 |
(দ্বিতীয় কিস্তি, চার কিস্তিতে সমাপ্ত)
পাশ্চাত্যের মহাকাব্যগুলো কোন বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়ের বিবরণ দেয়; যেমন- হোমারের ‘ইলিয়াড’, ভার্জিলের ‘ইনিড’, মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’। একই ধাঁচ অনুসৃত হয় ‘মেঘনাদবধে’।
অপরদিকে ভারতীয় মহাকাব্যগুলো সুবিশাল ঘটনার ধারাবাহিক পুরো সংকলনে সৃষ্ট। রামায়ণে যতটুকু বাল্মীকি লিখেছেন তা শুরু হয়েছে রামের জন্ম থেকে আর শেষ লঙ্কাজয়ের পর। মহাভারত পাণ্ডবদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাতে কৃষ্ণের প্রধান কাজ থেকে প্রয়াণসহ বিবৃত। গ্যেটে ‘ফাউস্ট’ রচনার সময় এই পথে গিয়েছেন। পাশ্চাত্যের ধাঁচে ভারতীয় আর ভারতীয় ধাঁচে পাশ্চাত্য উভয় প্রজাতির মহাকাব্য দেখা গিয়েছে- আর সকলই সফল। মনে রাখা প্রয়োজন যে, এটি হয়েছে প্রয়োজন মতো। রামায়ণ, মহাভারত, ফাউস্টের সময় পুরো জীবন বা বিশালাংশ কাহিনীতে দেবার দরকার ছিল যেহেতু প্রধান চরিত্রগুলোর কাজের ব্যাপ্তি ততটুক জুড়ে। ইলিয়াড, ওডিসি, ইনিড, মেঘনাদবধে ঘটনার কিছু অংশ হলেই চলেছে, তাই ওটুকুই দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনমতো মহাকাব্য লেখা হয় আর এ ব্যাপারে কোন অঞ্চলের বাধ্যবাধকতা নেই। যেখানে যা চাই সেখানে সেটিই প্রযোজ্য। রামের কাহিনী লিখতে গেলে হোমারকে পুরো জীবনেতিহাস দিতে হত আর বাল্মীকি ট্রয়ের উপাখ্যানের বেলা একই কাজ করতেন। কেন, তা হল প্রশ্ন?
পাশ্চাত্যের মহাকাব্যগুলোর প্রথমে একটি মুখবন্ধ থাকে যেখানে কবি দ্বারা কাহিনী বলার প্রকৃত উদ্দেশ্য বিবৃত থাকে আর তা বোঝা অশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইলিয়াডের সূচনা স্মরণ করি-
“Sing, O goddess, the anger of Achilles son of Peleus, that brought countless ills upon the Achaeans. Many a brave soul did it send hurrying down to Hades, and many a hero did it yield a prey to dogs and vultures, for so were the counsels of Jove fulfilled from the day on which the son of Atreus, king of men, and great Achilles, first fell out with one another.”
ট্রয়ের ময়দানে অপমানিত একিলিসের রণাঙ্গন ত্যাগ, গ্রিকদের চরম বিপত্তি দেখেও ফিরতে অস্বীকৃতি আর পরিণামে এদের গণমৃত্যু তাই মুখবন্ধে রেখে হোমার মহাকাব্য কি কারণে লিখেছেন বুঝিয়েছেন। তা কী?
একিলিসের মত যারা বীর যোদ্ধা ছিল, তারা তৎকালে একের পর এক জনপদ জয় করে চলত, কিন্তু সেটি ছিল নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে। সেটির লঙ্ঘন হলে তারা মুখ ফিরিয়ে নিত এমনকি বড় জাতীয় প্রয়োজনের বেলাতেও। অথচ তারা চাইলে দেশের বিভিন্ন ছোট এলাকা জয় করে তা এক করতে পারতো, যা চীন, ইউরোপে দেখা গিয়েছে। হোমার এই ভবিষ্যৎ বহু আগে দেখেছিলেন তার প্রখর প্রতিভার কারণে। তাই একিলিসের মত বীরদের জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হোমার এই কাব্য লিখেছেন। পেট্রোক্লাসের মৃত্যুতে দেখানো হয়েছে যে এ ধরনের ঘটনা শেষ পরিণামে তাদেরই ক্ষতি হবে কারণ জীবনে বেঁচে থাকার জন্য যে প্রীতি প্রয়োজন, তা তাদের স্বার্থপরতার দোষে তারা হারিয়ে ফেলবে। সেটি দেখিয়ে একিলিসদের অনুপ্রাণিত করাই ছিল ইলিয়াডে লেখার কারণ। বাস্তবে এ ঘটনার বড় প্রমাণ হোমারের পরবর্তীকালে এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিতে দেখা যায়। কে সে?
আলেকজান্ডারের ক্ষেত্রে। উদ্দেশ্যহীন খামখেয়ালীভাবে পৃথিবী জয় করে তার ক্ষণস্থায়ীত্ব বুঝে সে নিজেই শেষে হতাশ হয়ে পড়ে। আজ তার প্রধান কীর্তি ধরা হয় ‘হেলেনাইজেশন’, আলেকজান্দ্রিয়ার মতো শহর নির্মাণ, বিশ্বজয় নয়। হোমারের সতকর্তার দরকার তাতে বোঝা যায়। এ কারণেই তিনি প্রকৃত মহাকবি।
অথচ হোমার তুল্য মহাকবি শেক্সপিয়র তার ‘Troilus And Cressida’ নাটকে একিলিস সহ ‘ইলিয়াডের’ প্রতিটি চরিত্রের অঙ্কন করলেন ভিন্নভাবে। একিলিস, অ্যাজাক্সের মতো যেসব যোদ্ধা ইলিয়াডে ছিল বীর; এখানে তারা হল মূর্খ, কাপুরূষ, গোয়ার, অপদার্থ, পাষণ্ড। আর আগামেনন, নেস্টর, ওডিসিয়াসের মত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাজনীতিকেরা গুরুত্ব পেল সর্বাধিক। শেক্সপিয়রের এ কাজও সঠিক, কেন?
শেক্সপিয়রের সময় জাতিরাষ্ট্র গঠন হয়েছে কিংবা হওয়ার মুখে। শেষ পর্যন্ত কিছু ফালতু, দাম্ভিক, মত্ত, অহঙ্কারী জমিদার ছাড়া প্রত্যেকেই বৃহৎ জনস্বার্থে নতি স্বীকার করেছে। এবং যে মর্কটের দল করেনি এই লেখায় তারা একিলিস, অ্যাজাক্সের রূপকের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। অপরদিকে রাজশক্তি, সময় নিয়ে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, কূটনীতি- এই তিনের প্রতীক আগামেনন, নেস্টর, ইউলিসিসের প্রশংশা করা হয়েছে। এর দ্বারা শেক্সপিয়রের সমাজচেতনার গভীরতা আর যুগোপোযোগিতা প্রকাশ পেয়েছে। হোমার থেকে সরে গিয়ে শেক্সপিয়র কি ইতিহাস বিকৃত করেছেন? উত্তর-না।
মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইলিয়াডের চরিত্রগুলো পৌরাণিক আর এরা বাস্তব হলেও হোমারের কাব্যে নাম আছে দেখে তারা বেঁচে আছে। হোমার, শেক্সপিয়র দুজনই ইলিয়াডের চরিত্রগুলো থেকে শ্রেষ্ঠ এবং যেহেতু এরা কোন বিশেষ ঐতিহাসিক সত্তা নয় সেহেতু প্রয়োজনমতো উপমা হিসেবে তাদের ব্যবহারের অধিকার কবিদের আছে। বায়রন ঠিকই বলেছেন-
“ Brave men were living before Agamemnon
And since, exceeding valorous and sage,
A good deal like him too, though quite the same none;
But then they shone not on the poet’s page”
কিন্তু একই কথা কি আমরা আলেকজান্ডারের বেলায় বলতে পারব?
“How many ages hence
Shall this our lofty scene be acted o’ver,
In states unborn and accents yet unknown”
শেক্সপিয়রের এ কথাও তো সত্য। সিজারের মতো ব্যাপক চরিত্রের উপস্থিতির কারণে সাহিত্য বিশেষ ঘটনাকে নিজের চিত্রায়নে আশ্রয় করে সিজাররে মতো চরিত্র যা করে তা অন্য কেউ করার ক্ষমতা রাখে না। এবং সাহিত্যিকরা নিজ প্রয়োজনেই তা ব্যবহার করে সেসব অমর ব্যক্তিকে। যদিও উক্তিটি নির্গত হয়েছে ক্যাসিয়াসের মতো কুলাঙ্গার, স্বার্থপর চরিত্রের মুখ দিয়ে সিজারহত্যার ন্যায় অসৎ কাজের কৃতিত্বের দাবি নিয়ে, কিন্তু তা স্বার্থক। যেহেতু সে যাকে হত্যা করেছে তার নাম জুলিয়াস সিজার। এখন সাহিত্যিকরা চাইলেও খালি এমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং যে কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রের বেলায় সে কাজ করতে পারেন না। এখানে মতপার্থক্য হতে পারে যেমন গ্যেটে একভাবে আর তলস্তয় অন্যভাবে নেপোলিয়নকে দেখতো। সেখানেও সততা ও অসততা নিয়ে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রয়োজনমতো চরিত্রবদল এখানে চলবে না এবং তা পৌরাণিক উপায়ে যেসব ঐতিহাসিক সত্তার ইতিহাস লেখা হয়েছে তাদের বেলাতেও সত্য। মেঘনাদবধে সে সমস্যা দেখা গিয়েছে।
‘সীতা’ রূপক হতে পারে, কিন্তু রাম যে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। একি কথা খাটে কৃষ্ণের বেলাতেও। ভারতবর্ষের গঠনে তাদের অবদান বিশাল। কল্পকাহিনী এদের নিয়ে যতই গড়ে উঠুক না কেন, বাস্তবেও দুজনের বিস্তৃতি অনুধাবনযোগ্য এবং রামায়ণ-মহাভারতের পূর্বেই এদের অবদান প্রচারিত ছিল। বিভিন্ন এলাকায় রামায়ণ-মহাভারতের ঘটনার ভিন্নরূপের উপস্থিতি তারই প্রমাণ। বাল্মীকি বেদব্যাসের হাতে তা পূর্ণতা পায়। এই দুই কবি তাদের জীবন এমন নিখুঁতভাবে বড় ফ্রেমে আবদ্ধ করেছেন যে তাদের অবদান, সমস্যা সবই চিত্রায়িত হয়েছে। তাই বাকিদের লেখা লোপ পেয়ে যায়, কিন্তু ভারতের কয়েক এলাকায় বেঁচে থাকা উপকথাগুলো প্রমাণ করে তারা দুই কাব্যের কবি ছাড়াও বাঁচতেন। এদের মধ্যে রামায়ণে বাস্তব ঘটনার চেয়ে কল্পিত প্রসঙ্গ টেনে কবিকে রামের ইতিহাস লিখতে হয়েছে যেহেতু বাস্তবে রামের বেশিরভাগ জীবন কৃষ্ণের মতো সুরক্ষিত ঐতিহাসিক চরিত্রদের সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে যায়নি। আধুনিক ইতিহাস লিখলে তা হারিয়ে যেত আর মনে রাখা প্রয়োজন যে, রামের কর্ম ওতে নিখুঁতভাবে আসার কারণেই কেবল বাকিগুলো লোপ পায় এবং পরে যে ইতিহাস বিকৃতি ঘটে রামায়ণের মূল অংশে কিছু বদল এনে এবং আরেক কাণ্ড যোগ করে, সেটিও এর বিশুদ্ধতার কারণে সবার সামনে ধরা পড়ে। এখন দেখার বিষয় রামের প্রকৃত অবস্থান কি?
দুঃখের ঘটনা প্রায় সবাই রামকে আর্য আর তার অভিযানকে আর্যজাতির জয়যাত্রা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক রবীন্দ্রনাথও এর বাহিরে নন। কিন্তু সত্য তা থেকে পুরো ভিন্ন। আর্য বলে কোনো নির্দিষ্ট জাতিসত্তা নাই। যখনই কোন জাতি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অপর জাতিকে জয় করেছে, নিজের সাম্রাজ্যবাদকে নায্য বানাতে আপনাকে শ্রেষ্ঠ বিশেষ আর্য শ্রেণির বাসিন্দা হিসেবে ঘোষণা দেয়। ভারতবর্ষের সেই আর্যদের এক জাতি না ভাবার ভালো কারণ আছে। পরবর্তী যুগে সাম্রাজ্যের লোভে ভারতে একাধিক জাতি এসেছে এবং তা তুর্কি, ইরানি, মোঙ্গল, আফগান, ফরাসি সহ বহু যাতে সবচেয়ে বড় দাও মেরেছে ইংরেজরা। ঐ কালেও নিশ্চিতভাবে একই ঘটনা ঘটেছিল। তবে যারা বর্ণপ্রথা বানায় তাদের প্রভাব সবচেয়ে ব্যাপক আর ভয়ঙ্কর। কিন্তু রাম কখনই নিজেকে আর্য বলে দাবি করেনি। পুরো জীবনই তার অবস্থান ছিল জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। বাল্মীকি অবশ্য তার থেকেও জ্ঞানী ছিলেন এবং নিখুঁতভাবে তৎকালীন ইতিহাস ও এর প্রধান চরিত্রের বিশেষায়ণ দ্বারা চিরকালীন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।
পুরাণে প্রায়ই দেবতাদের তথাকথিত নিচ রাক্ষস জাতিকে সর্বাংশে নিধনের ঘটনা দেখা যায়। নিঃসন্দেহে সেগুলো নিচ জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর নিজেদের দেবতা বলে চালানো প্রোপাগান্ডা। এখন ভারতে যেখানে যারা যখন জিতেছে তারাই নিজেদের বলেছে আর্য, দেবতা আর অপরকে রাক্ষস, অনার্য। আর রাম?
রামায়ণ যারা পড়েছেন, তারা মাত্রই একটি কথা জানেন রাম নিজেকে দাবি করেছেন মানুষ। দেবতা, অসুর, গন্ধর্ব, পক্ষী ইত্যাদি যেগুলো সেই কালের ‘উচ্চ’ জাতি ছিল তাদের অংশ না বলে অযোধ্যার অভিবাসী এই বীর নিজেকে দাবি করেছে তাই যা সে বাস্তবে ছিল।
রাবণ ব্রক্ষ্মার কাছে যাদের থেকে বাঁচার বর চেয়েছিল তাতে যেসব জাতির উল্লেখ আছে, তার মধ্যে মানুষ, বানর, ভল্লুক এরা নেই। কাহিনীটা অবাস্তব হতে পারে, কিন্তু তার বক্তব্যটুকু স্পষ্ট সত্য। রাবণের সাম্রাজ্যবাদী, জাতিচিন্তায় ভরা বিকৃত চরিত্র এতে ফুটে উঠেছে আর রামের সাথে তার দ্বন্দ্ব এখানেই। সে ভারতের ঐক্যকারী। বানর, ভল্লুক নামে যেসব জাতিকে নীচ ধরা হত, তাদের সাথে সন্ধি করেছে সমশর্তে, সমজ্ঞানে। লঙ্কা জয়ের পর সিংহাসনে রাক্ষসদের প্রতিনিধি বিভীষণকেই বসিয়েছে, ওতে উপনিবেশ স্থাপন করেনি। আর রাবণ একের পর এক জনপদ ধ্বংস দ্বারা যে ত্রাসের রাজত্ব বানায়, সেটির বিনাশ করতেই রামের লঙ্কা অভিযান ছিল আর তাই সে মহান। রামায়ণের কবি সে জন্য মধুসূদনের মত রাবণের হীনতা ঘটাননি নিজ গল্পের নায়ককে বড় করতে। অবশ্য সে কারণেই বাল্মীকি বাল্মীকি আর মধুসূদন মধুসূদন।
রাবণের রাষ্ট্র সংগঠন অবশ্যই মহান। তবে এটা বলা কঠিন যে আসলেই রাবণ বলে কেউ ছিল কিনা। হতে পারে বাল্মীকি সবোর্চ্চ সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক হিসেবে তাকে বানিয়েছেন যা সীতার মতোই রূপক আর তার দ্বারা রাজনীতি থেকে নর-নারীর সম্পর্ক সবই ব্যাখ্যা করেছেন। অবশ্যই সে বীরযোদ্ধা, রাষ্ট্র সংগঠক। রাজ্যজয়ী লুণ্ঠক হলেও আগে এইসব গুণ তাকে দেখাতে হয়েছে। কিন্তু সেসব হিটলার, চেঙ্গিস খানের মাঝেও ছিল। তবু তারা যেমন সাম্রাজ্যবাদের জন্য ঘৃণিত, রাবণও তাই। মানবতাবাদের অমরতা মহাকবি গেয়েছেন, তাই বলে রাবণকে ছোট করেননি; আবার রামের অতিস্তুতি হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ সত্যিই বলেছেন যে রামায়ণ পরযুগে বিকৃত হয়েছে। উত্তরকাণ্ড তো পুরোটাই অন্যের লেখা। আসল রামায়ণের বহু জায়গা সুবিধাবাদি চক্র বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শক্তিশালী প্রাসাদ রাজনীতির হাতে রামের নির্বাসন পরিণত হয়েছে একতরফা রোজকার পারিবারিক ঘটনায়। আর এখানেই প্রথম দৃষ্ট হয় রামের প্রবল লোকপ্রিয়তা যা তার প্রধান দৌর্বল্য এবং এর নিন্দায় বাল্মীকি কুন্ঠিত হননি।
রাম যে ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল তাকে সহজ কথায় বলা যায় ‘ভালো সাজার চেষ্টা’। এর রোগীরা লোকে ভালো বলবে জানলে সাত চড়ে রা করে না, যা বলে তাই শোনে। ব্রাক্ষণেরা ভারতে একে গুণ বানিয়েছে নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে। মানুষের ঘরে এসে চেয়ে সব নিয়ে যেতে পারার যে সুবিধা তারা পেয়েছে, সে ও ব্যাধি না ঢোকালে হত না। যুগে যুগে এর ফলেই ভারত পিছিয়ে পড়েছে, দাস হয়েছে অন্যের। বিনিময়ে ‘সোনামণি’, ‘গুড নেটিভ’ উপাধি পেয়েছে। ফলাফলে রামের মতো মানুষকেও ভুগতে হয়েছে। কোন মানুষ নিজের উপর হওয়া অনাচার রোধ না করতে পারলে অপরেরটা ঠেকাবে কিভাবে? তাছাড়া যাদের জন্য তা করা তারাতো ভালো নয়। রামায়ণেই ওর প্রমাণ আছে।
দশরথের কৈকয়ীর কাছে গিয়ে শপথের বেড়াজালে পড়ার দৃশ্য মনে করি-
‘‘এদিকে রাজা দশরথ রামের রাজ্যাভিষেক আদেশ প্রদান করিয়া সভাস্থ সমস্ত লাকের অনুমতি গ্রহনপূর্বক অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন।”
‘‘শয়নপুরে প্রিয়তমা কৈকয়ীকে খুঁজে পাবার পরে দেখলেন সে ধূলিশয্যায় ক্ষুব্ধ হয়ে শুয়ে আছে।’’
তখন তাকে খুশি করার নমুনা কি ছিল-
‘‘প্রিয়ে, তোমার প্রেমে মন উন্মত্ত হইয়া আছে; এক্ষণে বল, কোন নিরাপরাধকে বধ এবং কোন অপরাধীকেই বা মুক্ত করিতে হইবে? আমি তোমার কোন ইচ্ছারই প্রতিরোধ করিতে সাহসী নহি। যদি নিজের প্রাণ দিয়াও তাহা পূর্ণ করিতে পারি, করিব।’’
বাহহহহ! কি কথা! রামকে নির্বাসনে না পাঠালে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ, দুর্নাম! অথচ রাজা কি ন্যায়কর্তা হিসেবে শপথ নেননি। বাস্তবে এরকম অনাচার তো হামেশাই ঘটে, লোকে না পেরে মেনেও নেয়। আর যারা দশরথকে ভালো বানিয়েছে রামের নির্বাসনের কালে, তারাই আসল নিন্দার বেলায় সেটি করে তো নাইই, বরং যারা করতে চেয়েছে তাদেরও গলা নিশ্চিতভাবে চেপে ধরেছে কারণ তাদের লাভ কিসে তা তারা ভালোই জানে। দশরথ অন্য সময় যা ইচ্ছা তাই করে, কে কি বলার সাহস পাবে? অথচ রামেরটা ছড়াবে, সবাই জানবে, বলাবলি করবে। তাই বাছা নির্বাসনে যাও, তবু ইজ্জত রাখ। আমি লোক দেখাতে শোক দেখিয়ে মরতেও পারি, কিন্তু ন্যায়, নৈব চ নৈব! বঙ্কিম যথার্থই বলেছেন-
‘‘এখানে দশরথ স্বার্থপরতাশূন্য নহেন। শপথ ভঙ্গে জগতে তাহার কলঙ্ক ঘোষিত হইবে, এই ভয়েই তিনি রামকে অধিকারচ্যুত এবং বহিষ্কৃত করিলেন, অতএব যশোরক্ষারূপ স্বার্থের বশীভূত হইয়া রামের অনিষ্ট করিলেন। সত্য বটে, তিনি আপনার প্রাণহানিও স্বীকার করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার কাছে প্রাণাপেক্ষা যশ প্রিয়, অতএব আপনার ইষ্টই খুঁজিয়াছিলেন। এজন্য তিনি স্বার্থপর। স্বাথপরতা দোষযুক্ত যে অনিষ্ট, তাহা ঘোরতর পাপ।’’
আর রাম, বাপকা বেটা এ দোষে আরো দুষ্ট। তার উচিত ছিল দশরথকে কৈকয়ীর সাথে মিলে বন্দী, প্রয়োজনে হত্যা করা। কিন্তু লোকে কি বলবে ভেবে সে কাজ তো দূরে থাক, বরং ভালো সাজতে বনে গেল। এমনকি দশরথের মৃত্যুর পরও ফিরলো না। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাল্মীকিরও গিয়েছিল আর সে জন্য রামের স্বভাবকে ব্যাঙ্গ করতে তৈরি করেছিলেন হনুমান চরিত্র।
হনুমান হল সৎ স্বাভাবিক মহৎ কাজের ডাকে অনুপ্রাণিত তেজোময় জনশক্তির প্রতীক যা যে কোন জাগরণের কালে উঠে আসে আর বহু অসাধ্য সাধন করে। লঙ্কাগমন, তা দাহ, বহু ঘোর শত্রু বধ এসবের দ্বারা বাল্মীকি তাই দেখিয়েছেন। আর এ স্বাভাবিক শক্তি যা নির্ভীক; রামের প্রতি ব্যাঙ্গ ছুড়ে দেয়। কিন্তু রাম নিজের প্রাপ্র্য থেকে দূরে থাকে না। তার প্রজ্ঞা, বীরত্ব, অপার হৃদয় যে কোন যুগের মানুষকে মোহিত করতে পারে যার মধ্যে সবচেয়ে মহান মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্য। এর থেকে খালি একবার সরে যাবার কারণও ছিল ভালো সাজার ফল।
রামায়ণে রামের যে একটি জনপদ ধ্বংসের চিত্র দেখা যায় তা হল সমুদ্র আক্রমন। সম্ভবত রামের লঙ্কা গমনের জন্য সমুদ্রবর্তী কোন রাজ্যের এলাকা দিয়ে যাবার প্রয়োজন ছিল যার বাসিন্দারা মোটামুটি প্রবল কেউ। এখন যে কোন বড় রাজনীতির একটি চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে আর সেটি বাস্তবায়নের জন্য ছলে, বলে, কৌশলে যে কোন কিছু করা হল এর প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব। রামের কাজ হল রাবণের হত্যা আর জাতীয়তাবাদের মূলোচ্ছেদ ও সে উদ্দেশ্য যে কোন কিছু করা ছিল নায্য। আর তার জন্য তাকে নতজানু নয়, বরং হতে হতো শক্তিশালী আর যে কাউকে পথের বাধা হলে দিতে হত শাস্তি। বাস্তবে কারো কাছে বিনয় দেখালে বিশেষ করে ভারতের মতো এলাকায়, মানুষ তাকে দুর্বলতা ভেবে মজা পায় আর ভোগায়। রাম সম্ভবত প্রথমে তাদের কাছে বিবেকের প্রতি আহবান জানিয়ে রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিতে প্রার্থনা জানায় আর গাধার মত এরা তাকে অর্থব ভেবে অনুরোধ রাখা পরে থাক, পাল্টা জবাবও দেয়নি। এখন রাম যতই লোকপ্রিয় হোক না কেন, সে নিজের বল জানে আর অমরতা অর্জন করতে হবে ওটিও মাথায় আছে। তাই এখানে গিয়ে সে খেপে যায় আর ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা চালায়। এই বিচক্ষণতা সে পূর্বেও দেখিয়েছে বালীবধ করে। এত প্রবল পক্ষকে জয় করা কঠিন হত আর অপরপক্ষ না চেলে মিত্রতা করা ছিল অসম্ভব। তাছাড়া সে সময় সন্ধি হলেও পক্ষে বহু ক্ষেত্রে বিরোধ লাগত যেহেতু এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারে না ও বাল্মীকি সে কারণেই তা সমর্থন করেছেন। বালীর হিংস্র চরিত্রের জন্য তার হাতে লঙ্কাজয় শেষে গণহত্যা হত আর ও বিচারেও এ হত্যা ঠিক আছে। ফেরত আসা যাক আগের কথায়। রামের সেই সমুদ্র উপকূলবাসীদের উপর হামলা ছিল নিরূপায় দশায় পড়ে বাধ্য হয়ে হামলা। কিন্তু প্রথম থেকেই যদি রাম কাঠিন্য দেখাত, তবে এরা আগেই ভয়ে থাকত ও শেষে এ হামলা না চালালেও হত। এখন এটি জাতীয়তাবাদ নয়, যা বহুসময় আবেগে পরিচালিত যুবশক্তি মনে করে। এদের প্রতীক লক্ষণের উক্তিতে সেটি স্পষ্ট-
‘‘আর্য! সমুদ্রকে এই রূপে ক্ষুভিত করা ব্যতীত আপনার কার্যসাধন হইতে পারে। ভবাদৃশ লোক কদাচই ক্রোধের বশীভূত হন না। এক্ষণে আপনি কার্যসিদ্ধির কোন উৎকৃষ্ট উপায় অন্বেষণ করুন ।’’
সেই মুহূর্তে যুবকেরা জাতীয়তাবাদী নির্যাতনে ক্লান্ত আর তাই মহৎ আবেগে পূর্ণ। রামের ক্রোধে এরা ভীত ও পূর্বে দৃষ্টান্ত না দেখার কারণে তার কাজকে জাতীয়তাবাদ ভেবেছে। এদের মনের এ অবস্থা বোঝা যায় ‘আর্য’ সম্ভাষণে। এটি জাতীয়তাদের প্রতীক আর মহাকবি প্রেক্ষাপট বুঝে চরিত্রের মনোদশা অনুযায়ী উক্তি বসিয়েছেন।
কিন্তু এর মানে এ নয় যে, যুবশক্তি জ্ঞানী রামের থেকে মহৎ, যা প্রজ্ঞাপূর্ণ। যখন এরা জয়ের মুখে এসে দাড়ায় তখন ক্রোধের ফলে একই রকমের আগ্রাসন চালাতে চায়। ইন্দ্রজিৎ বধের জন্য বানরসেনারা মিলে রাম লক্ষণের লঙ্কা প্রবেশ কালে ক্রোধে যখন সে বলে-
‘‘আর্য! আজ আমি রাক্ষসজাতির উচ্ছেদকামনায় ব্রক্ষ্মাস্ত্র প্রয়োগ করিব।’’ তখন সে চিত্র স্পষ্ট ধরা পড়ে।
এখন ‘আর্য’ বাস্তবেই আর্য, বহুদিনের ক্ষোভের শেষে বিজয়কালে ক্রোধে লক্ষণের মন এ দশায় এসেছে। শুধু উৎসাহ পেলে রাগে তাই হবে যা এতদিন ঘৃণা করে এসেছে। কিন্তু রাম এ জায়গাতেই তার প্রজ্ঞা দেখিয়ে বুঝিয়েছে কেন মহামানব। উত্তরেও বোঝা যায়-
‘‘বৎস! দেখ একজনের নিমিত্তে রাক্ষসজাতিকে উচ্ছেদ করা তোমার উচিৎ নহে। যাহারা সংগ্রামে বিমুখ, ভয়ে লুক্কায়িত, কৃতাজ্ঞলিপুটে শরণাগত, পলায়মান এবং প্রমত্ত তাহাদিগকে বধ করা তোমার উচিত হইতেছে না। এইক্ষণে আইস আমরা কেবল ইন্দ্রজিতের বধোদ্দেশে যত্ন করি।’’
আসলে যুবকেরা যে অনভিজ্ঞ শিশু তার বোধ যে রামের আছে এর প্রমাণ এই ‘বৎস’ উক্তিতে। রামায়ণে এই শব্দ প্রয়োগে মহাকবি রূপকতা নিয়েছেন খুবি সাবধানে। অথচ রাবণের চরিত্রটা কিরকম? সমুদ্রে সেতু সংযোগের খবরে রাবণের মন্ত্রণাকালে যে প্রার্থনা তাতেই নমুনা আছে-
‘‘অনন্তর জলদকায় সেনাপতি প্রহস্ত কৃতাজ্ঞলিপুটে রাক্ষসরাজ রাবণকে কহিতে লাগিল, রাজন! মনুষ্য তো সামান্য কথা, আমি স্বয়ং সুরাসুর গন্ধর্বকেও পরাজয় করিতে পারি।’’
‘‘আপনি আজ্ঞা করুন, আমি এই শৈলকাননপূর্ণা পৃথিবীকে বানরশূণ্য করিব।’’
সুযোগ পেলে রাবণ যে তা করত সে ব্যাপারে সন্দেহ আশা করি ঘোরতর রামবিদ্বেষীরও নেই, অবশ্য ঐক্যমত থাকতে পারে। মানুষ নামের পশু সবখানেই আছে। কেউ বলতে পারে, লঙ্কাজয় কালে বানরেরা ধ্বংস চালায়। কিন্তু সেটি বহুদিনের ক্রোধে বিরক্ত জাতির প্রতিহিংসা যার পুরো নিবৃতি অসম্ভব। কিন্তু তা গণহত্যা নয় এবং ও যে হয়নি তাও রামের কারণেই।
রাম রাবণের এই ভিন্নতা রামের বিশালতার প্রমাণ যার গান বাল্মীকি গেয়েছেন তার অমর কাব্যে। কবি প্রজ্ঞায় রামকেও ছাড়িয়েছেন, কিন্তু যার গাঁথা গেয়েছেন সে নিজেও ইতিহাসের চরিত্র, কল্পনা নয়। রূপক দশাতেও তাকে বিকৃত করা কারো অধিকারে নেই। বাল্মীকি ইতিহাস জানতেন, তার হাতে সেরকম বিকৃতি ঘটেওনি। মধুসূদনসহ বাকিদের বেলা রামায়ণের উপর নির্ভর করতে হত, সেখানে কেউ বুঝতে ভুল করলে ভিন্ন কথা, কিন্তু তারপরও বিকৃতি ঘটালে অপরাধ। মেঘনাদবধের কবি তাই করেছেন। তবুও এ কাব্য অমর আর পুরো বিষয়টির আলোচনা প্রয়োজন।
(চলবে…)
বাংলাদেশ সময়: ১৯১০ ঘণ্টা, ৩০ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর