 |
একটি কুকুর মরে পড়ে আছে। রেললাইনে। আধঘণ্টা আগে আমি তাকে আমার পরোটার অর্ধেকটা খাইয়েছি। এখন কুকুরটার অর্ধেক শরীরেরই কোনও হদিস নেই। এখানে-ওখানে রক্তের ছোপ, পেটের আতুরি আর ছেঁড়া মাংস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দ্রুতগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস যখন ঢাকা পৌঁছুবে, চাকাও ভুলে যাবে এই হত্যাকাণ্ডের কথা। আমিও ভুলে যেতে পারি। অবশ্য আমার একটা আফসোস আছে। ব্যক্তিগত সার্কেলে নামডাকওয়ালা কালার হোটেলের অর্ধেকটা পরোটা আমি তাকে খাইয়েছি। মৃত্যুর মিনিট ত্রিশেক আগে। ট্রেনের চাকা যখন কুকুরটার পেটের উপর দিয়ে চলে গেল তখন সেই পেটে কোথাও একটা জায়গায় গুটিশুটি মেরে পড়ে ছিলো আমারই খাওয়ানো পরোটার চিবিয়ে ফেলা খণ্ড-খণ্ড টুকরা। পরোটার সেই অর্ধেক অংশ এক জীবনের পরপর দুইবার এমন ঝামেলায় পড়বে বোধহয় চিন্তাও করে নি।
পেছনের অংশটা বোধহয় ট্রেনের ইঞ্জিনের সাথে আটকে দূরে চলে গেছে। আমি কুকুরটার বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। মুখটা হা করা এবং জিভ বেরিয়ে আছে। যেমন থাকে সবসময়। দেশি হলেও কুকুরটার গায়ের রঙ ছিলো দেখার মতো, হলুদের মধ্যে কালো ছোপ-ছোপ। প্রায় দেখতাম ওকে কালার হোটেলের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। মনে পড়ে রুদ্রসহ একদিন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম এখানে। মুরগির রান খেয়েছিলাম সেদিন। হাড্ডিটা ছুড়ে দিয়েছিলাম সম্ভবত এই কুকুরটার দিকেই। মহানন্দে খেয়েছিলো সেই হাড্ডি। অবশ্য এই অংশটা অনুমান প্রসূত। সেটা অন্যকোনো কুকুরও হতে পারে। তবে ধরে নিতে চাই এই কুকুরটির কথাই। আফসোস করার মতো আরও কিছু অনুষঙ্গ যোগ করতে পারলে ভালো লাগতো। কুকুরটির নাকের গোড়ায় কালচে যে অংশটি, সেখানে কিছু মাছি উড়ছে। এই দৃশ্য দেখে আমার নিজের নাকেই হালকা চুলকানি অনুভব করলাম।
আরেকটা ট্রেন স্টেশনে এসে থেমেছে। তারমানে প্রভাতী। সুবর্ণ এখানে থামে না। কুকুরটাকে ঘিরে বিরাট একটা জটলা বেঁধে গেছে এখানে। আমিও আছি সেই জটলার একজন হয়ে। এটাকে এখান থেকে সরানো দরকার- বলাবলি করছে সবাই। জিআরপিকে খবর দেয়ার কথা ভাবছে কেউ কেউ। এখানে লাইনের পাশেই কিছু লোক কলা বিক্রি করে। কুকুরটা মরে তাদের বেশ ঝামেলাতেই ফেলে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর হয়তো দুর্গন্ধ বেরুবে। আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম, কুকুরটার পেটের ভিতর থাকা ওই পরোটার চাবানো টুকরোগুলো খুঁজছিলাম মনে মনে। কোথাও সেরকম কোনো আলামত পাচ্ছিলাম না অবশ্য। প্রভাতী হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকলে একজন গিয়ে কুকুরটির বাকি অংশটাও রেললাইনের উপর উঠিয়ে দিলো। কয়েকজন প্রতিবাদ করলো। আমি করি নি। সে যুক্তি দেখালো কুকুরটির সামনের অংশটুকুও যদি ইঞ্জিনের সাথে আটকে দূরে চলে যায় তাহলে ভালো হবে।
সবাই কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালো। ট্রেন আসছে। একটি অ-মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য সবার মনোযোগই কুকুরটির দিকে স্থির। আমি হাঁটা শুরু করলাম অন্যদিকে। খানিকটা দূরে যেতে ট্রেনের ঘন-ঘন হুইসেল শুনতে পেলাম- অর্ধেকটা পরোটার জন্য আমার আফসোস আরো খানিকটা বেড়ে গেল।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৪০ ঘণ্টা, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর