 |
ঢাকা: অভিযোগ রয়েছে, এয়ারলাইন্সের প্রতাপশালী চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন আহমেদের কথা ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাতাও নড়ে না। আর রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ হবে অথচ চেয়ারম্যানের ভূমিকা থাকবে না, তাও কি সম্ভব?
আসলেই সম্ভব নয়। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের সাবেক মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) কেভিন স্টিল বিমানের এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন জামাল উদ্দিনের যোগাযোগেই। মূলত নাইজেরিয়াভিত্তিক কাবো এয়ারলাইন্সের মাধ্যমেই জামালের সঙ্গে কেভিনের যোগাযোগ হয়। আর কেভিন এ মুহূর্তে যে এয়ারলাইন্সে কাজ করছেন সেই এরিক এয়ারলাইন্সও নাইজেরিয়াভিত্তিক। বিমান সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কাবো এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কমিশন ব্যবসার সূত্র ধরেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার বিমান সংস্থা এরিকের পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের কাজটি করেছে এদেশীয় এজেন্ট। ওই এজেন্টের মাধ্যমেই কেভিন স্টিল বিমানের এমডি পদে নিয়োগ পেতে যোগাযোগ করেছেন। জানা গেছে, এই কাজের অন্যতম এজেন্ট বিমানের চেয়ারম্যানের ছেলে জোবায়ের। ছেলের সূত্র ধরেই কেভিনের বিমানের এমডি হিসেবে নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত। আর এখানে রয়েছে ‘নিয়োগ কমিশন’।
বিমানের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, কেভিনকে নিয়োগ দিতে জামাল উদ্দিন শুরু থেকেই সুচতুর পরিকল্পনা আঁটেন। এই পরিল্পনার অংশ হিসেবে বিমানের এমডি পদে আবেদন করা ৪২ দেশি-বিদেশি আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ৯ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়। আর এই তালিকায় দেশীয় কাউকেই রাখা হয়নি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই। কারণ দেশীয় কাউকে নিতে হলে বিমানের বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত এমডি ক্যাপ্টেন শেখ নাসির উদ্দিন আহমেদকেও রাখতে হতো। জামাল নাসিরকে বাদ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তাই এরিককে নিতে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন বিমান চেয়ারম্যান।
এমডি নিয়োগ দিতে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিমানের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি কাজ করছে। কথা ছিল এই ৯ জনকেই সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হবে। কিন্তু জামাল উদ্দিনের ইচ্ছা অনুযায়ী কমিটি ৯ জনের তালিকা থেকে তিনজনের একটি তালিকা করে সাক্ষাৎকারের জন্য। জামাল উদ্দিনের ইচ্ছা অনুযায়ীই এই তালিকার শীর্ষে রাখা হয় কেভিনকে।
শেষ পর্যন্ত জামালের ইচ্ছা অনুযায়ী কেভিনকেই বিমানের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, নতুন এমডির বেতন ভাতা ২০ লাখ টাকার কম হবে না।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে চাকরি করছেন বিমানের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ছেলে জোবায়ের। এই জোবায়েরই বিমানকে ঘিরে নানা ব্যবসা করছেন। সর্বশেষ ইউনাইটেডের হয়ে তাদের একটি পুরনো এয়ারবাস বিমানকে গছিয়ে দিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে বাংলানিউজে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপর আর বিষয়টি সামনে এগোয়নি।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদ থাকলেও একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যবহার করে চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন তার ইচ্ছামতো সব সিদ্ধান্ত নেন। ঈদুল ফিতরের আগে বিমানের নতুন বোয়িং পালকি ও অরুণ আলো দিয়ে হজ ফ্লাইট পরিচালনার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন জামাল উদ্দিন আহমেদ। ওই সময় বিমানের পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ অনিয়মিতান্ত্রিকভাবে এক তরফাভাবে জামাল উদ্দিন এ সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তাই নয়, বিমানের নিয়মিত রুট বন্ধ করার বিরোধীও ছিলেন কর্মকর্তা ও পর্ষদ সদস্যরা। জামাল কারো কথাই শোনেননি। হজের আগে কাবোর এয়ারলাইন্স নিতে ব্যর্থ হলেও জামাল উদ্দিন ও তার ছেলে শেষ পর্যন্ত তাদেরই পছন্দের বোয়িং ৭৬৭ উড়োজাহাজ লিজ নিয়েছিল। এভাবে বিমানের প্রতিটি সিদ্ধান্তই বিমানের চেয়ারম্যান এককভাবে নিয়ে থাকেন।
জানা গেছে, কেভিনের নিয়োগ শুধু সময়ের ব্যাপার। আগামী জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। বিমানের নির্ভর একাধিক সূত্র বাংলানিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নিয়োগের আগে চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে তার সঙ্গে লোক দেখানো ভিডিও কনফারেন্স করা হবে। কারণ এর সবকিছুই আগে থেকেই চূড়ান্ত।
সূত্র জানায়, কেভিন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক, রাজস্ব উন্নয়ন মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। বিমান চলাচল খাতে তার ২৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ১০ বছরের বেশি সময় কাজ করেছেন তিনি। এছাড়াও তিনি ইতিহাদ এয়ারওয়েজের হেড অব ওয়ার্ল্ড সেলস হিসেবে দুই বছর কাজ করেছেন। এ মুহূর্তে তিনি এরিক এয়ারওয়েজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।
গত ২৪ মে বিমান এমডি পদের জন্য দেশি-বিদেশি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। আগ্রহী দেশি-বিদেশি প্রার্থীদের জীবন বৃত্তান্ত ও ছবিসহ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বিমানের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানায় আবেদন করতে বলা হয়।
বিমানের সাবেক এমডি এয়ার কমোডর (অব.) জাকিউল ইসলাম, সাবেক এমডি ক্যাপ্টেন শেখ নাসির উদ্দিনকে কাজ করতে দেননি চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল। তিনি এমনকি মন্ত্রীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন। তবু তার বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বিমান বোর্ডও ঠুঁটো জগন্নাথ।
যে চেয়ারম্যানের অধীনে একের পর এক এমডি কাজ করতে পারছেন না, তারই অধীনে বিদেশি কেভিন স্টিল এসে কীভাবে কাজ করবেন? এই নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? নাকি কেভিনের কাছে জাদুর কাঠি আছে? সেই কাঠির ছোয়ায় বিমান লাভজনক হবে?
বিমানকে নিয়ে সরকারের নীতিতেই গলদ রয়েছে। এ ধরনের অবসরপ্রাপ্তদের কেন বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সের দায়িত্ব দেওয়া হয়? বিমান বাহিনীর আমলারা যুদ্ধজাহাজ পরিচালনায় পারঙ্গম, বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স বিমান পরিচালনায় কেন তাদের বেছে নেওয়া হয়, তা স্পষ্ট নয়। সুতরাং ত্রুটিপূর্ণ সরকারি নীতিরই আগে পরিবর্তন দরকার।
বাংলাদেশ সময়: ১০৩৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৩, ২০১২
আইএইচ/আরআর