 |
চট্টগ্রাম: প্রতিকুল আবহাওয়ায় উত্তাল থাকায় মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা টেকনাফে অনুপ্রবেশের জন্য বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী পাড়ি দিতে পারছে না বলে জানিয়েছে বিজিবি। এর ফলে এক সপ্তাহের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পর আপাতত টেকনাফের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
তবে বিজিবি’র আশংকা, আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোহিঙ্গারা আবারও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে পারে। এজন্য অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বিজিবিকে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
নতুন করে ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কোন চেষ্টা না থাকলেও গতকালও (শুক্রবার) দু’জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে চট্টগ্রাম নগরীতে পালিয়ে গেছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে। এর বাইরে গত দু’দিনে টেকনাফে আর কোন অনুপ্রবেশের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হওয়ায় টেনাফের শাহ পরীর দ্বীপসহ আশপাশের এলাকার মানুষের জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে বিজিবি। তবে সীমান্ত ঘেঁষে কিংবা পাড়ি দিয়ে মাছ না ধরা এবং রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সহযোগিতা না করার বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি সূত্র।
টেকনাফে বিজিবি’র ৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জাহিদ হোসেন টেলিফোনে বাংলানিউজকে বলেন, ‘বৈরি আবহাওয়ার কারণে সমুদ্র উত্তাল থাকায় রোহিঙ্গারা আসছে না। এরপরও আমরা আবহাওয়া ও মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকব।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম নাজিমউদ্দিন টেলিফোনে বাংলানিউজকে জানান, শুক্রবার সকাল ৯টা এবং রাত ৯টায় দু’জন লোক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপ হয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে একজন নিজেকে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের লোক পরিচয় দিয়ে আহত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। অনুপ্রবেশকারী অপর ব্যক্তিও চট্টগ্রামে পালিয়ে এসেছেন বলে তিনি জানান।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডু এলাকায় জাতিগত সংঘাতকে কেন্দ্র করে গত রোববার থেকে টেকনাফের দিকে পালিয়ে আসা শুরু করেন রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরুর পর থেকেই রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের আশংকায় টেকনাফে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় অবস্থান নেয় বিজিবি।
গত পাঁচ দিনে বিজিবি ৭২৮ জন রোহিঙ্গাকে এবং কোস্টগার্ড ৪৪ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্নেল জাহিদ হোসেন।
অন্যদিকে টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তাদের হিসাবে গত পাঁচ দিনে ৭৪৬ জন রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর বিপুল সংখ্যক মাছ শিকারী শনিবার সকাল থেকে নাফ নদীতে যাওয়া শুরু করেছেন। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন মাছ শিকার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ঘোলাপাড়া এলাকার কবির আহমদ মাঝি টেলিফোনে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা ৪টি নৌকা আছে। বিজিবি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর আমার দু’টি নৌকা নিয়ে ৩০ জন মাঝি নদীতে মাছ ধরতে গেছে।’
তবে বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের আশংকা, পরিস্থিতি আবারও অস্বাভাবিক হতে পারে। কারণ, কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা, এদেশীয় আদম পাচারকারী দালাল ও কিছু এনজিও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের এদেশে নিয়ে আসতে এখনও নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপের সাধারণ মানুষের আশংকা, মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হলে রোহিঙ্গারা আবারও দলে দলে টেকনাফে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করবেন।
এদিকে মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা ও সামরিক শাসন জারির কারণে বাংলাদেশ থেকে বর্ডার পাশ ও ট্রানজিট পাশ ইস্যু বন্ধ রেখেছে স্থানীয় ইমিগ্রেশন বিভাগ ও বিজিবি। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে দু’দেশের মধ্যে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনও বন্ধ রয়েছে।
টেকনাফে বিজিবি’র ৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জাহিদ হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু খবর পেয়েছি, মিয়ানমারের মংডুতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সেখানকার সরকার তাদের কোন নাগরিককে বিতাড়িত করছে না। তাই, জরুরি অবস্থা উঠে গেলেও আশা করি সরকারের চাপে রোহিঙ্গারা কেউ আসতে চাইবেন না। তবে স্বেচ্ছায় কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে সেটা ভিন্ন কথা।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম নিজামউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘৭৮ সাল ও ৯১ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে চলবে না। কারণ, তখন সরকারই রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। এবার বরং রোহিঙ্গাদের সে দেশের সরকার নিরাপত্তা দিচ্ছে। আশা করি, রোহিঙ্গাদের দেশ ছেড়ে সরার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই মিয়ানমার সরকার জরুরি অবস্থা তুলে নেবে।’
বাংলাদেশ সময় : ১৮১৯ ঘণ্টা, জুন ১৬, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর