 |
ঢাকা: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স যেখানে মাত্র ৩০ কোটি টাকায় কূপ খনন করেছে, সেই একই এলাকায় একই ধরণের কূপ খনন করতে গাজপ্রমের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়।
এ ছাড়া যে সব কূপ খনন করার জন্য গাজপ্রমকে কাজ দেওয়া হয়েছে, সে কূপগুলো এখনই খনন করার কোনো অর্থই দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
বাপেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, বাপেক্সের যে পাঁচটি কূপ উন্নয়নের জন্য গাজপ্রমকে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো যথার্থতা নেই। কারণ ওই সব এলাকায় গ্যাস পাওয়া গেলেও শিগগিরই সে গ্যাস ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই।
কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা জানান, শাহবাজপুর ও বেগমগঞ্জে কোনো প্রসেস প্লান্ট নেই। সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা জাতীয় গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হবে না।
একটি প্রসেস প্লান্ট বসাতে ৩ বছরের মতো সময় লাগে দাবি করে ওই কর্মকর্তা জানান, শাহবাজপুরে দুই নম্বর কূপটি ২০০৮ সালে গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। কিন্তু প্রসেস প্লান্টের অভাবে এখান থেকে এখনও গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না।
ওই কর্মকর্তার মতে, একটি প্রসেস প্লান্ট স্থাপন করার জন্য কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করেও উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাচ্ছে না। একবার মাত্র একটি দরপত্র পড়েছে।
তার মতে এসব এলাকায় প্রসেস প্লান্ট ছাড়াই এসব কূপ খনন করে পক্ষান্তরে দেশের ক্ষতিই করা হয়েছে। এসব কূপ যদি বাপেক্স ধীরে ধীরে করতো তাহলে অর্থ সাশ্রয় হতে পারতো।
ওই কর্মকর্তা দাবি করে বলেন, বাপেক্সের জন্য রাখা হয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডের বাখরাবাদ ২ ও তিতাসের ১৭, ১৮ নম্বর কূপ। এই কূপগুলো যদি গাজপ্রমকে দেওয়া হতো, তাহলে কিছুটা উপকারে আসত দেশবাসীর জন্য। কারণ বাখরাবাদ এলাকায় একটি ২৫০ মিলিয়নের প্রসেস প্লান্ট পড়ে আছে। সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তা জাতীয় গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে গাজপ্রমকে শাহবাজপুরের দু’টি কূপ খনন করার জন্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে তারা ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীর উন্নয়ন কূপ খনন করবে। ওই এলাকায় ১৯৯৫ সালে বাপেক্স একই গভীরতার ১ নম্বর কূপ খনন করেছে মাত্র ৩০ কোটি টাকা ও ২০০৮ সালে ২ নম্বর কূপ খনন করেছে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে।
সে কারণে একই স্থানে প্রায় কয়েকগুন বেশি দরে কাজ দেওয়া হলো কার স্বার্থে এমন প্রশ্ন তুলেছে অনেকেই।
একইভাবে সুন্দলপুরে ৩ হাজার ৩২৭ মিটার কূপ খননে ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি টাকা, কাপাসিয়ার ১ নম্বর কূপ খননে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এই দু’টি এলাকায় গাজপ্রমকেও প্রতিটি কূপের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা করে।
অন্যদিকে কেয়ার্ন এনার্জি সেমুতাংয়ে ৫টি কূপ খনন করে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উন্নয়ন সম্ভব নয় দেখে গ্যাস ক্ষেত্রটি পেট্রোবাংলাকে ফেরত দিয়ে যায়। তাহলে শাহবাজপুর ও বেগমগঞ্জে কেন অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে সে নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।
এদিকে বাপেক্স অপারেশন বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। বর্তমানে বাপেক্সের ৩টি ড্রিলিং রিগ ও ২টি ওয়ার্ক ওভার রিগ রয়েছে। এই রিগ দিয়ে তারা বছরে কমপক্ষে ১৫টি পর্যন্ত কূপ খনন করতে সক্ষম। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলে তারা এর চেয়েও বেশি কূপ খনন করতে পারবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কিছু কর্মকতা আছেন, যারা বিদেশি কোম্পানির সুবিধাভোগী। তারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়ে গাজপ্রমকে কাজ দিয়েছেন।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে বাপেক্সকে গতিশীল করেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের কাজে ধীর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাপেক্সকে দিয়ে কাজ করানোর চেয়ে বিদেশি কোম্পানির হাতে কাজ দিতেই তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেছেন, বাপেক্সের অনেক সাফল্য রয়েছে। তারা আজও কোনো দুর্ঘটনা ঘটায়নি। তাহলে কেন তাদের কাজ না দিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।
গ্যাজপ্রমকে এই কাজ দেওয়া নিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও বাপেক্সের এমডি মর্তুজা আহমেদ ফারুকের আগ্রহ ছিলো চোখে পড়ার মতো। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই দুই কর্মকর্তার অতি উৎসাহী ছিলেন গাজপ্রমকে কাজ দেওয়ার জন্য।
বাপেক্সের এমডি মর্তুজা আহমেদ ফারুকের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার সেল ফোনে অনেকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর জানান, গাজপ্রমকে কাজ দেওয়া একটি মাইলফলক ঘটনা। অনেকে আছেন যারা বসে বসে সমালোচনা করেন। যা করা হয়েছে, দেশের স্বার্থেই করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তোফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী গাজপ্রমের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা অনেক কম দরে কাজ দিতে পেরেছি। অন্য কোনো কোম্পানিকে দিতে হলে ২২ মিলিয়নের বেশি পড়ত। আমরা ২০ মিলিয়নের কমে কাজ করাতে পারছি।’
উল্লেখ্য, ২৬ এপ্রিল গাজপ্রমের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি করা হয়। তাদের ১০টি কূপ দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো- বাপেক্সের অধীনে থাকা ৫টি (সেমুতাং ফিল্ডে ১টি, বেগমগঞ্জে ফিল্ডে ১টি, সুন্দলপুর/শ্রীকাইল ফিল্ডে ১টি ও শাহবাজপুর ফিল্ডে ২টি), বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ৪টি (তিতাস গ্যাস ফিল্ডের) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের (এসজিএফএল) অধীন রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডে ১টি।
গাজপ্রম প্রথমে বাপেক্সের ৫টি কূপ খননের দর ঠিক করে ৯৫,১১৫,৬৩৪ মার্কিন ডলার। প্রতিটি কূপের জন্য তারা গড়ে খনন ব্যয় ধরে ১৯.০২ মিলিয়ন ডলার। বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের ৫টি কূপের খনন ব্যয় ধরেছে ১০২,৩৫৯,১২০ ডলার।
বাংলাদেশ সময়: ১২০০ ঘণ্টা, মে ০৫, ২০১২
ইএস/আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর