 |
পবিত্র রমযানুল মুবারকের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর অন্যতম হচ্ছে সাদাকাতুল ফিতর। সহজ পরিভাষায় কেউ কেউ ফেতরাও বলে থাকেন। এটি যাকাতেরই একটি প্রকার যা রমযানের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে আদায় করতে হয়। বিভিন্ন হাদীসে রাসূল সা. এর আদায় পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। এর আবশ্যকতা এবং গুরুত্ব ও আদায়ের অপরিহার্যতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে জানা যায়, রাসূল সা. সাদাকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন। কারণ এতে অর্থহীন ও অশালীন কথা এবং কাজ- যেগুলোর কারণে রোযার ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করার জন্য আর নিঃস্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য। (সুনানে আবু দাউদ-১/২২৭)
এই সাদাকার পরিমাণ সম্পর্কে হাদীসের কিতাবসমূহে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে, ‘সা’ ও ‘নিসফে সা’। যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ এবং গম দ্বারা আদায় করলে ‘নিসফে সা’ প্রযোজ্য হবে।
শরীয়তের দলীলে একথাও প্রমাণিত যে উপরোক্ত খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে সেগুলোর মূল্য আদায় করারও অবকাশ আছে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত খাদ্যসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটিকে মাপকাঠি ধরে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। অর্থাৎ ঐ খাদ্যবস্তুর জন্য শরীয়তে যে পরিমাণটি নির্ধারিত-‘সা’ বা ‘নিসফে সা’ সে পরিমাণের বাজারমূল্য আদায় করলেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা উচিত যে মূল্যের দিক থেকে ঐ খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে তফাৎ আছে, কোনোটির দাম বেশি, কোনোটির কম। সবচেয়ে কমদামের বস্তুকে মাপকাঠি ধরে কেউ যদি সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলেও আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হল, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা।
যেহেতু সহীহ হাদীসে গমকেও একটি মাপকাঠি সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং এর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আধা সা’ তাই আধা সা গম বা তার মূল্য আদায় করলে নিঃসন্দেহে সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে।
গম, গমের আটা, জব, জবের আটা এবং খেজুর ও কিশমিশ দ্বারা ফিতরা আদায় করা যায়। গম বা গমের আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে গম অর্ধ সা’ (১ কেজি ৬৬০ গ্রাম) এবং জব বা জবের আটা কিংবা খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা’ (৩ কেজি ৩২০ গ্রাম) দিতে হবে। রুটি, চাল বা অন্য খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দিতে হলে মূল্য হিসেবে দিতে হবে।
কিশমিশ দিয়ে ফিতরা আদায় করলেও এক সা’ দিতে হবে।
বর্তমান বাজার দর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর আধা সা গমকে মাপকাঠি ধরে ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়ে থাকে। বর্তমান বাজার দর হিসেবেই এ অঙ্কটি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ হিসেবেই এ বছর তা নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি সর্বনিম্ব ৫৫ টাকা।
সাদাকাতুল ফিতর হচ্ছে রোযার যাকাত। যাকাত যেমন সম্পদকে পবিত্র করে, তেমনই ফিতরাও রোযাকে পবিত্র করে। মানুষ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ করে সাদাকাতুল ফিতর। মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।
ঈদের দিন সুবহে সাদিক থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। কাজেই সুবহে সাদিকের আগে কেউ মারা গেলে তার ফিতরা দেয়া ওয়াজিব নয়। গৃহকর্তার কোনো সন্তান যদি সুবহে সাদিকের আগে জন্মগ্রহণ করে, তবে তার ফিতরা দিতে হবে। এরপর জন্মালে ফিতরা দিতে হবে না।
এ হুকুম সুবহে সাদিকের পর কেউ মুসলমান হলে তার ওপরও ফিতরা প্রযোজ্য হবে। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম। অন্যান্য সময় মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা উত্তম। ঈদুল ফিতরের আগে ফিতরা আদায় করা পছন্দনীয় ।
ঈদুল ফিতরের দিন আদায় না করলেও পরে তা আদায় করতে হবে। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। নিজের এবং নিজের নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। স্ত্রী এবং বালেগ সন্তানরা ফিতরা নিজেরাই আদায় করবে।
স্বামী বা পিতার ওপর স্ত্রী-সন্তানদের ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে আদায় করে দিলে তা দয়া ও ইহসান হিসেবে অতিউত্তম এবং তা আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু পরিবারভুক্ত নয়, এমন লোকের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ছাড়া ফিতরা দিলে তা আদায় হবে না।
কোনো ব্যক্তির ওপর তার পিতামাতার, ছোট ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়ের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা আবশ্যক বা ওয়াজিব নয়। এক ব্যক্তির ফিতরা এক মিসকিনকে দেয়া উত্তম। তবে একাধিক ব্যক্তিকেও ভাগ করে দেয়া জায়েজ। [ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা-১৯২, কানযুদ্দাকায়িক: পৃষ্ঠা-২৪]
আসুন, এ রোযার সমাপনী প্রান্তে নিজেদের সাদাকাতুল ফিতরকে ঠিকঠিক মতো আদায় করে সমাজের ভুখা নাঙ্গা মানুষগুলোর মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুলে তাদেরকেও আনন্দময় ঈদ পালনের উৎসবে শরিক করে নেই।
সংকলন- তামীম রায়হান