৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ৩:৫৮ এএম BDST banglanew24
20 Dec 2012   05:33:47 PM   Thursday BdST
E-mail this

সপ্তজিজ্ঞাসে—

কবি চঞ্চল আশরাফ


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
কবি চঞ্চল আশরাফ সপ্তজিজ্ঞাসে—

(কবিতাসংশ্লিষ্ট সাতটি নির্ধারিত প্রশ্ন নিয়ে ‘সপ্তজিজ্ঞাস’ নামের এ আয়োজন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের পক্ষ থেকে তানিম কবিরের করা প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন কবি চঞ্চল আশরাফ...)

কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?

এই প্রশ্নের জবাব দিতে কোনও কবি বাধ্য নন। কিন্তু প্রশ্নটি যদি কেউ করেন (সেটাও বাধ্যতামূলক নয়), তবে উত্তর দেয়াটা এক রকম শোভনতা। বর্বর সমাজে বেশির ভাগ জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া যায় না, আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর জোর করে আদায় করা হয়। যা হোক, কবিতা কেন লিখি, জানি না। যে-কোনও কাজের এক বা একাধিক কারণ থাকে। কারণ ছাড়া কার্য হয় না। কিন্তু কবিতা লেখা কোনও কাজ নয়। জেব্রা ক্রসিং আঁকা, চিতই পিঠা বানানো, মার্কেটিং ইত্যাদি যেমন কাজ, কবিতা তেমন কিছু নয়। সুতরাং কবিতা লেখার কোনও কারণ থাকতে নেই। তবে এই প্রশ্নের মধ্যে সমকালীন বাঙলা কবিতার একটা দুর্দশা ধরতে পারা যাচ্ছে। এখনকার কবিতা সম্ভবত চিতই পিঠার মতো কিছু একটা হয়ে গেছে, নইলে এর কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে কেন!
    
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’— এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?

এই উদ্ধৃতি বাঙালির খুব প্রিয়; কিন্তু এতোবার এটি ব্যবহার করা হয়েছে যে, আর ভালো লাগছে না। যা হোক, ফের বলি,   জীবনানন্দ দাশ কথাটা বলেছিলেন এই অর্থে যে, যারা কবিতা লেখেন, তাদের কেউ কেউ কবি, সবাই নন। কবি হওয়ার পেছনে কোনও অলৌকিকতা নেই; ঐশী বলে কিছুই পৃথিবীতে নেই। সব মানুষই জন্মায় একই মস্তিষ্ক নিয়ে; পরিবেশ, ব্যবহার, অনুশীলন ইত্যাদির পার্থক্যে কেউ কবি বা বিজ্ঞানী কিংবা কেরানি অথবা চোর হয়।

এখনকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার? কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু? কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?

এখনকার কবিরা মোটেই ছন্দবিমুখ নন। কারণ, বাঙলা ভাষার কবিদের ছন্দবিমুখ হওয়ার কোনও উপায় বা সুযোগ  নেই। ছন্দ তো আমাদের প্রাত্যহিক ভাষাতেই আছে। যেমন, ‘তোমার কি তাড়া আছে?’ ‘ওখানে যাবো না’, ‘তোমার কথা ভাবছি আমি’ ইত্যাদি। তবু, স্বীকৃত ছন্দগুলো জানা জরুরি, অনুশীলনও। এটা কবিতার প্রাথমিক শর্তগুলোর একটি; কিন্তু এর মধ্যে বন্দি হয়ে থাকলে চলে না, বরং ছন্দ প্রকাশ্য হয়ে পড়লে কিংবা তার অনুরণন কোনও কবিতার অর্জন বলে গণ্য হলে বুঝতে হবে রচনাটি ব্যর্থ বা ছন্দের মধ্যেই সেটি শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং ছন্দের প্রয়োজন ততোটুকু, যতোটুকুতে এটি কবিতার ব্যর্থতার কারণ হবে না।

‘কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারের’ সঙ্গে ছন্দের সম্পর্ক ধ্বনিগত। সুতরাং এটি সহায়ক ও প্রতিবন্ধক দুটোই হতে পারে বা কোনওটি নয়। কোনওটিই যদি না হয়, তা হলে ধরে নিতে হবে, কবিতাটি ঠিক আছে (অন্তত এই দিক থেকে)। তবে, আবারও বলি, একটা উত্তীর্ণ বা ভালো কবিতা কোনও প্রাথমিক শর্তের উপস্থিতি পাঠককে বুঝতে দেবে না।

দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়নের প্রবণতাটিকে কিভাবে দেখেন? আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?

‘দশক’ প্রায় একটা টার্মে পরিণত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে, কিন্তু কবিতার মূল্যায়নে শব্দটি কোনও কাজেরই নয়। এটি কালসূচক একটি শব্দ, ব্যবহৃত হয় আলোচনার সুবিধার জন্য। রাজতন্ত্রের সময় যে-কবি যার রাজত্বকালে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি সে-যুগের কবি বলে চিহ্নিত। কোনও দশকের কবি বললে যা বোঝায়, তা আসলে সে-রকমই একটা ব্যাপার। কেননা, দশক দিয়ে কবির আবির্ভাবকালটাই কেবল বোঝা যায়, এর বেশি কিছু নয়। দশকভিত্তিক মূল্যায়ন কোনও মূল্যায়নই নয়। কারণ, এটি সাহিত্যের কোনও মানদণ্ড দেয় না, যা ব্যবহার করে বলা যাবে যে, এই কবিতা ভালো নয় কিংবা ভালো। তবে এখনকার দশকভিত্তিক আলোচনার পেছনে কাজ করে এক সংকীর্ণ রাজনীতি, যার সঙ্গে আমাদের অন্তঃসারশূন্য ও পতনশীল সমাজের রয়েছে গভীরনিবিড় সম্পর্ক।

আমার দশকের কবিদের চেয়ে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানগুলো সম্পর্কে আমি কী করে বলি? আজ থাক।

তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত— প্রত্যেকটি দশক থেকে যদি তিনজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে— কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

সব দশকই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি সত্তরও, বাঙলা কবিতার এটি খুব খারাপ সময় হলেও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি দশকের তিন জন কবি— এই তালিকা কঠিন, কারণ, এমন অনেকের নাম এর বাইরে থেকে যেতে পারে, যাদের কবিতা ভালো লেগেছে আমার। অনেক গৌণ (প্রচারের দিক থেকে) কবির কবিতা আমার এতো ভালো লেগেছে যে, তাদের নাম নিয়ে তালিকা বানাতে গেলে ‘প্রধান’দের খুব সমস্যা হয়ে যায়। সুতরাং কাজটা না-ই করি!

দেশভাগোত্তর দুই বাংলার কবিতায় মৌলিক কোনও পার্থক্য রচিত হয়েছে কি? এ-বাংলায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। ওপার বাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন— এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করেন?

এই প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই আমার মনে পড়ছে সেই সোনাপণ্ডিতদের কথা, যারা বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে ব্রিটিশ আমলের বাংলা থেকে ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৯০ কোনওটিই বাকি রাখেন না; কিন্তু এইসব বিবরণ পৃষ্ঠাসংখ্যা বাড়ানো ছাড়া প্রবন্ধের কোনও কাজেই লাগে না। কারণ, বাংলা কবিতার সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক খুব ক্ষীণ। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ সহ অনেকের কিছু কবিতায় রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে, কিন্তু সেগুলো রাজনৈতিক স্পন্দনকে ধারণ করতে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে, অতিক্রম করতে পারেনি; অর্থাৎ কবিতা হয়ে ওঠেনি। দেশভাগে কবিতার কিছুই এসে যায়নি তেমন, এক রকম ফেনা তৈরি হয়েছে বটে— যেমন, পাকিস্তানপন্থি কিছু পদ্য লেখা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কবিদের মধ্যে যে আবেগ সৃষ্টি করেছে, তাতে কিছু বাজে কবিতা লেখা হয়েছে। তাদের উৎকৃষ্ট রচনায় রাজনৈতিক  প্রভাব নেই। রৌদ্র করোটিতে পড়ে কী মনে হয়?

কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলুন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?

সিনেমা বা টিভি সিরিয়াল জনবিচ্ছিন্ন কি-না, তা একটা প্রশ্ন হতে পারে; কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে এই ধরনের জিজ্ঞাসা চলে না। আজকে যে-কবিতা লোকে পড়ছে না, তা একদিন পড়বে কেউ না কেউ; আবার না-ও পড়তে পারে। তবে এই উদ্বেগ নিয়ে কবিতা লেখা ঠিক নয়।

কবিতা বোধগম্য হবার শিল্পকলা নয়, উপলব্ধি ও অনুভবের শিল্পকলা। বোধগম্য কবিতা খুব সন্দেহজনক। সমকালীন রুচির সঙ্গে আপোষ করে লেখা হয় এগুলো, যদিও বেশির ভাগ কবি তা জানতে বা বুঝতে পারে না। যতো নির্দোষ হোক, এই আপোষ সাহিত্যের কাজে লাগে না শেষ পর্যন্ত।

কবিতার পাঠক তারাই, যারা কবি হতে চায়; যারা হয়ে উঠেছে, উঠছে; যারা কবি হয়ে উঠতে চেয়েছিল; যারা জীবনের অনাবিষ্কৃত মহৎ-গভীর-উচ্চতর সৌন্দর্য, অর্থ, সত্য ও বাস্তবতার স্পন্দন অনুভব করতে চায়।

।।
চঞ্চল আশরাফ  
জন্ম : ১২ জানুয়ারি ১৯৬৯
জন্মস্থান : দাগনভূঁইয়া, ফেনী, বাংলাদেশ
পেশা : সাংবাদিকতা
প্রকাশিত বই : কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮) ; গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭) ; উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১) ; প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১) ; স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)
সম্পাদনা : কিছুধ্বনি জীবনানন্দ দাশ সংখ্যা (১৯৯৮)
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি : লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯)
chanchalashraf1969@yahoo.com
।।

বাংলাদেশ সময় : ১৭৩০ ঘণ্টা, ২০ ডিসেম্বর ২০১২

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share

সংশ্লিষ্ট খবর

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি জফির সেতু

১৭ ডিসেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি মাহমুদ টোকন

১০ ডিসেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি মজিদ মাহমুদ

০৬ ডিসেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি মাজুল হাসান

০৩ ডিসেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি আল-ইমরান সিদ্দিকী

২৯ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

২৬ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি মেহেরুবা নিশা

২২ নভেম্বর ২০১২

সপ্তাজিজ্ঞাসে—


কবি সাখাওয়াত টিপু

১৮ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ

১৫ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি সাইয়েদ জামিল

১১ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি সঞ্জীব পুরোহিত

০৮ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি রহমান হেনরী

০৫ নভেম্বর ২০১২

সপ্তজিজ্ঞাসে—


কবি সোহেল হাসান গালিব

০১ নভেম্বর ২০১২


REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান