 |
ঢাকা: ‘আমি এখন নিঃস্ব, আমার কিছু নেই। নিজের কেনা ফ্ল্যাটও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। বিক্রি করে দেওয়া ফ্ল্যাটটিতেই এখন ভাড়া থাকি।
গত ৭ মাসের বাড়ি ভাড়া দিতে পারি না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারি না। আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিনিয়োগকারীদের
বিক্ষোভে অংশ নিয়ে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মো. আনোয়ার হোসেন নামের এক বিনিয়োগকারী। পরে তাকে পাশের দোকানে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর জ্ঞান ফিরে আসে।
পরে তিনি পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলেন।
মো. আনোয়ার হোসেন দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে নিজের কেনা একটি ফ্ল্যাটে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস সেই ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে তাকে দেনা পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন তার কাছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অনেক টাকা পাবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে তা পরিশোধ করার সামর্থ্য তার নেই।
মো. আনোয়ার হোসেন পেশায় একন ব্যবসায়ী ছিলেন। মূলত তিনি লাগেজ আমদানি করে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করতেন।
রাজধানীর বসুন্ধরা, ইস্টার্ন প্লাজা ও বায়তুল মোকররম মসজিদে তার ছিল দোকান। অনেক সুখেই ছিলেন তিনি।
পুঁজিবাজার যখন চরম ঊর্ধ্বমুখী তখন তিনি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। রাজধানীর সেনা কল্যাণ ভবনের ট্রাস্ট সিকিউরিটি হাউজে তিনি লেনদেন করেন।
ব্যবসার সব পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগ করেন শেয়ারবাজারে। প্রথমে তিনি প্রায় আড়াই কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। হাউজ থেকে ওই টাকার বিপরীতে আরও সাড়ে ৩ কোটি টাকা মার্জিন লোন নেন। তিনি মোট প্রায় ৬ কোটি টাকার শেয়ার কেনেন। কিন্তু তার শেয়ার কেনার পর বাজারে ধস নামে।
একের পর এক যখন ধস নামতে থাকে তখন শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। তিনি তখন শেয়ার বিক্রি না করে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নানা ধরনের আশ্বাস পেয়ে পুঁজি ফেরত পাওয়ার আশায় বুক বেধে বসে থাকেন। কিন্তু তার সেই আশা পূর্ণ হয়নি। এখন তার পুঁজি তো নেই বরং হাউজ তার কাছে উল্টো ৩০ লাখ টাকা পাবে।
বৃহস্পতিবার তিনি বাংলানিউজকে বলেন, মার্জিন লোন নিয়ে আমি মোট প্রায় ৬ কোটি টাকার শেয়ার কিনি। কিন্তু বর্তমান আমার সেই শেয়ারের দাম ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এছাড়া তার ইক্যুয়িটি মাইনাস হয়ে গেছে বলেও তিনি দাবি করেন। অবশ্য মাঝে তিনি হাউজের মার্জিন লোন ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন।
তিনি বলেন, আমার সব পুঁজি হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। হাউজ আমার কাছে উল্টো ৩০ লাখ টাকা পাবে। হাউজ থেকে আমাকে গত মঙ্গলবার একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে দ্রুত মার্জিন লোন পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নিবে।
এসময় তিনি বলেন, আপনারা এখন আমাকে বলেন, আমি এখন কি করবো। আমার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। এখন আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। হাউজ থেকে আমাকে টাকা পরিশোধ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু আমি তাদের টাকা কিভাবে
পরিশোধ করবো।
আমি আগে ব্যাংকক, লন্ডন, হংকং থেকে লাগেজ আমদানি করে বাংলাদেশে বিক্রি করতাম। তখন সেই ব্যবসা বন্ধ করাই ছিল আমার ভুল। এখন আমি আমার বিনিয়োগের ৫০ শতাংশ টাকা ফেরত পেলেও কোনও রকম বাঁচতে পারবো।
তিনি বলেন, আমি এখন আমার স্ত্রী ও ছেলেদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। তাদের ঠিক মতো খাওয়াতে পারছি না। আমার বড় ছেলে এইচএসসি পাস করেছে। এখন তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি করাতে পারছি না। অথচ তাকে আমি পড়িয়েছি ক্যামব্রিয়ান কলেজে। ছোট ছেলে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার স্কুলের বেতন ঠিকভাবে পরিশোধ করতে পারছি না।
তিনি এসময় বাজার কারসাজিকারীদের শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, ইব্রাহীম খালেদ যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে সে অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিলে বাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু সরকারের বর্তমান অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারাই চাচ্ছে না বাজার কারসাজিকারীদের শাস্তি হোক।
আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী যদি নিজে বাজারে হস্তক্ষেপ করেন তবে বাজার আবার স্থিতিশীল হবে। তা না হলে বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব না।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এ মুহূর্তে বাজার
স্থিতিশীল না হলে আমি আর বাঁচতে চাই না। আমাকে বাঁচান। আমি যদি আমার ক্ষতির ৫০ শতাংশও ফিরে পাই তবে আমি কিছুটা রেহাই পাব।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৫১ঘণ্টা, জুন ২১, ২০১২
এসএনএইচ/সম্পাদনা : নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর; নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর