 |
ঢাকা: অশ্লীলতা, আকাশ সংস্কৃতির উৎকট প্রভাব, হল মালিকদের ব্যবসা পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। এ অবস্থা চলতে থাকলে চলচ্চিত্রশিল্প অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে পড়বে।
চলচ্চিত্রশিল্প এক সময় লাভজনক ব্যবসা হলেও সরকারি হিসেবে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে।
একদিকে সিনেমার নিম্নমান, অশ্লীল চলচ্চিত্র, হল মালিকদের ব্যবসা পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে দর্শকরা হলে সিনেমা দেখতে যায় না। আর নতুন নতুন তথ্যপ্রযুক্তির উদ্ভাবনে বিকল্প বিনোদন ব্যবস্থা, উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির প্রসার এবং সর্বোপরি পাইরেসির কারণে ঘরে বসে দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ। ফলে হলে গিয়ে সিনেমা আর আগ্রহ নেই।
অন্যদিকে, জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় হল মালিকেরা বেশি লাভের আশায় অন্য ব্যবসার দিকে ঝুঁকছে। সিনেমা হল ভেঙে তৈরি করছেন বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর প্রথম বন্ধ হয় পুরান ঢাকার নিউ প্যারাডাইস সিনেমা হল। এরপর একই এলাকার ‘তাজমহল’, গুলশান-১ নম্বরের ‘জ্যোতি’, গাবতলীর ‘বিউটি’ বন্ধ হয়ে যায়। এলিফ্যান্ট রোডের ‘মল্লিকা’ সিনেমা হল ভেঙে গড়ে উঠে ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্স। ঐতিহ্যবাহী ‘গুলিস্তান’ এবং ‘শ্যামলী’ ভেঙে গড়ে উঠছে শপিং মল। ফার্মগেটের ‘আনন্দ’ সিনেমা হলের স্থানে শপিং মল নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।
১৯৫৬ সালে ঢাকায় প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’র উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছিল পুরান ঢাকার ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে। রূপমহলের স্থলে এখন বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। একইভাবে লায়ন, শাবিস্তান, স্টার, মুন, নাজ, অতিথি, আয়না, সাগরিকা সিনেমা হলের আর কোনো অস্তিত্বই নেই।
চাঁদাবাজির কারণে ২১ জুলাই বন্ধ হয়ে যায় যশোরের ঐতিহ্যবাহী মণিহার সিনেমা হল। ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম বন্ধ হয় হলটি।
যশোরের মণিহার কমপ্লেক্সের জেনারেল ম্যানেজার শামীম আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “চাঁদাবাজি ও মাস্তানদের দৌরাত্ম্যের কারণে সিনেমা হলটি বন্ধ করে দেয় মালিক পক্ষ।” তবে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাসে এক হাজার ৪৩০ আসনবিশিষ্ট এ হল এবারের ঈদে ‘খোদার পরে মা’ সিনেমা দিয়ে আবারও চালু হচ্ছে।
শামীম আহমেদ বলেন, “সিনেমা হল বিমুখতার কারণে যশোরে পাঁচটি সিনেমা হলের মধ্যে বর্তমানে তিনটি পুরোপুরি বন্ধ।”
চট্টগ্রামে দেশের সর্ববৃহৎ সিনেমা হল বনানীসহ ডজন খানেক এবং রাজশাহীতে চারটি সিনেমা হল বন্ধ মুখ থুবড়ে পড়েছে। এছাড়া বগুড়া, সিলেট, খুলনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুরসহ প্রধান সব শহরে বহু সিনেমা হল এখন বন্ধ।
গত ২৮ জুন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ সংসদকে জানান, দেশে নিবন্ধিত সিনেমা হলের দুই-তৃতীয়াংশই বন্ধ হয়ে গেছে। নিবন্ধিত এক হাজার ১০০ সিনেমা হলের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৭৫০টি।
মন্ত্রী বলেন, “স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের সুবিধা সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ায় হল মালিকরা লাভজনক ব্যবসায় ঝুঁকছেন। তারা সিনেমা হল ভেঙে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করছেন।”
বর্তমান সরকার চলচ্চিত্র শিল্প নির্মাণ, বিতরণ ও প্রদর্শনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে ‘শিল্প’ হিসাবে ঘোষণা করলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে পড়া এ শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি, দেশীয় সংস্কৃতির জন্যও আঘাত স্বরুপ। সিনেমা হলের সঙ্গে চলচ্চিত্র ব্যবসার নিবিঢ় সম্পর্ক থাকায় চলচ্চিত্রশিল্পের ভবিষতও এখন অনিশ্চিত। জেলা শহরে একাধিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা সম্ভব না হলে এই শিল্পকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।”
চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, “বিদেশি ছবির প্রসার এবং পাইরেসির কারণে দেশীয় ছবির কপি সহজলভ্য। এছাড়া অশ্লীল ছবির কারণে দর্শক আর হলে আসে না। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোরও ক্ষতি হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “ভিনদেশের ছবি নকল করার প্রবণতা ও নির্মাতাদের অজ্ঞতার কারণেও ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছে না। ভালো ছবি নির্মাণে প্রযোজকও পাওয়া যায় না।” চলচ্চিত্রশিল্পকে রক্ষার জন্য অশ্লীলতা, পাইরেসি বন্ধ ও শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানান তিনি।
গত এক বছরে দেশে অসংখ্য সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে জানিয়ে আরেক নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল বলেন, “সাড়ে ১২০০ হলের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ। প্রতিমাসেই গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক, যা পুরো চলচিত্র শিল্পকেই সংকটের মুখোমুখি করেছে।”
চলচ্চিত্রকাররা বলছেন, পাইরেসিই মারাত্মক চলচ্চিত্রশিল্পের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাইরেসির অভিযোগে ৭৭৮ জনকে গ্রেফতার এবং ৬২৬টি মামলা হয়েছে বলে জানায় র্যাব।
পাইরেসি বিষয়ে একটি জাতীয় টাক্সফোর্স গঠন করা হলেও অপরাধীরা বিভিন্নভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাইরেসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ শিল্প রক্ষা কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) এমডি পীযুস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি বলেন, প্রতি বছর এফডিসি থেকে ৯০-৯৫টি সিনেমা মুক্তি পায়। পরিচালকরা জমিজমা বন্ধক রেখে ছবি রিলিজ করেন। অখচ একটি সিনেমা বানানোর পর তা আর লাভের মুখ দেখছে না।
বাংলাদেশ সময়: ১৬১৭ ঘণ্টা, আগস্ট ১৮, ২০১২
এমআইএইচ/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর