 |
আঠারো শতকের শেষ ভাগে কার্ল মার্কস যে সাম্যবাদের জন্ম দিয়েছিলেন, তা বিগত দেড়শ বছরেরও বেশি সময় পরে এতটুকুও ম্লান হয়ে যায়নি। উনিশ শতকের শুরুতে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোয় কমিউনিজমের উত্থানে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রনায়কেরা, ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তাঁর ভয়ে আজও সমানভাবে আতঙ্কিত। সেই লাল ঝাণ্ডার বাহকেরা আজও মানুষের দ্বারে দ্বারে বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে আসছেন অবিরতভাবে।
শুধু রাজপথের সৈনিক হিসেবে নয়, কাব্যিক ভাষায়ও বিপ্লবের গান গাইতে কলম সৈনিক হয়েছেন অনেকে। তাদের কলমের বৈপ্লবিক আচড়ে সাম্যবাদী সাহিত্য পেয়েছে বিশ্ব মর্যাদা। ইউরোপে সাম্যবাদী ধারার সাহিত্য রচনা করে যেসব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন নোবেল বিজয়ী চেক কবি ইয়ারোস্লাভ সেইফার্ট তাদের মধ্যে অন্যতম।
চেক ভাষা, চেক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় ভাষা। চেক সাহিত্যে ইয়ারোস্লাভ সেইফার্টের সাম্যবাদী ধারার অবদান আলোচনা করার পূর্বে চেক সাহিত্য সমন্ধে ধারণা পাওয়া জরুরি। কারণ সেইফার্ট শুধু আধুনিক চেক সাহিত্যের প্রবক্তা নন, এর বৈপ্লবিক পরিবর্তনেও রয়েছে তাঁর এবং তাঁর সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের সমান অবদান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো চেক সাহিত্যকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত করেছেন চেক ভাষাবিদগণ। সেগুলো হলো মধ্যযুগ, হুসেইট যুগ এবং বারক যুগ।
খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে তেরশ` খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রচিত সাহিত্যকে ‘মধ্যযুগীয় চেক সাহিত্য’ নামকরন করা হয়। তবে এর পরেই পনেরশ’ খৃষ্টাব্দে সংঘটিত হুসেইট বিপ্লবের ফলে চলমান সাহিত্যে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে। সতের, আঠারো শতাব্দী পর্যন্ত হুসেইট বিপ্লবের ধারা চলতে থাকলেও আধুনিক চেক সাহিত্যের আভাস পাওয়া যায় ঐ সময়ই। ১৬২০ খৃষ্টাব্দে চেক প্রজাতন্ত্রে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। তিন দশক ব্যাপী এই যুদ্ধকে ‘ব্যাটল অব হোয়াইট মাউন্টেন’ বলা হয়। যুদ্ধের প্রবল প্রভাব পড়ে চেক সাহিত্যেও। আঠারো শতকের শেষে যাযাবরেরা এই এলাকায় স্থায়ী আসন গড়তে থাকে।
উনিশ শতকে নতুন করে চেক জনগণের মধ্যে পুনর্জাগরণ ঘটে। আরেকদফা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে চেক প্রজাতন্ত্রে। তাই উনিশ শতকের পুরো সময়টাকেই চেক সাহিত্যের সবচেয়ে উর্বর সময় বলা যেতে পারে। এই সময়কে আবার বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যুদ্ধ কাল, কমিউনিস্ট শাসনকাল, কমিউনিস্ট শাসনের পরবর্তী সময়কাল। ১৯৪৮ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করলে চেক সাহিত্যে বস্তুবাদী ধারার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অনেক পূর্বে চল্লিশের দশক থেকেই সেইফার্টের সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ফলে চেক প্রজাতন্ত্রে কমিউনিস্টদের বিজয়ের পর তাঁর সাহিত্য নতুন মাত্রা পায়।
ইয়ারোস্লাভ সেইফার্টের জন্ম চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সনে। প্রাগকে চেক ভাষায় প্রাহা উচ্চারণ করা হয়। প্রাহার নিকটবর্তী যিযকভ নামক এলাকায় তার পরিবারের বসবাস ছিল। পঁচাশি বছরের দীর্ঘ জীবনে লিখেছেন অনেক। পুরষ্কারও পেয়েছেন অসংখ্য। আর জীবনের শেষে শ্রেষ্ঠ পদক নোবেল পুরষ্কার তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। তবু এই সুদীর্ঘ জীবনে তিনি কম বিতর্কের জন্ম দেননি!
নোবেল পুরষ্কার নিয়েই বলা যেতে পারে। একজন কমিউনিস্ট কবি নোবেল পুরষ্কার পাবেন, চেকরা তা কল্পনাও করেননি। কারণ নোবেল পুরষ্কার সাধারণত পুঁজিবাদের তল্পিবাহকদেরই দেয়া হয়। তাহলে কি সেইফার্ট একজন ভুয়া কমিউনিস্ট! উত্তর শুনুন সেইফার্টেরই নিজ ভাষায়, ‘ভুয়া কমিউনিস্ট তারাই, যারা পরিবর্তনের কথা ভুলে যায়। আমি কখনও প্রগতির কথা ভুলিনি। আমার লেখায় আমি বারবার বস্তুবাদের কথা বলেছি, প্রগতির কথা বলেছি, সমাজ পরিবর্তনেরও কথা বলেছি।’ তার ‘ইন অ্যান এম্পটি রুম’ নামক কবিতায় তিনি লিখেছেন-
‘এমন কি দাঁড়কাকও গায়ক পাখিদের একজন
আর সে আমায় শক্তি দেয়,
যখন আমার জীবনে অনড়
কুয়াশার মতো ছড়ায় বিষণ্নতা।
বুড়ো মানুষের কাছে মধুর গদ্যের
কী এমন মূল্য বল?
তখন তো তুষারের রঙও
তার বিরুদ্ধে করে বিদ্রোহ!’
সেইফার্ট তরুণ বয়েসে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯২১ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়। সামাজিক অনাচার বিরোধী জ্বলজ্বলে আগুন ঢেলে দেয়া কাব্য, পাঠকের মন জয় করতে সমর্থ হন দ্রুত। ফলে চেক সাহিত্যের নবযুগের অগ্রদূত হিসেবে খ্যাতি পেতেও বিলম্ব হয়নি। ঐ সময় লেখালেখির পাশাপাশি ‘ডেভেটশীল’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকাও বের করতেন তিনি। এর আগেই যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। পার্টির বিভিন্ন প্রকাশনার কাজে নিজেকে আত্ননিয়োগ করেন।
পার্টির দায়িত্বে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে ‘রভনোস্ট’, ‘সাটেক’ ও ‘রিফ্লেক্টর’ নামক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর কবিতা লেখাই তার মূল সাহিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়ায়। তবে লেখার পাশাপাশি চেক রাইটার্স ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে চেক সাহিত্যিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘকাল।
ইয়ারোস্লাভ সেইফার্ট তাঁর কাব্য ভাবনায় কখনও যে বিচলিত হননি- তা তাঁর কাব্যে সুস্পষ্ট। প্রকৃতি ও প্রেম তাঁর কাব্যে অফুরান- প্রেরণার উৎস। তরুণ হৃদয়ের অব্যক্ত আবেগ কবি তার কবিতায় বাণীবদ্ধ করেছেন যা সার্বজনীন আবেগের বহিঃপ্রকাশ রূপে মূর্ত হয়েছে। স্মৃতিময় অতীত, প্রেম ও বিরহ বিচ্ছেদ তাকে করেছে চেতনাসমৃদ্ধ। ‘দ্যা বার্ডস ভয়েস ইন দ্যা ট্রি টপ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:
‘শুধু একটি ছোট রট-আয়রনের গেট,
ওটা সব সময় খোলাই থাকে
আনন্দিত উদ্যানে প্রবেশ রোধ করে
আর সাদা ঢাকা বারান্দা
প্রাচীন লেবু গাছময় রাজপথের শেষে।
আমি ওখানে প্রায়ই যেতাম
ওপরে ও চতুর্দিকে
আনন্দে চিৎকাররত সুগন্ধী সংগীতের মাঝে
স্যাঁতস্যাঁতে ফুটপাতের ওপর
দীর্ঘকাল আগে মৃত
কবির চার পায়ের শব্দ শোনার জন্য।’
সমাজতন্ত্র কায়েম হোক আর না হোক শ্রেণি সংগ্রামের যে কথা মার্কস বলেছেন, তা আজীবন বিশ্বাস করেছেন সেইফার্ট। তাঁর ভাষায়, ‘গরীব পারুক আর না পারুক বুর্জোয়া কিন্তু ঠিকই শোষণ করেই যাচ্ছে।’ প্রায় আট দশকের অধিককালের পরিধিতে এবং তাঁর মৃত্যুর পূর্ব-পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ ও বৈচিত্র্যধর্মী এবং নানা বিষয়ক কবিতা রচনার মাধ্যমে কাব্য প্রেমিকদের মনে অন্যরকম এক স্থান গড়ে তুলেছেন। রেখে গেছেন তাঁর কবি-প্রতিভা, সৃষ্টিশীলতা, শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর।
সেইফার্ট ছিলেন মূলত কবি এবং অস্থিমজ্জায় কবি। তাঁর কবিতার মূল বিষয় ছিলো মানুষ। মানুষের অধিকার নিয়ে, অধিকার বঞ্চিত সব মানুষের জন্যে, মানুষদের দুঃখ কষ্ট আর কান্নার বিরুদ্ধে, মানুষের আবেগ-উচ্ছাস আর মানুষের একান্ত চাওয়া নিয়ে বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা নিয়ে তাঁর রচিত কবিতাগুলো সবসময়ই মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
সেইফার্টের বিস্তৃত সাহিত্য কর্মের খুব সীমিতই পড়া হয়েছে; যতটুকু জেনেছি এই ক্ষুদ্র লেখায় সংক্ষিপ্তভাবে তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কবিতাগুলো পড়ে মনে হয়েছে তাঁর সৃষ্টিকর্ম প্রবলভাবে অনুভব করার মত। ইয়ারোস্লাভ সেইফার্টের কবিত্ব আবেগ আক্রান্ত, এ কথা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। ‘দ্যা কাস্টিং অব দ্যা বেলস’ কবিতার কয়েকটি লাইন-
‘কখনও কখনও তার শব্দগুলো নিদারুণভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে যায়
হয়তো কিছু আবিষ্কারের নেশায়
কিন্তু আমাদের মাঝে নিশ্চিত কোন কিছুই নেই
এবং ব্যর্থতায় কিছু তপ্ত বাক্য বের হয়ে পড়ে
এমনকি পরলোক পর্যন্ত
কিছু অপ্রকাশিত রহস্য,
আধাঁরকে ধূসর করে দেয়
গণসমাধির ওপরে
এবং নিছক সঙ্গ দিয়ে
দৈনতা পীড়িত অস্থিতে,
লাইটার থেকে তাম্রমল ছড়িয়ে
দেখভাল হয় উদ্দীপিত মানুষের
ট্রাউজারের পকেটে!’
অসংখ্য শিল্পোত্তীর্ণ, আকর্ষণীয় এবং আবেদনশীল কবিতার স্রষ্টা হলেও, তাঁর সব কবিতাই অনবদ্য- এমন কথা বলা সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘদিনের সাধনায় তিনি এমন দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, একটি নিজস্ব বাকরীতি এবং ধারা তিনি নির্মাণ করে নিতে পেরেছেন। যার মধ্যে দিয়ে ধ্বনিত হয়েছে কবির নিজস্ব কণ্ঠস্বর। তার কাব্যের বৈচিত্র্য, কাব্য-ফসলের পরিমাণ এবং শিল্প-সাফল্যই তাঁকে অনন্য এক উচ্চতায় বসাতে সক্ষম হয়েছে।
ইয়ারোস্লাভ সেইফার্টের লেখনীর মাধ্যমেই চেক সাহিত্যের সাম্যবাদী কর্ম পেয়েছে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি। ১৯৮৬ সালের ১০ ই জানুয়ারি এই বিশ্বকবির মৃত্যু ঘটে, এর পূর্ব পর্যন্ত ক্ষীণকালের জন্যেও মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুত হননি তিনি। ইয়ারোস্লাভ সেইফার্টের অন্যবদ্য সাহিত্য কর্মের কল্যাণে বিশ্বস্বীকৃত চেক সাহিত্যের সাম্যবাদী ধারা ভবিষ্যত উত্তরসূরীদের বিপ্লবের পথেই উদ্বুগ্ধ করেবে -তা সন্দেহতীতভাবেই বলা যায়।
লেখক: সিয়াম সারোয়ার জামিল, ব্লগার ও সংবাদকর্মি।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪৫ ঘণ্টা, ২ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর