চলে গেলেন লাতিন আমেরিকান খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস। ১৫ মে দিনগত রাতে এই মেক্সিকান কথাসাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ফুয়েন্তেস ছিলেন আধুনিক স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের মহান রূপকারদের একজন।
ফুয়েন্তেস জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালে পানামায়। তাঁর প্রথম বই ছিল একটি ছোটগল্প সংকলন, প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। প্রথম উপন্যাস Where the Air is Clear প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ফুয়েন্তেসের ২০টির বেশি উপন্যাস, বেশ কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন ও নাটক। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে— The Death of Artemio Cruz, The Old Gringo, The Crystal Frontier, Aura প্রভৃতি।
ফুয়েন্তেস বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারই পেয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সারভান্তেস সাহিত্য পুরস্কার। এছাড়া বহুবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য উঠে এসেছে তার নাম। কিন্তু নোবেল পুরস্কার তার ভাগ্যে জোটেনি।
ফুয়েন্তেসের ‘আউরা’ বেরিয়েছিলো ১৯৬২ সালে; আতঙ্ক, বিভীষিকা, সৌন্দর্য্য আর সংরাগে আশ্চর্যভাবে ভরপুর এই গা ছমছমে উপন্যাসটি রচনাকৌশলেও স্মরণীয়। একাধিকবার কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর লেখায় মধ্যম পুরুষের জবানি ব্যবহার করেছেন, “সেকেন্ড পারসন ন্যারেটিভ” সামলানো যে কেমন কঠিন, অথচ সামলে ওঠবার পর তার আবেদন কোনোভাবেই কমে না।
বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ফুয়েন্তেসের সম্মানে প্রকাশ করা হলো তার উপন্যাস ‘আউরা’। অনুবাদ করেছেন কলকাতার বিখ্যাত অনুবাদক— মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
৩.
সেই একই সন্ধেয় তুমি প’ড়ে ফেললে হলদে কাগজগুলো, সর্ষে রঙের কালিতে তাতে লেখা, কতগুলো হরফের জায়গায় ফুটো যেখানে কোনো ছাই পড়েছিলো হেলাফেলায়, অন্য হরফগুলো বড্ড বেশি মাছির মতো, ফুটফুট কাটা। হেনেরাল ইয়োরেন্তের ফরাশিতে কিন্তু সেইসব গুণপনা নেই যা তাঁর স্ত্রী তার মধ্যে দেখেছিলেন। তুমি নিজেকে বলতে থাকো তুমি নিজেই শৈলীতে যথেষ্ট উন্নতি আনতে পারবে, একটু ঘসামাজা ক’রেই, অতীত ঘটনার এলোমেলো অসংলগ্ন বিবরণকে তুমি আঁটো ক’রে তুলতে পারবে : ওয়াহাকার আসিয়েন্দায় তাঁর ছেলেবেলা, ফ্রান্সে সেনাস্কুলে তাঁর সামরিক শিক্ষা, দুক দ্য মোর্নির সঙ্গে তাঁর দোস্তি আর তৃতীয় নাপোলিয়ঁনের সঙ্গে তাঁর গলাগলিভাব, মাহিমিলিয়ানের বাহিনীতে নাম লিখিয়ে তাঁর মেহিকোতে ফিরে আসা, রাজকীয় সব অনুষ্ঠান ও সমাবেশ, যুদ্ধবিগ্রহ, ১৮৬৭তে হার স্বীকার, ফ্রান্সে তাঁর নির্বাসন। আগে বর্ণনা করা হয়নি এমন-কিছুই নেই এতে। তুমি পোশাক খুলতে-খুলতে ভাবো বুড়ি মহিলার দোমড়ানো মোচড়ানো বিকৃত ধারণাগুলোর কথা, এই স্মৃতিকথার ওপর কতটা গুরুত্ব কতটা মূল্য তিনি আরোপ ক’বে ব’সে আছেন। বিছানায় শুয়ে পড়তে-পড়তে তুমি আপন মনেই মৃদু হাসো একটু, চার হাজার পেসোর কথা মনে ক’রে।
গাঢ় গভীর ঘুমেই তুমি তলিয়েছিলে যতক্ষণ-না ভোর ছটার সময় এক আলোর বন্যা তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। কাচের ওই ছাত কোনো পর্দা দিয়েই ঢাকা নয়। তুমি বালিশের তলায় তোমার মাথা গোঁজো, চেষ্টা করো আবার ঘুমিয়ে পড়তে। দশ মিনিট বাদে পুরো ব্যর্থ চেষ্টাটাই তুমি ছেড়ে দাও, উঠে প’ড়ে চ’লে যাও বাথরুমে, আর সেখানে ঢুকেই আবিষ্কার করো তোমার সব জিনিশ সব সাজসরঞ্জাম খুব পরিচ্ছন্নভাবে একটা টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা, আর ওয়ার্ডরোবের ভেতরে ঝুলছে তোমার কিছু জামাকাপড়। ঠিক যেই তুমি দাড়ি কামানো সাঙ্গ করেছো, ভোরবেলার স্তব্ধতা ভেঙে গেলো সেই কান্নাভরা, মরীয়াহতাশ মিয়াও-মিয়াও ডাকে।
আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে তুমি তা খুঁজে দেখবার চেষ্টা করো। তুমি হলওয়ের দরজাটা খোলো, কিন্তু সেখান থেকে কিছুই তুমি শুনতে পাও না; ওই করুণ ডাকগুলো আসছে ওপর থেকে, স্কাইলাইট থেকে। তুমি লাফিয়ে উঠে পড় চেয়ারে, চেয়ার থেকে ডেস্কের ওপর, আর বইয়ের তাকের গায়ে ঠেশ দিয়ে ভার সামলে তুমি শেষে ছুঁতে পারো স্কাইলাইটকে। তুমি একটা খড়খড়ি খোলো আর নিজেকে টেনে ওপরে তুলে তাকিয়ে দ্যাখো পাশের বাগানটা, সেই চৌকো পরিসরটুকু যেটা কতগুলো চিরহরিৎ ইউগাছ আর কাঁটাঝোপে ঢাকা— সেখানে পাঁচ, ছয়, সাতটা বেড়াল— তুমি পুরোপুরি গুনেও উঠতে পারো না, ওখানে ওইভাবে পায়ের ডগায় ভর দিয়ে এক সেকেন্ডের বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারো না তুমি— বেড়ালগুলো সব জড়াজড়ি ক’রে আছে, সবকটাই ছটফট করছে আগুনের শিখায় আর চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘননিবিড় এক ধোঁয়া যেটা থেকে বেরিয়ে আসছে বিশ্রী একটা থিকথিকে লোম পোড়ার গন্ধ। আবার যখন তুমি মেঝেয় নেমে পড়ো তুমি মনে-মনে ভেবে দেখার চেষ্টা করো, সত্যি দেখেছো তো দৃশ্যটা : হয়তো ওই ভয়াবহকরুণ ডাক, যেটা একটানা চলতেই থাকে গোড়ায়, তারপর কমতে থাকে, আর শেষে থেমে যায়— ওই ডাক শুনেই তুমি সবটা মনে-মনে কল্পনা ক’রে নাওনি তো, তুমি ভাবো।
তুমি তোমার গায়ে শার্ট চাপাও, একটা কাগজের টুকরো দিয়ে জুতোজোড়া ঝেড়ে নাও, আর কান পেতে শোনো একটা ঘণ্টার শব্দ যেটা মনে হ’লো বাড়ির সব বারান্দা পেরিয়ে শেষটায় তোমার দরজাতেই এসে পৌঁছেছে। তুমি মুখ বাড়িয়ে দ্যাখো হলওয়েটা। আউরা হাতে একটা ঘন্টা ঝুলিয়ে হেঁটে চলেছে। সে তার ঘাড় ফিরিয়ে তোমার দিকে তাকায়, তোমায় জানিয়ে দেয় যে ছোটোহাজরি তৈরি। তুমি তাকে আটকে রেখে কথা বলার চেষ্টা করো, কিন্তু সে ততক্ষণে ওই ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে গিয়েছে, সেই কালো রঙ করা ঘণ্টাটা বাজাচ্ছে তখনও, যেন সে একটা আস্ত শিবিরকেই জাগিয়ে তুলবে, জাগিয়ে তুলবে গোটা বোর্ডিং স্কুলটাকেই।
তুমি তোমার ওই জ্যাকেট না-পরা শার্ট গায়েই তাকে অনুসরণ ক’রে আসো, কিন্তু যখন তুমি নিচের তলার হলওয়েতে গিয়ে পৌঁছোও, তখন আর তুমি তাকে কোথাও দেখতে পাও না। তোমার পেছনে বুড়ি মহিলার দরজাটা খুলে যায় আর তুমি দেখতে পাও ওই একটু খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একটা হাত, হল-ওয়েতে নামিয়ে রাখছে চিনেমাটির এক বেডপ্যান, আর পরক্ষণেই উধাও হ’য়ে গিয়ে দরজাটাকে ভেতর থেকে বন্ধ ক’রে দিয়েছে।
খাবার ঘরে তোমার ছোটোহাজরি ততক্ষণে টেবিলে সাজানো হ’য়ে গেছে, তবে এবারে শুধু একটা আসনের সামনেই জলখাবার সাজানো। তুমি চটপট খেয়ে নাও, ফিরে আসো হলওয়েতে, তারপর সেনিওরা কোন্সুয়েলোর দরজায় গিয়ে টোকা দাও। তাঁর তীক্ষ্ণ ক্ষীণদুর্বল কণ্ঠস্বর তোমায় ভেতরে ঢুকে পড়তে বলে। কিছুই বদলে যায়নি: চিরন্তন সব ছায়া আবছায়া, দেবার্চনার সব মিটমিটে বাতির আলো আর রূপোর জিনিসগুলো।
‘বুয়েনোস দিয়াস্, সেনিওর মোন্তেরো, সুপ্রভাত। ভালো ঘুমিয়েছেন তো?’
‘হ্যাঁ। অনেক রাত অব্দি জেগে-জেগে পড়েছি অবিশ্যি।’
বুড়ি মহিলা তাঁর হাতটা এমনভাবে নাড়েন যে কথাটা তিনি যেন উড়িয়েই দিচ্ছেন। ‘না, না, না। আপনার মতামত শোনাবেন না আমাকে। ওই কাগজগুলো নিয়ে কাজ ক’রে যান, তারপর সেগুলো যখন শেষ হ’য়ে যাবে, আমি আপনাকে আরো-সব কাগজের বান্ডিল দেবো।’
‘খুব ভালো, সেনিওরা, এস্তা বিয়েন। আমি কি বাগানে যেতে পারি?’
‘কোন্ বাগান, সেনিওর মোন্তেরো?’
‘আমার ঘরের ঠিক বাইরেই যে বাগানটা।’
‘এই বাড়ির কোনো বাগানই নেই আর। যখন তারা আমাদের চারপাশে একের পর এক বাড়িঘর তুলে দেয়, আমরা আমাদের বাগান হারাই।’
‘আমার মনে হয় আমি বোধহয় বাইরেই ভালো ক’রে কাজ করতে পারবো।’
‘যে-রাস্তাটা দিয়ে আপনি এসেছিলেন, শুধু সেই অন্ধকার পাতিওটাই আছে বাড়িতে। আমার সোব্রিনা— ভাগ্নি— সেখানে কতগুলো লতাগাছ গজাচ্ছে, সেখানে, যেগুলো ছায়ায় বাড়ে। তবে ওইটুকুই সব।’
‘ঠিক আছে, সেনিওরা, এস্তা বিয়েন।’
‘দিনের বেলাটা আমি বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করবো। তবে রাত্তিরে এসে কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করবেন।’
‘তা-ই হবে, সেনিওরা, এস্তা বিয়েন।’
সারাটা সকাল তুমি কাগজপত্র নিয়ে কাজ ক’রেই কাটিয়ে দাও, সেইসব টুকরো আলাদা ক’রে কাগজে নকল ক’রে রাখো যেগুলো তুমি পরে পাণ্ডুলিপিতে রাখতে চাইবে, যে-অংশটুকু খুব বাজেভাবে লেখা হয়েছে ব’লে ভাবো, সেগুলো নতুন ক’রে লেখো তুমি, একটা সিগারেটের পর আরেকটা সিগারেট ধরাও আর সিগারেটে টান দিতে-দিতে ভাবো তোমার উচিত হবে কাজটা এমন অবকাশ জুড়ে-জুড়ে করা যাতে কাজটা যতদূর-সম্ভব বেশিদিন টেকে। কোনোক্রমে যদি তুমি অন্তত বারো হাজার পেসোও বাঁচাতে পারো, তবে তুমি একটা বছর শুধু নিজের কাজ ক’রেই কাটিয়ে দিতে পারবে, অন্য-কারও কাজ নিয়ে অন্তত একটা বছর মাথা ঘামাতে হবে না, নিজের কাজটা তুমি তো দিনের পর দিন স্থগিত ক’রে রেখেছো এতদিন, যে এখন তার কথা তুমি প্রায় ভুলেই যেতে বসেছো। তোমার ওই বিপুল সব তথ্যর রচনা যাতে তুমি এস্পানিওল কোন্কিস্তাদোরদের আবিষ্কার ও জয়ের কথা বলবে, বলবে কী তারা করেছে আমেরিকায়। এমন-এক সর্ববিসারী রচনা, যেটা জুড়ে দেবে সব ছিন্নবিচ্ছিন্ন অসংলগ্ন কাহিনী ও কালপঞ্জি, মানে বার করবে সবকিছুর যাতে তা হ’য়ে ওঠে বোধগম্য, না, না সহজবোধ্য, এস্পানিওল তার স্বর্ণযুগে যে কাজ হাতে নিয়েছিলো যে অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিলো, তাদের সব কথা থাকবে এতে, থাকবে রেনেসাঁসের সব মানবিক লক্ষণ আর রূপবৈচিত্র্য আর তার প্রধান-প্রধান সব উপার্জন ও অবদান, শেষটায় তুমি হেনেরালের ওই একঘেয়ে বিরক্তিকর পাতাগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে তোমার নিজের কাজেরই সাল তারিখ আর সারমর্ম সংগ্রহ ও সংকলন করতে শুরু করে দাও। সময় কেটে যায়, তুমি তোমার ঘড়ির দিকে নজরই দাওনি, যতক্ষণ-না আবার তুমি শুনতে পাও ঘণ্টার শব্দ। তখন তুমি গায়ে তোমার জ্যাকেটটা চাপিয়ে নিচে খাবার ঘরে চ’লে আসো।
আউরা আগেই এসে ব’সে আছে। এবারে সেনিওরা ইয়োরেন্তে এসে বসেছেন টেবিলের শীর্ষ আসনে, তাঁর গায়ে জড়ানো তাঁর শাল আর রাতের আলখাল্লা আর খোঁপার ওপর কেশজাল, ঝুঁকে ব’সে আছেন তাঁর রেকাবির ওপর। চতুর্থ একটা জায়গাও কিন্তু সাজিয়ে রাখা আছে। ‘তুমি’ অজান্তেই মনে-মনে সেটা লক্ষ ক’রে নিয়েছো। এসব আর তোমায় ভাবায় না বা ত্যক্ত করে না। এই বুড়ি মহিলাটির যাবতীয় বাতিক মানিয়ে চললে তুমি যদি তোমার ভাবী কাজের জন্যে সৃজনশীল অবকাশ পেয়ে যাও, তবে আর ক্ষতি কী— তোমার ভাবী সৃষ্টির জন্যে যদি এই দামই তোমায় দিতে হয়, বেশ, তুমি না-হয় তা-ই দেবে, সহজেই। তাঁকে তাঁর সুরুয়া খেতে দেখে মনে-মনে তুমি আন্দাজ করবার চেষ্টা করো সত্যি-সত্যি তাঁর বয়েস কী হ’তে পারে। একটা সময় আসে জীবনে যার পর আর কোনো হিসেবই রাখা যায় না কত বছর— বছরের পর বছর— কাটলো, আর সেনিওরা কোন্সুয়েলো সেই সিমান্ত পেরিয়ে এসেছেন দীর্ঘকাল আগেই। তাঁর স্মৃতিকাহিনীর যতটুকু তুমি এরই মধ্যে প’ড়ে ফেলেছো, তাতে কোত্থাও হেনেরাল কিন্তু তাঁর কথা উল্লেখই করেননি। কিন্তু ফরাশি হামলার সময় হেনেরালের বয়েস যদি বিয়াল্লিশ হ’য়ে থাকে, আর তিনি যদি মারা গিয়ে থাকেন ১৯০১-এ, চল্লিশ বছর পরে, তিনি তাহ’লে নিশ্চয়ই বিরাশি বছর বয়েসে মারা গিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই তবে, সেনিওরাকে বিয়ে করেছিলেন কেরেতারোর পরাজয় আর তাঁর নির্বাসনের পরে। কিন্তু তখন তো, তাহ’লে, তিনি নেহায়েতই এক কচি মেয়ে ছিলেন, নিতান্তই বালিকা...
তারিখগুলো নাগাল এড়িয়ে যায় তোমার কারণ সেনিওরা এখন কথা বলছেন তাঁর সেই ক্ষীণ কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে, সেই পাখির মতন কিচিরমিচির। তিনি কথা বলছেন আউরার সঙ্গে আর তুমি খেতে-খেতেই তাঁর কথা শোনো, শুনতে থাকো তাঁর নালিশের দীর্ঘ ফিরিস্তি, একটানা ব্যথাবেদনা, কী-কী অসুখের সন্দেহ, ওষুধের দাম যে এত বেড়ে গিয়েছে তাই নিয়ে আরেক দফা নালিশ, বাড়িটার ভেজা স্যাঁতসেঁতে ভাব এবং ইত্যাদি-ইত্যাদি। তুমি যদি পারতে তাহ’লে এই গার্হস্থ্য আলোচনার মধ্যে সেঁধিয়ে পড়তে, জিজ্ঞেস করতে সেই ভৃত্যটির কথা যে তোমার মালপত্তর নিয়ে আসতে কাল গিয়েছিলো, সেই ভৃত্য যাকে তুমি দূর থেকেও এক ঝলকের জন্যে দ্যাখোনি, এবং যে কখনও টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে আপ্যায়ন করে না বা ফাই-ফরমাশ খাটে না। তুমি যখন তার কথা জিজ্ঞেস করতে যাবে ঠিক তখন আচমকা তুমি এই কথা টের পেয়ে অবাক হ’য়ে যাও যে এতক্ষণ অব্দি আউরা একটা কথাও বলেনি, টু শব্দটিও করেনি, শুধু ব’সে-ব’সে খাচ্ছে কলের মতো, সব হাল যেন ছেড়েই দিয়েছে সে, যেন সে অপেক্ষা ক’রে আছে বাইরের কোনো আবেগ বা তাড়নার জন্যে, তার কাঁটা চামচে আর ছুরি তুলে নিয়ে মেটের একটা টুকরো কাটবার আগে— হ্যাঁ-হ্যাঁ, মেটেই আবার, বোঝাই যায় এই বাড়ির প্রিয় সুখাদ্য— যেটা তারপর সে কাঁটায় বিঁধিয়ে নিয়ে মুখে তুলবে। তুমি চট ক’রে একবার মামি-ভাগ্নির মুখের ওপর নজর বুলিয়ে নাও, কিন্তু, ঠিক সেই মুহূর্তেই সেনিওরা নিথর হ’য়ে যান আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আউরাও তার ছুরি নামিয়ে রাখে তার পিরিচে আর সেও নিশ্চল হ’য়ে যায়, আর তোমার মনে পড়ে যায় যে সেনিওরা তাঁর ছুরিটা নামিয়ে রেখেছিলেন মুহূর্তেরই একটি ভগ্নাংশ আগে।
কয়েক মিনিটের জন্যে স্তব্ধতা ঘরের মধ্যে, তারা যখন স্থির অনড় মূর্তির মতো ব’সে আছে, ব’সে-ব’সে তোমাকে দেখছে, তুমি ততক্ষণে তোমার খাওয়া শেষ করো। শেষটায় সেনিওরা বলেন, ‘বড্ড ক্লান্ত লাগছে আমার। আমার টেবিলে এসে ব’সে খাওয়া ঠিক হয়নি। আয়, আউরা, আমায় ঘরে নিয়ে চল।’
সেনিওরা তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন, তিনি সরাসরি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকেন যাতে তুমিও তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকো, যদিও তিনি মুখে যা বলছেন তা আউরার প্রতিই উদ্দিষ্ট। সেই দৃষ্টি এড়াবার জন্যে তোমায় চেষ্টা করতে হয়, আবারও দৃষ্টিটা তেমনি বিস্ফারিত স্বচ্ছ, হলদেটে, ভাঁজ কিংবা আবরু বর্জিত— সাধারণত চোখের কোলের ভাঁজই এই দৃষ্টিকে অস্পষ্ট ক’রে রাখে। তারপর তুমি আউরার দিকে তাকাও, সে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে শূন্যতার দিকেই আর নীরবে তার ঠোঁট নেড়ে যাচ্ছে। সে এমন-একটা ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে যাকে তুমি ভাবো স্বপ্নচালিতের নড়াচড়া, সে বুড়ি মহিলার বাহু ধরে, তারপর আস্তে আস্তে তাঁকে ধ’রে-ধ’রে খাবার ঘর থেকে নিয়ে যায়।
একা এখন, তুমি তোমার পেয়ালায় কফি ঢেলে নাও, শুরু থেকেই কফি সেখানে ছিলো, তারপর ঠাণ্ডা কফিতে চুমুক দিতে-দিতে তুমি তোমার ভুরু কোঁচকাও, নিজেকে শুধোও তাঁর ভাগ্নির ওপর সেনিওরার কোনো গোপন প্রভাব আছে কি না? যদি মেয়েটি, তোমার এই সুন্দরী আউরা, তার সবুজ পোশাক পরা, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এই অন্ধকার পুরোনো বাড়িটায় আটকে আছে কি না। তবে সেনিওরা যখন তাঁর আবছায়াঢাকা ঘরে প’ড়ে-প’ড়ে ঘুমোন, তখন তো তার পক্ষে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তুমি নিজেকে বলো মেয়েটির ওপর তাঁর দখল নিশ্চয়ই ভয়াবহ কিছু। আর তুমি মনে-মনে তোমার কল্পনায় এর হাত থেকে বেরুবার একটা উপায় ভাবো-হয়তো আউরা অপেক্ষা ক’রে এড়িয়ে আছে তুমিই তাকে তার বন্দিনীর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে, যে-শৃঙ্খলে এই বিকৃতমনা উন্মাদিনী, এই বৃদ্ধা মহিলা, কোনো অজ্ঞাত কারণে, তাকে বেঁধে রেখেছে। তোমার মনে প’ড়ে যায় কয়েক মিনিট আগে আউরাকে কেমন দেখাচ্ছিলো, নিস্তেজ, মনমরা, তার বিভীষিকা তাকে সম্মোহিতা ক’রে রেখেছে, এই অত্যাচারিণীর সামনে কিছু বলতে অক্ষম, নীরবে শুধু নেড়ে যাচ্ছিলো তার ঠোঁট যেন নীরবেই সে তোমায় অনুনয় ক’রে বলছিলো তাকে মুক্তি দিতে; এতটাই তার দাসিত্ব যে সে সেনিওরার প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গি শুদ্ধু নকল করে, যেন সেনিওরা যা-যা করেন শুধু সে-সব করারই স্বাধীনতা বা অনুমতি তার আছে।
তুমি এই অত্যাচারের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক’রে ওঠো। তুমি এগিয়ে যাও অন্য দরজাটার কাছে, সেই যেটা নিচে যাবার সিঁড়ির ধারে, যেটা ওই বুড়ি মহিলার ঘরের ঠিক পাশেই : সেখানেই নিশ্চয়ই আউরা থাকে, কারণ বাড়িতে তো আর-কোনো ঘর নেই। তুমি দরজাটা ঠেলে খোলো, ভেতরে ঢুকে পড়ো। এই ঘরটাও অন্ধকার হ’য়ে আছে, শাদা চুনকাম করা চার দেয়াল, যেখানে একমাত্র শোভা কিনা কালো এক হেসুস ক্রিস্তো। বামদিকে একটা দরজা আছে বটে, তবে সেটা নিশ্চয়ই ওই বিধবার শোবার ঘরেই যায়; তুমি পা টিপে-টিপে, সন্তর্পণে, সেটার কাছে যাও, তোমার হাত রাখো দরজার গায়ে, কিন্তু পরক্ষণেই ঠিক ক’রে নাও দরজাটা তুমি খুলবে না : তোমাকে তার আগে নিরালায় আউরার সঙ্গে কথা ব’লে নিতে হবে।
আর আউরা যদি তোমার সাহায্য চায় তাহ’লে সে নিজেই তোমার ঘরে আসবে। তুমি একটুক্ষণের জন্যে ওপরে তোমার ঘরে চ’লে যাও, ভুলে যাও হলদেটে পাণ্ডুলিপির কথা, তোমার নিজের নোটবইগুলোর কথা, সারাক্ষণ শুধু ভাবতে থাকো তোমার আউরার রূপের কথা। আর যতই তুমি তার কথা ভাবো, ততই, তুমি তাকে তোমার একান্ত নিজস্ব ক’রে নাও, শুধু তার ওই সৌন্দর্য আর তোমার চেতিয়ে-ওঠা বাসনার জন্যেই নও, বরং তাকে যে তুমি মুক্ত ও স্বাধীন ক’রে দিতে চাও, সেটাও একটা বড়ো কারণ : তোমার কামনার তুমি একটা নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পেয়েছো, আর তাতে তোমার নিজেকে খুবই নিষ্পাপ সরল লাগে, আত্মতৃপ্ত লাগে। যখন তুমি আবার ঘণ্টার আওয়াজ শোনো, তুমি রাতের খাবার খেতে নিচে নেমে যাও না, কারণ ঠিক দুপুর বেলায় ওই ঘরে তুমি যে-দৃশ্যটা দেখেছিলে তুমি তার আরো-একটা পুনরাবৃত্তি সহ্যই করতে পারবে না। হয়তো আউরা নিজেই সেটা বুঝতে পারবে, আর রাতের খাওয়া হ’য়ে গেলে তোমার খোঁজে ওপরে চ’লে আসবে।
নিজেকে তুমি জোর ক’রে কাজে লাগিয়ে দাও, ওই কাগজপত্রের বান্ডিল খুলে। যখন সেগুলো তোমার একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর ঠেকতে থাকে, তুমি আস্তে-আস্তে তোমার ধরাচুড়ো খোলো, পোশাক খুলে চ’লে যাও বিছানায়, আর শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়ো, অনেক বছর পর এই প্রথমবার তুমি স্বপ্ন দেখতে থাকো, শুধু একটা জিনিসেরই স্বপ্ন দ্যাখো তুমি, দ্যাখো রক্তমাংসহীন একটা হাত একটা ঘণ্টা বাজাতে-বাজাতে তোমার দিকে এগিয়ে আসছে, চিৎকার ক’রে বলছে তোমার চ’লে যাওয়া উচিত, সকলেরই উচিত চ’লে-যাওয়া; আর যখন সেই মুখ যার চোখের কোটর ফাঁকা তোমার খুব কাছে এসে পড়ে, তুমি অস্ফুট একটা গোঁ-গোঁ আওয়াজ ক’রে ধড়মড় ক’রে জেগে ওঠো, ঘামে ভিজে যাচ্ছো তুমি, অনুভব করছো ওই নরম কোমল আঙুলগুলো কেমন আদর করছে তোমার মুখটাকে, ওই ঠোঁট দুটো খুব নিচু গলায় গুঞ্জন ক’রে কথা বলছে, মর্মরধ্বনি, সান্তনা দিচ্ছে তোমায়, তোমার কাছে ভিক্ষে চাচ্ছে ভালোবাসা-মমতা। তুমি তোমার হাত বাড়িয়ে দাও সেই অন্য শরীরটার খোঁজে, সেই নগ্ন শরীর যার গলা থেকে ঝুলছে একটা চাবি, আর যখন তুমি চাবিটাকে চিনতে পারো তখনই শুধু তুমি বুঝতে পারো কে সেই মেয়ে যে তোমার ওপর শুয়ে আছে, চুমো খাচ্ছে তোমায়, তোমার সারা শরীর ভরিয়ে দিচ্ছে চুমোয়। তারাহীন রাতের অন্ধকারে তুমি তাকে দেখতে পাও না, কিন্তু গন্ধ পাও তার চুল থেকে ভেসে আসছে পাতিওয় ফুটে-ওঠা লতাপাতা ফুলের গন্ধ, অনুভব করতে পারে তোমার বাহুডোরে তার মসৃণ উৎসুক দেহবল্লরী; তুমি আবারও তাকে চুমো খাও আর তাকে তুমি কোনো কথা বলতেও বলো না।
[চলবে]
বি.দ্র : ১. ‘আউরা,’ ইংরেজিতে ‘অরা’ : সৌরভ ইত্যাদির সূক্ষ্ম বিকিরণ, সুরভিতরঙ্গ, সুবাসের হিল্লোল— দেহসৌরভ, অলৌকিক আভা। যদি কারও নাম হয়, স্ত্রীলিঙ্গে, হ’তে পারে : সুরভি সুবাসী।
২. লেখাটি প্রকাশ করা হলো ‘কাগজ প্রকাশনী’র সৌজন্যে।
বাংলাদেশ সময় ২২০০, জুন ২, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক