 |
পুরান ঢাকার ৭৪ ফরাশগঞ্জ ‘মুক্তধারা’ আর নিউ ইয়র্কস্থ জ্যাকসন হাইটের ৩৭-৬৯, স্ট্রিটের ‘মুক্তধারা’ দু’টোর সঙ্গেই আমার স্মৃতি আর সম্পর্ক কতটা নিবিড় তা, চিত্তরঞ্জন সাহা আর বিশ্বজিৎ সাহাই জানেন। দুই সাহার কাছেই আমি কৃতজ্ঞ। ঐতিহ্যবাহী ‘এনালগ’ মুক্তধারা আমার লেখালেখির শুরুতে ২/৩টি বই করে সম্মানী দিয়েছেন। আর ডিজিটাল ‘মুক্তধারা’ পকেটের টাকা দিয়ে আমাকে আমেরিকায় নিমন্ত্রণ করে এনেছে।
সিনিয়র ‘সাহা’ স্বাধীনতার পর ছালার চট বিছিয়ে, হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বাংলা একাডেমীর বইমেলার গোড়াপত্তন করেছেন। আর জুনিয়র ‘সাহা’ একুশ বছর আগে জ্যাকসন হাইটে বাংলা সাহিত্যের ‘কুপিবাতি’ জ্বালান। আজ তা আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলায় পরিণত হয়েছে। তাই অনেকেই তো মজা করে বলেন, বিশ্বজিৎ বাংলার বিশ্বজয় করেছেন! আমি দুই সাহাকে এক করতে চাই না। কিন্তু তাঁদের শেকড় তো একই জায়গায় প্রোথিত। একুশ বছর ধরে নানান তীর্যক আলোচনা-সমালোচনার তোয়াক্কা না করে, পেছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। রবি ঠাকুরের গান ``যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল, একলা চলরে...’``গাইতে গাইতে আজ মুক্তধারা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। অভিনন্দন মুক্তধারাকে। শুভেচ্ছা বিশ্বজিৎ সাহাকে।
বিশ্বজিৎ সাহা আমার বন্ধু, সতীর্থ এবং সহকর্মীও। আমি নব্বইয়ের শুরুতে মোস্তফা জব্বারের `আনন্দপত্র`র সাপ্তাহিক ‘ঢাকার চিঠি’র সহযোগী সম্পাদক ছিলাম। তখন বিশ্বজিৎ সাহাও সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন আনন্দপত্র`র সঙ্গে। সেখান থেকেই তিনি কলম্বাস হয়ে উঠলেন। এসে যুক্ত হলেন উত্তর আমেরিকার প্রথম সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা ‘প্রবাসী’র সঙ্গে। মোহাম্মাদউল্লাহ সম্পাদিত ‘প্রবাসী’র উপদেষ্টা ছিলেন ড. নূরুন নবী, ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। আর আমি ছিলাম সাপ্তাহিক প্রবাসীর ঢাকা প্রতিনিধি। ফলে কাছের সহকর্মী বিশ্বজিৎ হলেন দূরের সহকর্মী। তাঁর সঙ্গে তিন দশকের কত রাগ-অনুরাগের স্মৃতি, তা তো আর তিন পাতায় লিখে শেষ করা যাবে না।
এ বছর ফেব্রুয়ারির বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলার ‘প্রবাসে একুশে উদযাপন এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চা` শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠে অনির্ধারিত প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আর অনির্ধারিত আলোচক ছিলেন ড. জ্যোতি প্রকাশ দত্ত এবং বিশ্বজিৎ সাহা। আমার প্রবন্ধের এক জায়গায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল নকশাবিদ হামিদুর রহমান এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার রূপকার রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালামের কথা উল্লেখ করে লিখেছিলাম, কানাডায় মন্ট্রিয়লে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন হামিদুর রহমান আর ভ্যাঙ্কুভারের রফিক-সালামেরা পেয়েছেন একুশে পদক।
জ্যোতিদা বিষয়টি বিস্তর আলোচনা করে বললেন, গত একুশ বছর ধরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে প্রায় এককভাবে মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা জাতিসংঘের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপন করে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে যাচ্ছেন। তার কি কোনো মূল্যায়ন হবে না? জ্যোতিদা’র এই প্রশ্নের জবাবে জানাতে চাই, হবে। বাংলাদেশ সরকার তো প্রবাসীদের ‘অপাত্রে’ সম্মান-স্বীকৃতি দিচ্ছেন। আর ‘পাত্রে’ দেয়া হবে না কেন? নিউইর্য়কের স্থানীয় কথাশিল্পী মোজাম্মেল হোসেন মিন্টুকেও বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার দিয়েছে আর এবার নিউইয়র্কে কোচিং সেন্টারের জন্য মনসুর আলী খানকে শিক্ষায় ‘একুশে পদক’ দেয়া হয়েছে! এসব জনৈক/অজ্ঞাতদের বিষয় নিয়ে কেউ ‘টু’ শব্দটিও করলেন না!
আর মুক্তধারা একুশ বছর ধরে বাঙালির ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে। আমেরিকায় ‘একখণ্ড’ বাংলাদেশ গড়ে তোলায় একক প্রচেষ্টায় নিরলসভাবে অক্লান্ত কাজ করছেন বিশ্বজিৎ। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং আমেরিকা ত্রিমুখী সেতু সৃষ্টি করেছেন।
কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলার ক্ষেত্র স্থাপন করেছেন। প্রতি বছরই নতুন মাত্রা যুক্ত করছেন। যেমন ২০০৫-এ ‘দশ শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ পদক প্রবর্তন। তা নিয়ে অনেকেই তীব্র সমালোচনা করলেও বিশ্বজিৎ তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাননি। এ তাঁর এক বিরল গুণ।
এবার মুক্তধারা উৎসবে যুক্ত হচ্ছে- (ক) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে একাত্তর সালের মার্কিন সহ-মুক্তিযোদ্ধা রিচার্ড ও ফিলিস টেইলরকে শ্রদ্ধা জানানো, (খ) যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দিয়ে বইমেলার উদ্বোধন, (গ) শওকত আলী এবং হুমায়ূন আহমেদকে সম্মাননা প্রদান, (ঘ) জসীমউদদীন কক্ষ, ওয়াহিদুল কক্ষ এবং সেলিম আল দীন কক্ষ ঘোষণা দিয়ে তাতে প্রতিদিনই অনুষ্ঠানমালা, (ঙ) হুমায়ূন আহমেদের প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনী প্রভৃতি।
মুক্তধারা বিদেশের মাটিতে গৌরবোজ্জ্বল বাংলা সংস্কৃতির বিজয়ের পতাকা তুলে ধরছে। তাই আবারো অভিনন্দন জানাই মুক্তধারাকে। শুভেচ্ছা বিশ্বজিৎ সাহাকে।
বাংলাদেশ সময় ১২১৮, জুন ১৯, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com