় তা বুঝিয়ে বলার একটা আন্তরিক চেষ্টা আছে। অনেকে সেটা হয়তো নিতে পারেন না, কিন্তু যারা নিতে পারেন, তাঁদের অনেকেই কিন্তু এই সময় মাত্র এক বছরের মধ্যেই যথেষ্ট লাইম লাইট পেয়েছে। আর একটা দিক হল, আন্তর্জাল থেকে ছাপার গন্ধ পাওয়া। প্রচুর কবিকে কিন্তু এই ক্ষেপচুরিয়াসে নিয়মিত ভালো লিখতে দেখেই এখানকার অনেক উচ্চমানের পত্রিকাও নিজেরা ডেকে  আমন্ত্রণ করে তাঁদের লেখাচ্ছে। আর শেষ যে দিকটা তা হলো, সবার মধ্যে একটা মেলবন্ধন। আমরা কোনও দলবাজি করবো না, এই বিশ্বাসটা এখন অনেকের মধ্যেই প্রোথিত হয়েছে।

তানিম : তার মানে বলতে চাইছেন আপনারা এখানে কবিতা সংশোধনের কাজ করে থাকেন, এবং আপনাদের সংশোধন  গ্রহণ করে অনেকে লাইমলাইটও পেয়েছে? কারা তারা, দু`একজনের নাম বলুন শুনি...

জুবিন : নাম করাটা বাঞ্ছনীয় নয়। সেটা এই রকম একটা ওপেন প্ল্যাটফর্মে না বলাই ভালো, অনেক বাধ্যবাধকতা থাকে। সেটা আপনিও জানেন। সংশোধন কথাটা ভুল, মতবিনিময়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ।

তানিম : আপনার/ আপনাদের গ্রুপে সম্পাদক বলে একটি জায়গা আছে, যেখানে পাঁচজনের নাম দেখা যাচ্ছে— এদের কাজ কী? এমন তো না যে,  তারা লেখা সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন...

জুবিন : ঠিক সেটাই। আমাদের একটি প্রিন্টেড ম্যাগাজিন আছে, একটি আন্তর্জাল ম্যাগাজিন আছে। সেখানে এরাই দায়িত্বপ্রাপ্ত। গ্রুপের ভালোমন্দ সিদ্ধান্ত এই পরিচালন সমিতির হাত ধরেই অ্যাডমিনের সবাই করে থাকে। গ্রুপে তাই এক জায়গায় সেই নামগুলো দেওয়া হয়েছে, যাতে পরিচালন সমিতি পর্যাপ্ত সন্মান পায়।

তানিম : তার মানে কি এই গ্রুপটা মূলত প্রিন্টেড সংস্করণের একটা অনলাইন উপস্থিতি? জন্মের দিক থেকে কোনটার বয়স বেশি— ক্ষেপচুরিয়াস ফেসবুক গ্রুপ, ক্ষেপচুরিয়াস ওয়েবম্যাগ নাকি ক্ষেপচুরিয়াস প্রিন্ডেডম্যাগ? প্রায়োগিগভাবেই বা কোনটার গুরুত্ব বেশি বলে মনে করেন?

জুবিন : ক্ষেপচুরিয়াস প্রিন্টেড ম্যাগ। ২০০৮ সালে তার প্রথম পথচলা, তারই অনলাইন উপস্থিতি ক্ষেপচুরিয়াস ফেসবুক গ্রুপ, ও ওয়েবম্যাগাজিন। গুরুত্বের দিক থেকে দেখতে গেলে প্রিন্টেডের গুরুত্বই এখন অবধি বেশি। আমাদের প্রিন্টেড ইস্যুর পাঠক গ্রুপের সদস্য সংখ্যার থেকে বেশি।

তানিম : প্রিন্টেড ক্ষেপচুরিয়াসের পাঠক সংখ্যা গ্রুপের পাঠক সংখ্যার চাইতে বেশি এটা বুঝলেন কিভাবে?

জুবিন : দেখেন একটা পত্রিকার বিক্রির সংখ্যার ওপরে পাঠকের সংখ্যা নির্ধারিত হয়, তার সঙ্গে এটাও জানবেন,  একটি পত্রিকা মানে গড়ে ৪ জন পাঠক।

তানিম : তার মানে প্রিন্টেড ক্ষেপচুরিয়াসের বিক্রি ভালো? আর তার সাথে চার গুণ করে যা দাঁড়াচ্ছে— তাকে আপনার গ্রুপ পোস্টের পাঠকের চাইতে সংখ্যায় বেশি বলে মনে হচ্ছে?

জুবিন : সংখ্যাতত্ত্ব তো তাই বলে। সেটা অবশ্য শুধু গ্রুপের ক্ষেত্রে,  ক্ষেপচুরিয়ানস্‌ ব্লগজিন যদিও প্রত্যাশার অধিক পাঠক পেয়েছে। এতোটা আমরা নিজেরাও ভাবি নি।

তানিম : আমরা বলতে আসলে কতোটা আপনারা? কারা আপনারা? ``ক্ষেপচুরিয়াস`` নামটার সাথে ``আমরা`` শব্দটা কি খানিকটা আরোপিত নয়? এটার পরিচালনা থেকে শুরু করে সবকিছুই কি আসলে আপনার একার সিদ্ধান্তেই চলে না?

জুবিন : না তানিম, আমি সাহিত্যে স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী নই, হ্যাঁ একথা ঠিক যে শুরুর দিকে একটা নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে পরিচালনার ভারটা নিজের কাছেই রাখতাম, সেটার কারণ সম্ভবত সেটা ডেভেলপমেন্ট স্ট্রাকচারটা তখন সবে তৈরি হতে শুরু করেছিল, পরবর্তী সময়, এর সঙ্গে অনেককে যুক্ত করা হয়। এখন ক্ষেপচুরিয়াস কোনও একক সত্তা নয়, এটা একটা সার্বিক সত্তা বলতে পারেন। ``আমার`` বলে আর আমার কিছু নেই, এখন তাই ``আমাদের``। আর একা একা কোনও ভালো কাজ করা যায় না, যতক্ষণ না তাতে মানুষের ইনভলভমেন্ট থাকে। মানুষ আর প্রকৃতি ছাড়া কবিরা যে বোবা, বোধশক্তিহীন।

তানিম : আপনার এই বক্তব্য যদি কেউ অস্বীকার করতে চায়?

জুবিন : তাতে তো সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যায় না, এখন নিজেই দেখুন ক্ষেপচুরিয়াসে, আমি ছাড়াও একক ক্ষমতা বলেও সম্পাদকরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, ইচ্ছে অনিচ্ছের মূল্য আছে। সেটা তো আর এমনি এমনি আসে না। এই জায়গাটায় নিয়ে আসতে হয়তো অনেক অপ্রিয় কাজ আমায় (এক্ষেত্রে নিজেই দায়ী) করতে হয়েছে, কিন্তু গত এক বছরে ক্ষেপচুরিয়াস যে প্রত্যাশার পারদ চাপিয়েছে, যেভাবে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে সেটাই তো প্রাপ্তি। এখন এটা সকলের। আমি একা ফল খাবো,  আর যাঁরা দিনের পর দিন খেটে, রাতের পর রাত জেগে একে এই জায়গায় দাঁড় করালো, তারা আঙুল চুষবে তা তো হয় না! বেসিক্যালি প্রথম থেকেই আমি চেয়েছিলাম, দলবাজি, গোষ্ঠীবাজির বাইরে থেকে কাজ করতে।

তানিম : আচ্ছা ক্ষেপচুরিয়াসের সম্পাদক এবং অ্যাডমিন পদে বাংলাদেশেরও দুইজন রয়েছেন। এটার যাবতীয় পরিচালনপদ্ধতি ও নীতি তো পশ্চিমবঙ্গ থেকে থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এ-দুজন বাংলাদেশীর ভূমিকা কী এখানে?

জুবিন : কই দেশ বলে তো ক্ষেপচুরিয়াসে কিছু নেই। এটাই তো একমাত্র জায়গা যেখানে কাঁটাতারের বাধা বা বেড়া নেই। এটা এতদিনেও বুঝলেন না তানিম...

তানিম : মানে এখানে দেশের সীমানা ঘুচে গেছে, ভাষা ও কবিতার স্বার্থে— এমনটাই আপনার দাবি?

জুবিন : ঘুচে যাক এটাই তো ভালো, এটাই তো চাই। অন্তত বাংলা ভাষাটাতে তো আমি ভারতীয়, আপনি বাংলাদেশি, তিনি প্রবাসী এই বিভেদ না থাকাই ভালো। এমন একটা কিছু থাকুক না, যেটা নো-ম্যানস্‌ ল্যান্ড থেকে হোক।

তানিম : একজন ভারতীয় বাঙালি কবির কোন সত্তাটা প্রধান— ভারতীয়, নাকি বাঙালি?
 
জুবিন : স্বদেশ প্রীতিটা সব কবির মধ্যেই থাকে, তবে চারিত্রিক দিক থেকে আদ্যোপান্ত বাঙালিয়ানা— এটাই সম্ভবত প্রধান সত্তা হয়ে দাঁড়ায়। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, নজরুল থেকে সুনীল, শক্তি, বিনায়ক শেষ পর্যন্ত সবাই কিন্তু বাঙালি থাকতেই পছন্দ করেছেন।

তানিম : একজন কবি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের নির্বিচার গুলিতে বাঙালি মারার ঘটনাটিকে কোন জায়গা থেকে দেখেন? আমরা দেখেছি চলমান এসব ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের লেখক-বুদ্ধিজীবী মহলে তেমন জোরদার কোনও প্রতিবাদ হয় নি, হচ্ছে না। বাঙালিহত্যায় বাঙালিসত্তার যে পরিমাণ আলোড়িত হবার কথা সেটা হয় নি, বা হয় না। রাষ্ট্রীয় ভারতীয় সত্তাটা কি তখন এখানে কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়? একজন শিল্পী কি এই বাধা মেনে নেবেন?

জুবিন : এই ঘটনার আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি, যদিও আমি নিজে ডিটেল জানি না, পাবলিহা নামের এক তরুণী কবি প্রথম এই বিষয়টার ব্যাপারে আমায় ওয়াকিবহাল করে, পরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটা প্রতিবাদপত্র লেখেন নব্বইয়ের অন্যতম প্রধান কবি মিতুল দত্ত। তাতে অনেকের মতো আমিও স্বাক্ষর করি, শুধু আমি নই পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রথিতযশা কবিও এতে স্বাক্ষর করে প্রতিবাদ করেন। রাষ্ট্র নয়, আমি মানুষ বুঝি। সুতরাং যে কোনও অন্যায় ঘটনার প্রতিবাদ আমি করবো। আমি সবসময় মনে করি রাষ্ট্রের উর্ধ্বে মানুষ।

তানিম : ফেলানি হত্যার ঘটনায় এদেশে তো অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। গান হয়েছে। ডক্যুফিল্মও তৈরি হচ্ছে। শিল্পীর প্রতিবাদের জায়গা তো তার শিল্পমাধ্যমই হওয়া উচিৎ। আপনার, আপনাদের ওখানকার প্রতিবাদের ধরন কেমন হওয়া উচিৎ?

জুবিন : এই নিয়ে আপনাকে বরং দুটো উদ্ধৃতি দিই। আশা করি আপনি ব্যাপারটা উপলব্ধি করবেন। এখনও, একবছরও কাটেনি, কৃত্তিবাসের অক্টোবর-ডিসেম্বর সংখ্যার সম্পাদকীয়তেই কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই জাতীয় একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন কেন কবি রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে নীরব থাকছেন। আমি হুবহু সেই উদ্ধৃতিটা আপনার জন্য তুলে দিলাম।

``সারাদেশে যে এতসব ঘটনা ঘটছে, তার কোনও প্রতিফলন কেন কৃত্তিবাসের পৃষ্ঠায় দেখা যায় না? ... তা বলে কি কবিদের মধ্যে এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় না? হবে না কেন, কবিরা তো আর সমাজ এবং দেশ-কালবহির্ভূত প্রাণী নন। মর্মান্তিক কিংবা নির্লজ্জভাবে অগণতান্ত্রিক কোনো কোনো ঘটনায় তাঁদের মনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া হতে পারে, প্রতিবাদের জন্য ফুঁসে উঠতে পারেন অবশ্যই। এই প্রতিবাদ কি কবিতার ভাষায় প্রকাশ করা উচিৎ? উচিৎ-অনুচিতের কোনো প্রশ্নই নেই, যার ইচ্ছে লিখবেন, যিনি লিখতে চান না, তিনি লিখবেন না। এর মধ্যে কোনো সাধারণ বার্তা নেই।  কোনো কবির যদি মনে হয়, তিনি তাঁর কবিতায় এইসব অন্যায়ের প্রতিকার করতে পারবেন, অথবা অত বেশি আশা না করেও তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরটুকু অন্তত রেখে যাবেন, তিনি তা লিখতেই পারেন। আবার কোনো কোনো কবি যদি মনে করেন, তাঁর কবিতার ভাষা এই ধরনের কাব্যের উপযুক্ত নয়, তাঁর নীরব থাকার যৌক্তিকতা অবশ্যমান্য। বাংলা ভাষায় এই দুই প্রকার উদাহরণ অনেক কাল ধরে আছে।``- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (সম্পাদকীয়, কৃত্তিবাস)

আর একটা কথা লিখছেন কিন্তু অনেকেই। পথনাটকও হচ্ছে এর প্রতিবাদে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা এই নিয়ে যথেষ্টই উদ্বিগ্ন। যে যার নিজের মতো করে প্রতিবাদ করছে।

তানিম : আপনাকে ধন্যবাদ জুবিন, কষ্ট করে আমাকে সময় দেয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।

জুবিন : আপনাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ, অনেক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম, কিছু নতুন ভাবনা-চিন্তার অবকাশও হলো। এর রেশ থেকে যাবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৯১৯ ঘণ্টা, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস;  জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com 

 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান