 |
ঢাকা: ইন্টারনেটের জ্ঞান সাম্রাজ্যের উদীয়মান নক্ষত্র তিনি। কিন্তু তার সঠিক পরিচয় জানেন না কেউই। বয়স মাত্র ২৮ বছর, কিন্তু অতীত, বর্তমানের বিপুল জ্ঞান তার নখদর্পণে। বইয়ের পোকা তিনি, কিন্তু নিজে কখনো বই লিখবেন না বলে ঠিক করেছেন।
তার নাম মারিয়া পোপোভা।
কোনো এক শনিবারের সকালের কথাই ধরা যাক। সকাল সাড়ে ৯টায় নিজের ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে প্রবেশ করলেন বেজমেন্টের ছোট জিমনেশিয়ামে। বুলগেরিয়ান বংশোদ্ভুত এই শখের ব্যায়ামবিদ নারী যদিও পুরনো চর্চাটা ধরে রেখেছেন, সেটা তার জ্ঞানের সাম্রাজ্যে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
তার সাম্রাজ্যের নাম ব্রেইন পিকিংস।
কোন কিছুরই অভাব নেই মারিয়ার জ্ঞানের ঝুলিতে। বিজ্ঞানের চমকপ্রদ তত্ত্ব, ভুলে যাওয়া ফটোগ্রাফ, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া পুরনো প্রেমপত্র, যখন-তখন টুকে রাখা নোট- সবকিছু থেকেই বের করে আনেন শিক্ষণীয় কিছু। তাই হয়তো আজ তার ব্লগসাইটের মাসিক পাঠক ৫ লাখ, নিউজলেটার গ্রাহক দেড় লাখ, টুইটারে অনুসরণকারী ২ লাখ ৬৩ হাজার। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক উইলিয়াম গিবসন থেকে শুরু করে হলিউড অভিনেত্রী মিয়া ফ্যারো, কেউই বাদ নেই তার অনুসরণকারীদের তালিকায়। এমনকি স্বয়ং টুইটারের দুই প্রতিষ্ঠাতা বিজ স্টোন ও ইভান উইলিয়ামসও নিয়মিত অনুসরণ করেন তার টুইট।
এতোকিছু সত্ত্বেও অন্যান্য ইন্টারনেট সেলিব্রেটিদের চেয়ে অনেকটা নিভৃতেই বিচরণ করেন মারিয়া পোপোভা। যার ফলে তার নাম-পরিচয় তেমন কিছুই জানেন না ভক্তরা। তার প্রোফাইলে খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনো ব্যক্তিগত তথ্য; এমনকি নিজের কোনো ছবিও ব্যবহার করেননি কখনো। তার বয়সে যেখানে অন্য সবাই নিজেদের নিয়ে, লঘু আড্ডা-গল্প নিয়ে টুইট করতে ব্যস্ত থাকেন, সেখানে মারিয়ার টুইটে ‘আমি’ শব্দটি খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর।
অনেক অনুরোধের পর সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হওয়া এই নারী বললেন, “মানুষের সামনে ওভাবে নিজেকে প্রদর্শন করার কোনো প্রয়োজন দেখি না আমি। আমি কোনো ব্যক্তি নই, বরং একটি সংগঠন- এই চিন্তাই আমাকে বেশি স্বস্তি দেয়।”
তার প্রতিটি দিনই কাটে দারুণ ব্যস্ততার মধ্যে। সেই শনিবার সকালের কথাই ধরা যাক। বেশ সময় নিয়ে ব্যায়াম করলেন। ব্যায়ামের ফাঁকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত বই ‘দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোশ্চেন’-এ। এরপর দ্রুত তার ইন্টারনেটে আরএসএস ফিড ও আইপ্যাড চেক করলেন।
এসব কাজে ঠিক ৭০ মিনিট ব্যয় করার পর তার ছিমছাম এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে শুরু করলেন একটি ছোট রচনা লেখার কাজ। বিষয়- ফ্রয়েড ও দিবাস্বপ্ন। এরপর সারাদিনে তার ব্লগে যেসব পোস্ট দেবেন সেগুলো গুছিয়ে নিলেন, প্রতিদিনের মতো ৫০টি টুইট প্রস্তুত করা শুরু করলেন। এবং এ সব কাজই করলেন ব্যালান্স বোর্ডের (ব্যায়াম করার যন্ত্র) উপর দাঁড়িয়ে শরীরের ব্যালান্স ঠিক রাখতে রাখতে!
জিজ্ঞাসা করতেই স্বর্ণকেশী তরুণী কিছুটা স্ল্যাভিক উচ্চারণে বললেন, “আমি কাজ করার সময় বসে থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু তাতে আমার মন সবখানে ছুটে বেড়াতে থাকে। শরীর যখন নড়াচড়ার মধ্যে থাকে, শুধু তখনই ছুটে বেড়ানো মনকে কিছুটা কেন্দ্রীভূত করতে পারি।”
উদাহরণ টেনে আরও বললেন, “মার্ক টোয়েনও কাজ করার সময় হাঁটাহাঁটি করতেন। বেথোফেন নদীর পাড়ে হেঁটে বেড়াতেন।”
রাশিয়ায় ছাত্রাবস্থায়ই তার বাবা-মার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। এর কিছুদিন পরই তার জন্ম। বাবা ছিলেন প্রকৌশলের ছাত্র, যিনি পরবর্তীতে অ্যাপলে চাকুরি করেন। মা পড়াশোনা করেছেন লাইব্রেরি সায়েন্সে।
বাবা-মার ব্যাপারে মারিয়া জানালেন, “আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু কিছুদিন আগেই আমরা স্কাইপেতে কথা বলেছি। এরপর লাইব্রেরি সায়েন্সের ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকে গেছে। আমি বুঝতে পেরেছি, আমি এতোদিন যা করেছি তাকে অনলাইন জগতের ডিউ ডেসিম্যাল সিস্টেম (লাইব্রেরিতে বই সাজানোর একটি পদ্ধতি) বলা যায়। আমার মা তো খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।”
মারিয়ার দাদি ছিলেন জ্ঞানের পাগল। তার কাছে প্রচুর এনসাইক্লোপিডিয়া ছিল, যেগুলোকে মারিয়া তার জ্ঞানের পেছনে ছোটার মূল প্রেরণা মনে করেন। পাশাপাশি বর্তমানে ইন্টারনেটে প্রচলিত পদ্ধতি নয়, বরং এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে খুঁজে খুঁজে জ্ঞান অর্জন করাকেই শেখার আসল পদ্ধতি মনে করেন তিনি।
বুলগেরিয়ার একটি আমেরিকান হাই স্কুল থেকে স্নাতক পাশ করার পর ২০০৫ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় ভর্তি হন। সেখানে পড়াশোনার গৎবাঁধা ধরন, বড় বড় লেকচারে দ্রুত বিরক্ত এসে যায়। সেসময় একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাতেও পার্ট-টাইম চাকরি করতেন তিনি। সেখানেই প্রথমবারের মতো সহকর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মজার ও দুর্লভ তথ্য জানিয়ে ই-মেইল করতেন তিনি। তখন কিছু না ভেবেই এর নাম দিয়েছিলেন ‘ব্রেইন পিকিংস’।
মারিয়ার এসব মেইল সহকর্মীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে। সেগুলো একত্রিত করে রাখার জন্য একটি দায়সারা ওয়েবসাইট তৈরি করলেন তিনি। পড়াশোনা, বিজ্ঞাপনের কাজ, বিভিন্ন ম্যাগাজিনে আর্টিকেল লেখার পাশাপাশি ওয়েবসাইটেও নিয়মিত তথ্য যোগ হতে লাগলো।
সেই ব্রেইন পিকিংস আজ পরিণত হয়েছে মহীরুহে। সম্পূর্ণ একা তিনি গড়ে তুলেছেন জ্ঞান আর কৌতূহলের এক নতুন সাম্রাজ্য। কয়েক লাখ মানুষের কৌতূহল আর জ্ঞানের এই ভাণ্ডার থেকে আয়ও করে থাকেন তিনি। তবে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচুর অর্থ কামানোর সুযোগ থাকলেও কখনোই বিজ্ঞাপন দেন না। বরং উন্মুক্তভাবে সাহায্য চান তার গ্রাহক, পাঠকদের কাছে। পাশাপাশি আমাজন.কম থেকে তার পরামর্শে যেসব বই কেনেন ক্রেতারা, সেখান থেকে একটি অংশ পান তিনি। এই উপার্জনই নিজের জন্য, যা করতে চান তার জন্য যথেষ্ট মনে করেন মারিয়া।
বর্তমানে ব্রেইনপিকিংসের পেছনে মাসে ৪৫০ ঘণ্টারও বেশি, অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টার মতো সময় দেন মারিয়া। প্রতিদিন পড়তে হয় শত আর্টিকেল, ঘাঁটতে হয় পুরনো বই থেকে শুরু করে আধুনিক ভিডিওচিত্র। তিনি। স্নায়ু শান্ত রাখার জন্য সারাক্ষণ কানে থাকে ইয়ারফোন, অনবরত তার প্রিয় গানগুলো চলে সেখানে। এভাবে অসাধ্য সাধন করার পেছনে নিজের প্রচণ্ড পরিশ্রমী ও একগুঁয়ে মানসিকতাকেই কৃতিত্ব দেন তিনি।
ফাস্টকোম্পানি নামক একটি অনলাইন জরিপে ২০১২ সালের অন্যতম সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে উঠে এসেছে মারিয়ার নাম।
ঠিক কি কাজ করেন মারিয়া? ধাঁধায় পড়েন অনেকেই।
মারিয়ার মতে, “মানুষকে সেসব ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলি, যেসব ব্যাপার জানার আগে তারা নিজেরাও জানতো না যে তারা ঐ ব্যাপারে আগ্রহী।”
মারিয়ার টুইটার প্রোফাইল কিংবা ওয়েবসাইটে (www.brainpickings.org) এ কথার সত্যতা পাওয়া যাবে। দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজ, চিত্রকলা, সাহিত্য হেন বিষয় নেই যা তার ভাণ্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে আপনার প্রিয় বিষয়টিরও কতো আকর্ষণীয়, চমকপ্রদ তথ্য যে আপনি জানতেন না, তা ভেবে নিজেই অবাক হবেন।
উদাহরণ হিসেবে মারিয়ার এক তরুণ ভক্ত এডুয়ার্ড টাফেটের কথা ধরা যাক। তার প্রচণ্ড ইচ্ছা বড় লেখক হওয়ার, কিন্তু নিজেকে কিছুতেই সেটার উপযোগী মনে করে না সে। একদিন ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ ব্রেইন পিকিংসে পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকদের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে একটি লেখা (http://www.brainpickings.org/index.php/2012/11/20/daily-routines-writers/) চোখে পড়লো তার। লেখাটি পড়ে সে আবিষ্কার করলো, তার অনেক গুণাবলীই বিখ্যাত অনেক লেখকের সঙ্গে মিলে যায়। উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে গেলো টাফেটের, আত্মবিশ্বাসী হয়ে একের পর এক লেখা লিখতে লাগলো।
অপর এক ভক্তের মতে, মারিয়ার সাইটে ভিজিট করা যেন একজন দক্ষ, প্রাণবন্ত গাইডের সঙ্গে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট দর্শন করা।
নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের সিনিয়র কিউরেটর পাওলা আন্তোনেল্লি মারিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পাওলা বললেন, “তিনিই সেরা কিউরেটর, যার স্বাদ লাখ লাখ মানুষের স্বাদের সঙ্গে মিলে যায়। মারিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তার মধ্যে কয়েক লাখ মানুষের ডিএনএ আছে। অন্যরা যেটা স্বপ্ন দেখে, যেটা করতে চায়, ঠিক সেটাই সে বেছে বেছে নিয়ে আসে।”
মারিয়ার কাজগুলো এতো জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আরেক কারণ, তার লেখাগুলো নিছক নিষ্প্রাণ কোন ফিচার নয়। প্রতিটি লেখাতেই রয়েছে তার চমৎকার লেখন ভঙ্গী, আকর্ষণীয় গ্রাফিক্স, প্রয়োজনীয় ফটোগ্রাফ ও বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি। ভক্তদের মতে, মারিয়ার প্রতিটি লেখায় এমন একটা আকর্ষণী ক্ষমতা আছে, যার ফলে সেগুলো আর লেখা থাকে না, জীবন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
মারিয়ার মতে, ব্রেইন পিকিংসের সাফল্যের পেছনে আধুনিক মানুষের বাণিজ্যিক মনোভাবেরও কৃতিত্ব রয়েছে। আজকের দিনে মানুষ যেমন সহজেই সব পণ্য ঝামেলাবিহীনভাবে পেতে চায়, মারিয়াও তাই করেন। জানা-অজানা অনেক জটিল, ধোঁয়াটে, অদ্ভুত, রহস্যময় বিষয়কে সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী ‘প্যাকেজ’-এ পরিণত করেন তিনি। আরও নিখুঁতভাবে বললে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরের বিষয়গুলোকে ‘মধ্যবিত্তের উপযোগী’ করে গড়ে তোলেন মারিয়া।
মারিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? উত্তরটা প্রশ্ন দিয়েই দিলেন মারিয়া, “আমি নিজেকেই সবসময় প্রশ্ন করি, এর শেষ কোথায়? এরপর কি?”
নিজেই উত্তর দিলেন, “আমি যা করছি তা-ই করবো, এবং এর কখনো পরিবর্তন হবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।”
তবে ইন্টারনেটকেই এ যুগের জ্ঞান আর কৌতূহলের আসল চাবিকাঠি মনে করেন তিনি। জানালেন, “আমাদের চিন্তাধারা সংকীর্ণ করে রাখার জন্য ইন্টারনেটও দায়ী। প্যারিস হিল্টন কি দিয়ে নাস্তা করেছে সকালে, এ তথ্যও আমাদের জানানো হচ্ছে।” ইন্টারনেটের বিপুল বিস্ময়ের অনেকটুকুই এখনো বাকি বলে মনে করেন তিনি।
ব্রেইন পিকিংসকে ২১ শতকের নতুন ধারণার লাইব্রেরির রূপ দিতে চান তিনি। ইন্টারনেটের প্রচলিত পদ্ধতির মতো নয়, বরং সেই শিশুকালে দাদির এনসাইক্লোপিডিয়া ও মায়ের লাইব্রেরি সায়েন্স থেকে জ্ঞানার্জনের যে প্রকৃত রূপ খুঁজে পেয়েছিলেন, সেটাই ছড়িয়ে দিতে চান সবার মধ্যে। জ্ঞানকে জ্ঞানের মতোই যথাযথ মর্যাদায় দেখতে চান তিনি; নিছক স্ট্যাটাস আপডেট কিংবা একটি ব্লগ পোস্ট হিসেবে নয়।
তবে ইতোমধ্যেই তিনি তার স্বপ্নের পথে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছেন বলা যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গত দশকে যেমন ফেসবুক, টুইটার, উইকিপিডিয়া, ইউটিউবের মতো জাদু আমাদের জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে, তেমনি চলতি দশকের শুরুতে ব্রেইন পিকিংস হয়তো এমনই কোনো লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০২, ২০১২