 |
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র শিল্প-সাহিত্য বিভাগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে প্রকাশনা শিল্পের সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনার নানা দিক। সম্প্রতি প্রকাশনার মান, পাঠকের অপ্রতুলতা, বইমেলা আয়োজন, লেখক রয়্যালটি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর ভূমিকা প্রভৃতি বিষয় মতবিনিময় সভায় তুলে ধরেন উপস্থিত লেখক ও প্রকাশকেরা। বিদ্যমান সংকটাপন্ন প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেন লেখক-প্রকাশক ও সচেতন পাঠকেরা।

পাণ্ডুলিপি সম্পাদক, রাখাল রাহা অভিযোগ করে বলেন, “প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে প্রধান অন্তরায় রাষ্ট্র। বই এমন একটি পণ্য যার চাহিদা দুনিয়া জুড়েই বাড়েনি। পণ্য হিসেবে বই যে ধরনের চরিত্র ধারণ করে তা অন্য আর ১০টি পণ্যের চেয়ে ভিন্ন, বইয়ের এই চরিত্রের মধ্যেই আছে বইয়ের প্রতি চাহিদা না থাকার সীমাবদ্ধতা।”
তিনি বলেন, “সর্বত্রই বইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রোমোট করে চাহিদা বাড়ানো হয়েছে রাষ্ট্রেরই স্বার্থে। রাষ্ট্র শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি করে থাকে। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে পাঠকের সংখ্যা বিপুল সেখানেও পূর্বে বইয়ের প্রতি চাহিদা ছিল না, সেখানে রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে বইয়ের চাহিদা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে রাষ্ট্র সরাসরি এই শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি বাংলা একাডেমী, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারাও এখানে প্রকাশনা শিল্পের কোনও বিকাশ ঘটছে না।”
বাংলাদেশে প্রকাশনা শিল্পের বিদ্যমান পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে সংহতি প্রকাশনের প্রকাশক ও প্রাবন্ধিক
ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘ব্যক্তি কোথাও-ই বইয়ের প্রধান ক্রেতা নয়। পৃথিবীজুড়ে বইয়ের প্রধান ক্রেতা সরকার ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশকের প্রধান ক্রেতা। কিন্তু আমাদের এখানে পাঠাগার, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বই কেনার সংস্কৃতি বিকশিত হয়নি। এই চিত্র যদি না বদলায় তো প্রকাশনা শিল্পের বিকাশের কোনো সম্ভাবনা নেই। এর সঙ্গে জাতি গঠনের বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে।”
লেখক রয়্যালটি প্রসঙ্গে ফিরোজ আহমেদ বলেন, “লেখকদের যে সামান্য পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয়, প্রকাশকের পক্ষ থেকে তা বৃদ্ধি করা না গেলে মননশীল, গবেষণাধর্মী ও অনুবাদের ক্ষেত্রে মানসম্মত বই যথেষ্ট মাত্রায় প্রকাশকেরা পাবেন না। লেখকেরা অন্যত্র তার মেধাশ্রম ব্যয় করবেন এটাই স্বাভাবিক। আবার প্রকাশকেরাও লেখককে যথার্থ সম্মানী প্রদান করতে পারবেন না যদি বইয়ের পাঠক অর্থাৎ বই বিক্রি না বাড়ে। আর এখানেই রাষ্ট্র বা সরকারের ভূমিকা পালন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার কর্তৃক বই ক্রয়ের বিষয়টি জরুরি হয়ে পড়ে।”
লেখক ও সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদ বলেন, “প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রবন্ধের বই পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হয়। কারণ সেখানে পাঠাগার বা বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেই বইগুলি ক্রয় করে।”

এ প্রসঙ্গে মাহবুব মোর্শেদ আরো বলেন, “কিন্তু আমাদের এখানে পাঠাগার সংস্কৃতি তো গড়ে ওঠে নাই। এখন এই সময়ে এসে তা আর গড়ে উঠবেও না, এখন সাইবার ক্যাফে হবে কিন্তু পাঠাগার হবে না। তাই লেখক-প্রকাশকদের বইয়ের বাজার বিস্তৃতির জন্য ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। বইকে প্রোমোট করতে গণমাধ্যম এবং প্রকাশকদের মাঝে একটা চুক্তি হতে পারে, হতে পারে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। পত্রিকাগুলি নিয়মিত বিভিন্ন বইয়ের রিভিয়্যু প্রকাশ করতে পারে। প্রকাশক ও গণমাধ্যমের একটা সমন্বিত প্রয়াসের মধ্য দিয়েই বইয়ের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে। অন্যান্য পণ্যের বিক্রেতা তো ক্রেতার কাছে পৌঁছায় কিন্তু প্রকাশকেরা পাঠকের কাছে তার পণ্য নিয়ে হাজির হয় না।”
বইমেলোর স্থানান্তর প্রসঙ্গে তিনি প্রকাশকদের দাবির সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, “বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বইমেলা যেভাবে হচ্ছে তা হোক; এর সাথে আমাদের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রকাশকেরা আলাদাভাবে আরো বইমেলা আয়োজন করতে পারে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে বইমেলা করে সর্বস্তরের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন তাদের বই। আর গণমাধ্যম সেই বইমেলাগুলিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ তরান্বিত হতে পারে।”
বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৬ ঘণ্টা, ২৮ জানুয়ারি ২০১৩
এমজেএফ/আরআর-pageeditor@banglanews24.com