 |
ঢাকা: আসামিপক্ষের আইনজীবী দীর্ঘ জেরার মাধ্যমে মানসিক নির্যাতন করছেন বলে ফের অভিযোগ করেছেন ইতিহাসবিদ, লেখক-সাংবাদিক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্তও জেরার নামে মামলাকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলাসহ মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার অভিযোগ আনেন আসামিপক্ষের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে-২ শাহরিয়ার কবিরকে টানা ৭ম দিনের মতো জেরা করার সময় এসব প্রসঙ্গ উঠে আসে। এদিনও তাকে জেরা করেন মুজাহিদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। এ নিয়ে ২৬ আগস্ট সাক্ষ্যদানের পর থেকে এ সাক্ষীকে ৭ দিনে মোট ১৮ ঘণ্টা জেরা করা হলো।
চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের জেরা মুলতবি ঘোষণা করে আগামীতে আর একদিনের মধ্যে জেরা সম্পন্ন করতে আসামিপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। শাহরিয়ার কবির বিদেশে যাবেন বিধায় জেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ ধার্য করেননি ট্রাইব্যুনাল। তিনি দেশে ফেরার পর সুবিধামতো দিনে এ জেরা অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান ট্রাইব্যুনাল। অবশ্য শাহরিয়ার কবিরের দেশে ফেরার খবর ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করবেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত।
এ অবস্থায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার জেরার শেষ পর্যায়ে রানা দাশগুপ্ত বলেন, এ সাক্ষীকে টানা ১৮ ঘণ্টা ধরে জেরা করে আসামিপক্ষ মামলাকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে দিচ্ছেন। এ সময় মুজাহিদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘‘প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষীর ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণেই সময় বেশি লাগছে। এতে আমাদের কোনো দোষ নেই।’’
এ পরিপ্রেক্ষিতে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘‘আমার সব কথা আমি বইয়ে বলেছি। আমার বইয়ের বক্তব্যকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি না। আমার লেখার প্রত্যেকটি লাইন ধরে ধরে আমাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে। সময়টা এজন্য বেশি লাগছে।’’
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির এরপর জেরাকে আবারো নির্যাতনের সমতুল্য বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘আমার জানা মতে বিশেষজ্ঞ সাক্ষীদের মধ্যে আমাকেই সর্বোচ্চ সময় ধরে জেরা করা হচ্ছে।’’
শাহরিয়ার কবির আরো বলেন, ‘‘আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, জেরাকে দীর্ঘায়িত করে আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। বিদেশে আমার সিরিজ সফর রয়েছে। অথচ আমি এখনো ভিসা করতে পারছি না।’’
শাহরিয়ার কবির আগামী বুধবার থেকে ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ সফরে যাচ্ছেন। বিদেশ ভ্রমণের আগে ট্রাইব্যুনালকে সময় দিতে না পারার কথা জানান তিনি। এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘‘অনেক সময় আপনি দিয়েছেন। বিদেশ থেকে আসার পর আর একটা সেশন সময় দেবেন আশা করি।’’
এদিকে জেরা শেষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘‘আমরা সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা সাক্ষ্য প্রদানের দুই-তিন দিন আগে দেওয়ায় সাক্ষগ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আসামিপক্ষ সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা জেনে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, সাক্ষী অসুস্থ বা নানা কারণ দেখিয়ে সাক্ষ্য দিতে আসতে চাচ্ছেন না। তারা নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করায় নির্ধারিত দিনে সাক্ষীদের পাওয়া যাচ্ছে না। ’’ এ কারণে তিনি সাক্ষ্য প্রদানের দিন সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর নাম-ঠিকানা আসামিপক্ষকে সরবরাহ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন ট্রাইব্যুনালের কাছে।
মুজাহিদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম এ সময় বলেন, ‘‘এতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে, সাক্ষ্যগ্রহণের পর সাক্ষীকে জেরা করতে আমাদের একদিন সময় দেওয়া হোক।’’
উল্লেখ্য, গত ৬ সেপ্টেম্বর ৫ম দিনের জেরা চলাকালেও ‘‘টানা ৫ দিন ধরে জেরা করায় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। মনে হচ্ছে, সাক্ষ্য দিতে এসে বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি।’’ বলে অভিযোগ তুলেছিলেন শাহরিয়ার কবির।
সেদিনও তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবী জেরা করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।
ওই দিন সোমবারের (১০ সেপ্টেম্বর) মধ্যে এ সাক্ষীকে জেরা শেষ করার অনুরোধও জানিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তবে সে অনুরোধ রক্ষা না করে আসামিপক্ষ জেরা টেনে এনেছেন ৭ দিনে।
এদিকে ওই দিনও আসামিপক্ষের বিরুদ্ধে সাক্ষীর জেরায় অহেতুক বিলম্ব করে দীর্ঘসূত্রতা ও ট্রায়ালকে বিলম্বিত করার অভিযোগ তুলেছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘সাক্ষী শাহরিয়ার কবির যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাতে জেরায় এতো সময় নেওয়ার কথা নয়। আসামিপক্ষ মামলায় অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করছেন। এতে সাক্ষীও মনে করছেন, তাকে এর মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে।’’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এ মামলার আসামি মুজাহিদ। অথচ সাক্ষী তার সাক্ষ্যে জামায়াতের দীর্ঘ ইতিহাস, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জামায়াত সৃষ্টির বিরোধিতা, কাদিয়ানিদের নির্যাতনের কারণে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীকে ফাঁসির আদেশসহ অনেক প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন। কাজেই তার সাক্ষ্যের পর জেরায় সময় তো লাগবেই।’’
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘বিচার ঝুলে যাওয়ার প্রশ্ন আসবে কেন? রাষ্ট্রপক্ষ মুজাহিদকে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ সময় নিয়ে তদন্ত ও প্রতিবেদন দিয়েছে। সেই প্রতিবেদন কতোটুকু সত্য, তা প্রমাণের ক্ষমতা ও এখতিয়ার আমাদের আছে। অভিযোগ অসত্য, তা প্রমাণে যতোটুকু সময় প্রয়োজন সেটুকুই আমরা নিচ্ছি।’’
এর আগে গত ২৬ আগস্ট সাক্ষ্য দানের পর শাহরিয়ার কবিরকে জেরা শুরু করেছিলেন মুজাহিদের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। এরপর থেকে তাকে জেরা করছেন অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৭ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৩,২০১২
জেপি/সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com