 |
ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরকালীবাড়ি গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন গত বোরো মৌসুমে ৪ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ১০০ শতাংশ জমিতে ৫৫ মণ ধান উৎপাদনে তার খরচ হয় ২৯ হাজার টাকা।
সরকার ধান-চাল কেনার ঘোষণা দেওয়ার এক মাসের মাথায় স্থানীয় শম্ভুগঞ্জ বাজারে তিনি প্রতিমণ ধান ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। এ হিসেবে একরপ্রতি তার উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের ব্যবধান প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা।
৪ একর জমিতে বোরো আবাদে তার এবার লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। গত মৌসুমে বোরো আবাদ করে এরকম লোকসান গুনেছেন ময়মনসিংহের কৃষকরা।
সরকার কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজার থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ময়মনসিংহের কোনো কৃষক সরকারের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করতে না পেরে স্থানীয় বাজারে ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
সরকার নির্ধারিত মণপ্রতি ৭২০ টাকার স্থলে তাদের কাছে ৫০০ থেকে ৫২০ টাকায় ধান বিক্রি করতে হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বাজারের ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে কেনা ধান এখন সরবরাহ করছে মিলারদের কাছে।
আর মিল মালিকরা মৌসুমের মজুদ করা এ ধান সরবরাহ করছে সরকারের স্থানীয় খাদ্য বিভাগের কাছে। এভাবে কৃষকদের উৎপাদিত বোরো ধানের লাভের অংশ চলে যাচ্ছে ফড়িয়া, ব্যবসায়ী আর মিলারদের পকেটে। ফলে সরকার যে লক্ষ্যে ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছিল, সেটির সুফল পায়নি ময়মনসিংহের চাষিরা।
ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ হানিফ জানান, সরকার ধান-চাল কেনার ঘোষণা দেওয়ার কারণেই ধানের দর কিছুটা বেড়েছে। নয়তো খাদ্যে উদ্বৃত্ত ময়মনসিংহের কৃষকদের ৩০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হতো।
জানা গেছে, গত বোরো মৌসুমে ময়মনসিংহ জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। পর্যাপ্ত সার সরবরাহসহ সেচে কোনো বিঘœ না ঘটায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ লাখ টন (চাল) ছাড়িয়ে ফলন হয় বাম্পার। কিন্তু বাম্পার ফলনেও খুশি হতে পারেনি ময়মনসিংহের কোনো কৃষক।
কারণ ধানের ভরা মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের দর ছিল মণপ্রতি ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা। সরকার গত ৩ মে থেকে ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিলেও সংঘবদ্ধ ফড়িয়া নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় বাজারগুলোয় এ দর ওঠে ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয় চাষিরা জানান, প্রতিমণ ধান উৎপাদনে এলাকাভেদে তাদের খরচ হয় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অথচ সরকার ৭২০ টাকা মণ ধরে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছিল।
স্থানীয় ফড়িয়া ও ব্যবসায়ী সূত্রগুলো জানায়, কৃষকদের কাছ থেকে কেনা ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা দরের ধান মিল মালিকদের কাছে তারা ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছে। আবার অনেক ব্যবসায়ী স্থানীয় আড়তদারদের মাধ্যমে কৃষকদের ধান কিনে নিয়েছেন।
এক্ষেত্রে কোনো পুঁজি ছাড়াই আড়াতদাররা হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ। অনেক মিল মালিক আবার সরাসরি ফড়িয়াদের মাধ্যমে বাজার থেকে এ ধান কিনে মিলের গুদামে মজুদ করে। এখন এ ধান থেকে চাল করে তা সরবরাহ করছে সরকারের খাদ্য বিভাগে।
এ থেকে চলতি মৌসুমে কৃষকদের ধান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও মিলমালিক চক্র।
বাংলাদেশ সময়: ০২০৯ ঘণ্টা, জুলাই ৩০, ২০১২
সম্পাদনা: রোকনুল ইসলাম কাফী, নিউজরুম এডিটর