১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, রবিবার মে ২৬, ২০১৩ ৩:০৫ এএম BDST banglanew24
01 Oct 2012   05:26:09 PM   Monday BdST
E-mail this

তানিম কবির-এর গল্প

বৃত্তার্পিত গান


তানিম কবির
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বৃত্তার্পিত গান তানিম কবির-এর গল্প

শুরুটা
চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। বাতি জ্বাললাম। ঘড়িতে তিনটা বেজে একুশ। ‘ক্যান, তোমার চোখ নাই? ভালা কথা তুমি দেহো নাই, প্যাকেটটা ফালানের আগে একটু নাইড়া চাইরাও দেহন যাইতো না, কোনও শব্দ করেনি?’ আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। ‘ক্যামনে কী করবা তুমি জানো, আমার সিগেট চাই— সোজা কথা।’ ‘কইলামতো খেয়াল করি নাই, বাদ দেয়ন যায় না? ঘুমাও না, কী অইবো অহন না খাইলে?’ ‘ফালতু কথা কবি না, আমার সিগেট দে’। ‘তুই তোকারি করতাছো ক্যান?’ ‘চপ— লাট সাহেবের বেটি আইছে, তারে হুজুর হুজুর করতে হইবো।’ ‘কইলামতো আর এমন হইবো না, আজকে ঘুমাও।’ ‘না। তুই অক্ষন আমার সিগেট দিবি, এতো কিছু বুঝি না— মাগীর ঘরের মাগীর শইলে বাতাস লাগে না, না? গায়ের চামড়া তুইল্যা ফেলমু অক্ষন সিগেট না পাইলে।’ ‘আইচ্ছা আমি কইত্তে পামু অহন সিগারেট?’ প্রথমে চর এবং পরে মিহিস্বরে কান্নার ধ্বনি ভেসে এলো কানে। আমি খুব একটা অবাক হলাম না। বাবা মাকে মারছেন আর মা কাঁদছেন— আমাদের ঘরের দেয়ালবাসিন্দা সবগুলো টিকটিকির কাছেও এটা কমন একটা ঘটনা। তবুও আমি এগিয়ে গেলাম। দরজার এপাশ থেকে বললাম ‘বাবা, থামেনতো এলা, টাকা দেন— আমি আইন্যা দিতাছি।’ বাবা বের হয়ে এলেন। অভিযোগের ভঙ্গিতে বললেন ‘দেখছোস কাণ্ডটা? তিনডা সিগেট লইয়া আইছিলাম। ভাত খাওনের পর একটা আর ঘুমানের আগে একটা ধরাইলাম। পাকনা ঘুমডা ভাঙলো খারাপ খাব দেইখ্যা। উইঠ্যা পানি খাইলাম এক গেলাস। সিগেট ধরামু কইয়া খাটেরতন নামলাম, কিয়ের সিগেট? সব খা খা করতাছে ...’ ‘থাক থাক, আমনেরে অহন ব্যাবাক কিচ্ছা কইতেন কইছি না, টাকা দেন লইয়া আসি।’ ‘এতো রাইতে দোকান খোলা পাবি?’ ‘পামু, আমনে দেননা ...’ বাবা ভেতরে গেল টাকা আনতে, মার কান্নাও থেমে গেছে স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী। বাবা আমাকে এমন সমীহ করার মানুষ না। আমাকেও মাগীর পুত বলে গালি দিয়ে ওঠাটাই ছিলো তার জন্য স্বাভাবিক ছিলো। দিনকয়েক আগে মিহির রোডের খানকি পাড়া থেকে আমি বাবাকে বেরুতে দেখি, বাবাও দেখেন আমায়। তারপর থেকেই হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহার পেয়ে আসছি। আমার ভালোই লাগে। আমি আসলে বাবার ভয়টা উপভোগ করি। অবশ্য বুঝতে পারি না বাবার ভয়টা ঠিক কী নিয়ে। মাকে যদি বলে দিই? কিন্তু সেটার তো কোনও প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাই না। বাবা তো মাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না। ব্যাপারটা আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। ‘নে, দুইডা আনলেই হইবো, আর তুই চা বিস্কিট কিছু খাইস।’ আমি বেরিয়ে গেলাম।

মধ্যবয়ান
আমার নাম কদর। শবে কদরের রাতে জন্ম হয়েছিলো বলে দাদা এই নাম রেখেছিলেন। আগে পিছে আর কিছু নেই। শুধুই কদর। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। পড়াশোনার খরচ চলে টিউশনি করে। কলেজ আর টিউশনির সময় বাদ দিলে যা থাকে তার সবটুকুই ঢালি পার্টি অফিসে। আমি কলেজ শাখার গুরুত্বপূর্ণ একটা পদও দখল করে আছি। আমার পার্টি— স্বপ্ন দেখে এবং বিশ্বাস করে কম্যুনিজমে। আমিও দেখি— স্বপ্ন দেখি, বিশ্বাস করতে কোথায় যেন একটা বাধা অনুভব করি। পার্টি অবশ্য এসব স্বপ্ন ও বিশ্বাস নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করে না। আমরা কর্মীরা সম্ভবত স্বপ্ন আর বিশ্বাসের মাঝখানের ফারাকটুকু বুঝতে চাই না। আমরা একদল অবিশ্বাসী স্বপ্নবাজ। বিশ্বাসের মোড়ক লাগানো স্বপ্নগুলোকে পোস্টারে এঁকে দিই অথবা দেয়াল লিখন অথবা মিছিলে অথবা মিটিংয়ে অথবা আহ্বানে। আমি হাঁটছি। যাচ্ছি স্টেশন রোডের দিকে। ওদিকে কিছু দোকান-পাট খোলা থাকে রাতভর। আর দোকানে বসে থাকা ক্লান্ত দোকানিরা আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মাঝখানে বুনতে থাকে স্বপ্ন। আমার জানতে ইচ্ছে করে, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের স্ব-স্ব স্বপ্নের উপর কতোটুকু বিশ্বাস স্থাপন করেছে আজ অবধি। নীরব রাস্তা। আমি আমার হেঁটে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমার এগিয়ে যাওয়া শব্দে রূপান্তরিত হচ্ছে— আমি উৎসাহ পাই। হণ্টনের উপর আমার আস্থা আসে, আমার মনে হতে থাকে মানুষ এগিয়ে যেতে পারে আর এগিয়ে গেলে যে শব্দ সৃষ্টি হয়— সেই শব্দও অলীক নয়। আমার ভালো লাগে। এবার আমার রাস্তা দ্বি-খণ্ডিত হয়। রেললাইন ঘেঁষা রাস্তাটিই আমার। আমি সেদিকেই পা বাড়াই। ওই তো দেখা যাচ্ছে স্টেশনের সিগনাল বাতি। পাশাপাশি তিনটা সিগনাল ল্যাম্প। দুটোতে লাল জ্বলছে, একটি সবুজ হয়ে আছে। পেছন ফিরে তাকাই। অনেক দূরে ট্রেনের বাতি দেখা যাচ্ছে। আমি আবার হাঁটতে থাকি। শব্দ করে হাঁটতে থাকি— স্বপ্ন আর বিশ্বাসের মাঝখান দিয়ে যেমন শব্দ করে হাঁটতে থাকে সন্দেহ, তেমনি। বাবার কথা মনে আসে। এতোক্ষণে নিশ্চিত ঘুমিয়ে পড়েছে, আর কোনও খারাপ খোয়াব না দেখলে এই ট্রেন চলবে বিরতিহীন— সকাল নয়টা অবধি। আমার আসলে বের হতে ইচ্ছে করছিলো, নয়তো আগ বাড়িয়ে বাবার উপকার করার মতো সুবোধ ছেলে আমি কখনওই নই। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে সিগারেট বের করি। গোল্ডলিফ । কাঠির বারুদে আগুন জ্বলে ওঠার শব্দ কিছুটা অপ্রস্তুত করে দেয়। ট্রেনও হুইসেল বুনলো টানা তিনেক। আমি আবারও হাঁটতে থাকি। নিহারের সেলুনটা বন্ধ। এখানেই ছোটনের সাথে শেষ দেখা। ও চুল কাটছিলো আর আমি বসে ছিলাম পাশের চেয়ারে। ‘একদম ভাববি না আমি চলে গেছি। ওখানে গিয়ে ডলার কামাবো দেদারসে, মাসে যা কামাবো তার অর্ধেক পাঠাবো পার্টির জন্য— দেখিস’- বলছিলো ছোটন। কলেজ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ আরেক সদস্য। আমার হাসি পায়। ছোটন গেছে আজ এক বছরের বেশি হতে চললো। পার্টির কারও কাছে একটা চিঠি দিয়েছে বলেও শুনিনি। ওর বাসায় গিয়ে চিঠি লিখবার ঠিকানা চাইতেই ওরা বললো— ‘ক্যান আইছো আবার, পোলাডার মাথা খারাপ করতে? যোগাযোগ করবা? চিঠি লিখবা? কোনো কাম নাই— যাও, যাও।’ সেখান থেকে ফিরতে গিয়েই প্রথমবার মনে হয়েছিলো কথাটা— আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি আমাদের স্বপ্নগুলোকে?
 
শেষাংশ
এখন আবার নতুন করে ভাবতে থাকি। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি আমার হেঁটে যাওয়ার শব্দ, তারমানে এগিয়ে যাওয়া...। আচ্ছা কেন ভাবছি, শব্দই সত্যি? জানি না। কিন্তু আমার ভাবতে ভালো লাগে। বিশ্বাস আর স্বপ্নের দূরত্ব বিলীন হতে থাকে। এগিয়ে যাওয়ার শব্দের ভেতর আমি আমার সমস্ত অবিশ্বাসগুলোকে মাটি-চাপা দিতে থাকি। আমি হাঁটতে থাকি ...। হাঁটতে হাঁটতে হয়তো একটু ঘুমিয়েও নিই। লম্বা হুইসেল বাজিয়ে বাজিয়ে ট্রেনটা এবার খুব কাছে। আমি জেগে উঠি। ধুলো উড়িয়ে ট্রেনটা তুমুল গতিতে চলে যেতে থাকে আমার পাশ ঘেঁষে। লক্ষ্য করি এবার আর শুনতে পাচ্ছি না আমার এগিয়ে যাওয়ার শব্দগুচ্ছকে। আমি শংকিতবোধ করি। মুঠোবন্দি হাত তুলে চিৎকার করে উঠি— ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই করো ...’ আমি টের পাই আমার ঠোঁট নড়ছে— কিন্তু দানবীয় ট্রেনের হুইসেল আর গতির শব্দের নিচে দলিতমথিত আমার কণ্ঠ— বিশ্বাসহীন স্বপ্ন। আমি কেঁদে উঠি ক্রুদ্ধ চিৎকারে, ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠে আবার।

বাংলাদেশ সময়: ১৬১০ ঘণ্টা, ০১ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান