৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ১০:৩৩ পিএম BDST banglanew24
11 Oct 2012   07:29:17 PM   Thursday BdST
E-mail this

আবিদুল ইসলাম-এর গল্প

কেন


আবিদুল ইসলাম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
কেন আবিদুল ইসলাম-এর গল্প

রিকশায় বসে থাকতে থাকতে মোর্শেদের মনের মধ্যে বিবিধ ধারার চিন্তার স্রোত বয়ে যেতে থাকে। এরমধ্যে আপাতত প্রথম চিন্তা হলো, কিছুক্ষণের মধ্যে রিকশা ছেড়ে দিতে হবে। সামনে ভিআইপি রাস্তা, ওখানে ত্রি-চক্রযান চলে না। রিকশা থেকে নেমে মিনিট পাঁচেক পথ হেঁটে প্রধান সড়ক পাড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে গলিপথে। সেখান থেকে দরাদরি করে আবার আরেকটা রিকশা নিতে হবে। কিন্তু তার চিন্তার জগতে যা প্রধান স্থান অধিকার করে আছে তাহলো কিছু পুরাতন স্মৃতির সঞ্চারণা। এই বিচিত্র স্মৃতির ভেতর হাবুডুবু খেতে খেতে মোর্শেদ ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে। তবে সেই স্মৃতির মূল প্রতিপাদ্য কী সে বিষয়ে জানার আগে তার অতীতটা সামান্য ঘুরে আসা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দুইজন ভর্তি হয় এক বছর আগে আর পরে। মোর্শেদরা যখন প্রথম বর্ষের সবেমাত্র ছাত্র, যুবায়ের করিমদের ব্যাচ তখন ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার জন্য রেজাল্টের আশায় প্রতীক্ষমাণ। ভর্তির কয়েক মাস বাদে একদিন অনুষদের সামনের বিস্তীর্ণ সবুজ চত্বরে যুবায়েরের সাথে আলাপ হলো। তার চারপাশ ঘিরে বেশ কয়েকজন ছেলে-মেয়ে বসে গভীর মনোযোগের সাথে তার কথা শুনছে। যুবায়ের হাত নেড়ে উত্তেজিত মুখভঙ্গিতে কী যেন বোঝাচ্ছে। মোর্শেদকে যে নিয়ে গিয়েছিল যুবায়েরের সাথে পরিচয় করাতে সেই শুভাশীষ ঐ ছোট্ট দলটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল আরো কিছুদিন আগেই। যুবায়ের দ্বিতীয় বর্ষের তুখোড় ছাত্র তখন। ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম-দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী সে নয়, কিন্তু বাংলা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে এর মধ্যেই সে এতোটা পরিচিতি লাভ করেছে যে সবাই তাদেরকে চেনে যুবায়েরদের ব্যাচ নামে।

শুভাশীষ ঘাসের ওপর বসে পড়ে মোর্শেদের হাত ধরে মৃদু টান দ্যায়। মোর্শেদ সামান্য ইতস্তত করে চারপাশে সাত-আটজন অপরিচিত ছেলে-মেয়ের মধ্যে বসে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে সে অবগত হয় যে আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু রবীন্দ্রসাহিত্যে ব্রা‏হ্মণ্যবাদের জয়কীর্তন। রবীন্দ্রনাথ নিজে ব্রা‏হ্মসমাজের অনুসারী হলেও তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে ব্রা‏‏‏হ্মণ্যবাদের জয়গান করে গেছেন তার সাহিত্যে। বিশেষ করে ‘গোরা’ উপন্যাসটা গভীরভাবে পাঠ করলে এই তৎপরতার দেখা মেলে। মোর্শেদ কখনো রবীন্দ্রনাথকে এভাবে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে নামাতে দ্যাখেনি কাউকে। স্কুল-কলেজের বাংলা সাবজেক্টের এবং এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কথা শুনলে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ যদি এই বাংলার পীরমুর্শিদ-জাতীয় কোনো কিছু হতেন তাহলে তার দরগার খাদেমগিরি করেই তারা অধিক তৃপ্তি লাভ করতেন। মোর্শেদ শোনে, আশপাশে বসে থাকা অন্যান্যরাও শোনে যুবায়েরের কথা, কখনো কখনো তারা সমর্থনসূচক মাথা নাড়ে- তাদের নিরব মাথা নাড়া যুবায়েরকে সুখী করে না, সে চারিদিকে তাকায় বুদ্ধিদীপ্ত কোনো প্রতিমন্তব্যের আশায়।

শুভাশীষের কাছে মোর্শেদ জানতে পারে যুবায়ের একটা পাঠচক্র চালায় ‘প্রশ্ন’ নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই তার এই তৎপরতার শুরু। বিভিন্ন বিজ্ঞান-ভিত্তিক এবং বিকল্প চিন্তাধারার বইপত্র তাদের পাঠ্যবিষয়। সেইসব বইয়ের উপজীব্য নিয়েই সে তার পাঠচক্রের আলোচ্য সাজায়। সাহিত্যামোদী এবং পড়ুয়া ছাত্রদের সে তার পাঠচক্রের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য স্বউদ্যোগে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সে বীরদর্পে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা অন্য কোনো চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও সে সমাজ-নির্ধারিত কৃত্রিম সুযোগের মুখে পদাঘাত করে তার প্রিয় বিষয় নিয়ে পড়ার জন্য বাংলাকে বেছে নিয়েছে। তার প্রধান উদ্দেশ্য বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথীদেরকে আকাশে বিচরণশীল অবস্থা থেকে যৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতার মাটিতে নামিয়ে আনা। আমাদের শ্রেণীকক্ষের শিক্ষকগণ আমাদের মনোজগতে তাদেরকে অধিষ্ঠিত করেন দেবতাপুরুষরূপে, সমালোচনা যার যেটুকু করা হয় সেটাও পাঠ্যসূচি-নিয়ন্ত্রিত বিষয়ের বাইরে যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে এতো কথা বলার পরও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রতিবাদ করেন নাই কেন। রবীন্দ্রনাথ ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন কীসের প্রেক্ষিতে। তার উদ্দেশ্য কী ছিল। এই নিয়ে কোনো সক্রিয় আলোচনা কোথাও হয় না। কেননা সেগুলো নির্ধারিত পাঠ্যসূচির বহির্ভূত বিষয়। অপ্রীতিকর বিষয়ের অবতারণা করে কেউ ফালতু ঝামেলায় যেতে চায় না। কাজেই চিন্তার অপরিবর্তনীয় সূত্র ধরে চলছে পাঠ্যক্রম।

পাঠচক্রের পর শুভাশীষ মোর্শেদকে যুবায়েরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে মোর্শেদের কাঁধে হাত রেখে সে লাইব্রেরি পর্যন্ত হেঁটে আসে। এতোক্ষণের উত্তেজনা কিছুটা থিতিয়ে এসে এখন সেখানে একটা আন্তরিকতার আবহ কাজ করে। তার সামগ্রিক কর্মতৎপরতার বিষয়ে সে মোর্শেদকে অবহিত করতে থাকে। সব বিষয়ে প্রশ্ন করতে হবে। সাহিত্যের দিকপালদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ, শাসন কাঠামো এবং তার উপাদানসমূহের পারস্পরিক ক্রিয়াশীলতা- সব কিছুর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে, প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলতে হবে সমাজ-নিয়ন্ত্রিত ধ্যান-ধারণাকে, ফাটল ধরাতে হবে বিদ্যমান অচলায়তনের দেয়ালে।

‘বুঝলা’, যুবায়ের সিগারেট ধরাতে ধরাতে মোর্শেদকে বলে, ‘প্রশ্ন অনেক রকম হয়। স্কুল-কলেজ পর্যন্ত কী, কখন, কোথায় এইসব প্রশ্ন করে আসছ। এখন প্রশ্নের ধরন পাল্টাতে হবে। মানব সমাজের মৌলিক প্রশ্ন হইল- কেন। এই প্রশ্ন মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই পুরাতন। এই দুনিয়াটা কেন সৃষ্টি হইল। কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে কেন না খেয়ে আছে, আবার কিছু লোক বিশাল গাড়ি চড়তেছে, বড় অট্টালিকায় থাকতেছে, বিলাসী জীবন যাপন করতেছে। কেন খোদা এইসব দেখে চুপচাপ বইসা আছে। কেন সরকার এইগুলা নিয়ে কিছু করে না। কেন তারা ভোটের সময় ধর্মের আশ্রয় নেয়। কেন দেশে মিলিটারিদের পিছনে বাজেটের এতো টাকা ব্যয় হয় কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষা-গবেষণার কাজে বলতে গেলে কোনো টাকা ব্যয়ই হয় না। এইসব প্রশ্ন তুলতে হবে। একটা প্রশ্নের সাথে সাথে আসবে আরো অনেক সম্পূরক প্রশ্ন। কিন্তু সবচাইতে মৌলিক প্রশ্ন হইল- কেন। সাহিত্যও এর বাইরের কিছু না এইটা মনে রাখতে হবে। জীবন, রাজনীতি, সাহিত্য হাত ধরাধরি কইরা চলে। তাই সাহিত্যিকগো ছাড় দেওনের সুযোগ আছে বইলা মনে হয় না।’

মোর্শেদ শুনে যায়, মোর্শেদ শুনে যেতে থাকে। যুবায়েরের কথাগুলো তার ভেতরে কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া উৎপাদন করে। একথা ঠিক যে সে সাহিত্য ভালোবাসে। পাঠ্যবইয়ের ভেতরে যে কবিতাগুলো থাকে সেগুলো পড়তে তার ভালো লাগে। এর মধ্যে কোনো কবির কোনো কবিতা বিশেষভাবে ভালো লেগে গেলে সে বাজার থেকে তার বিভিন্ন বই সংগ্রহ করে পড়ে। কিছু গল্পও তার ভালো লাগে। প্রবন্ধও মোটামুটি খারাপ না। সাহিত্য সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর সে দ্যায়। কিন্তু সেগুলো শিক্ষক-নির্ধারিত। ক্লাসে শিক্ষকই বলে দ্যান কোন প্রশ্নের উত্তর কীভাবে লিখতে হবে। মোর্শেদ মোটামুটি গুছিয়ে বাংলা লিখতে পারে। তার গদ্যরীতি সাবলীল। কিন্তু ভাষা যেমনই হোক না কেন লেখার মধ্যে কোনো নতুন বক্তব্য ঢুকিয়ে দিতে সে সাহস পায় না। সে ধরনের কোনো ইচ্ছাও তার মধ্যে জাগে নি কখনো। যুবায়েরের কথা শুনে তার বিগত জীবনের সাহিত্য-প্রীতিকে ব্যর্থ মনে হতে থাকে। যুবায়ের ঝাঁকড়া চুল নাচিয়ে সিগারেটে জোরে আরেকটা দম ফোঁকে।

মোর্শেদ খুব শিগগিরই পাঠচক্রের নিয়মিত সদস্য হয়ে পড়ে। সে দ্যাখে কেবল সাহিত্য-জিজ্ঞাসাই নয়, সমাজের এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব বিষয়কে প্রায় নিয়তি-নির্ধারিত কিংবা অপরিবর্তনীয়রূপে সে মেনে নিতে শিখে গিয়েছিল সেগুলো সম্পর্কেও উত্থাপিত হচ্ছে গুরুতর প্রশ্ন। যুবায়ের উত্তেজিত ভঙ্গিতে যুগপৎ হাত এবং মাথা নেড়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে, আবার নিজেই দিয়ে যাচ্ছে উত্তর। সেগুলো যে কোনো মনগড়া কথা নয়, তার সপক্ষে দিয়ে যাচ্ছে বিদ্বৎজনের রচিত বিভিন্ন বই থেকে রেফারেন্সের পর রেফারেন্স।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো কেটে যায় দ্রুতলয়ে। মোর্শেদ দ্যাখে যুবায়েরের চারিপাশে গড়ে উঠেছে মেয়ে-ভক্তের দল, যাদের কাজ তার মুখ থেকে বক্তব্য নিঃসরণকালে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। এদেরকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে কখনো শোনে নি মোর্শেদ। সে নিজে বরং মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন তুলে যুবায়েরের সপ্রশংস দৃষ্টির করতলগত হয়। মেয়েগুলোকে তেমন পাত্তা না দিয়ে সে মোর্শেদকেই কাছে টেনে নেয়, শুভাশীষ সহ অন্যরাও কিছুটা পেছনে পড়ে থাকে। মোর্শেদের ভেতর লুকায়িত সুপ্ত অনল যুবায়ের আবিষ্কার করে ফ্যালে, অন্যদের ব্যাপারে সে কিঞ্চিৎ হতাশা বোধ করে তাই হাল না ছাড়লেও কিছুটা নিস্পৃহভাব সে লুকাতে পারে না।

দ্রতলয়ে কেটে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো নিস্তরঙ্গ নয় মোটেই। এর মধ্যেই উপাচার্য-বিরোধী আন্দোলন দানা বাধে, ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস বয়কট করে। সরকার-সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নির্যাতন মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়, বিরোধী সংগঠনগুলি একযোগে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দ্যায়। কিছুদিন পরপর ক্লাস বন্ধ। বন্ধ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা দেয়া হলেও পাঠচক্রের আয়োজন হয় না। ক্লাস আবার শুরু হলে, ছাত্র-ছাত্রীরা গুটি গুটি পায়ে আবার আসা শুরু করলে পাঠচক্র বসে। সেখানে যুবায়ের যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দ্যায় এতোদিন ক্লাস বন্ধ থাকার, তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার প্রকৃত কারণ।

‘প্রশ্ন করতে হবে। কেন ভিসি অমুক অমুক ছাত্রের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না। কেন হলে পুলিশ প্রোটেকশন দেয়া হলো। কেন প্রোভিসি ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়ার পরও তা বাস্তবায়ন হলো না। এই প্রশ্নগুলো করলেই বোঝা যাবে এই ভিসি আসলে সরকারের তাঁবেদার, পুলিশ দিয়ে সে সরকারি গুণ্ডাপাণ্ডাদের প্রোটেকশন দিচ্ছে। প্রোভিসি তার পা-চাটা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ছাত্রদেরকে আবার ক্যাম্পাসে এনে ক্লাস শুরু করেছে।’

মোর্শেদ আর যুবায়ের বসে টিএসসিতে। যুবায়ের একটা সিগারেট ধরায়, কয়েক টান দিয়ে এগিয়ে দ্যায় মোর্শেদের দিকে। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলে, ‘বুঝলা মোর্শেদ, সব শালা হইল খানকির পয়দা। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায়, প্রশাসনে, মিলিটারিতে, কোর্টে, ইউনিভার্সিটির পরিচালনায় আছে কেউ মানুষের বাচ্চা না। এরা সবাই মিলা দেশটার এই দশা করছে। সংসদটা শুয়োরের খোঁয়াড়। কিন্তু কেউ কিছু কয় না। সবাই মনে করে ঐটা পবিত্র বস্তু, ঐখানে যারা বইসা আছে তারা আমাদের ত্রাণকর্তা। এইভাবে নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায় জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন নাই। কৃষকদের কোনো উন্নতি নাই। তারা কী দামে ফসল বিক্রি করে আর আমরা শহরে সেগুলো কী দামে কিনা খাই, তার খবর নিলে দেখা যাবে মাঝখান থেকে অনুৎপাদকদের মধ্যে কতো টাকা বাটোয়ারা হয়ে গেছে।’ মোর্শেদ মাথা নাড়ে। ‘এইসব কোনো ভাবের কথা না। এইগুলি আমাদের জীবন আর সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট কথা। উপরতলায় যারা বইসা আছে তারা সব হাত ধরাধরি কইরা খায়, বাইরে থেকে তাদের মধ্যে বিভেদ দ্যাখো কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা সবাই এক। সংসদে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আনার বিল উঠলে সেইখানে সরকার-বিরোধী দলের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। দেশের সম্পদগুলি বিদেশিদের ইজারা দিয়া রাখছে, সেইখানেও সরকার আর বিরোধীদের কোলাকুলি। এইসব বিষয় নিয়া প্রশ্ন ওঠে না। প্রশ্ন ক্যান ওঠে না এই প্রশ্নই এখন তুলন দরকার। সেইটা করলেই বোঝা যাবে যে এস্টাবলিশমেন্ট তাদের প্রচারণার জোরে কীভাবে আমাদের বিভ্রান্ত কইরা রাখছে।’


মোর্শেদ ইতোমধ্যে রিকশা বদল করেছে। নতুন রিকশাচালকটি বেশ বৃদ্ধ, সে সেভাবে টানতে পারছে না। এই বৃদ্ধকে বেছে নেবার কারণ হলো একমাত্র সে-ই পঁয়ত্রিশ টাকায় গন্তব্যে যেতে রাজি হয়েছে। মোর্শেদ একবার ঘড়ি দ্যাখে। বিকাল চারটা। সময় দেয়া আছে সাড়ে চারটা নাগাদ। সে রিকশাচালকের গতির সাথে মিলিয়ে মনে মনে পথের দূরত্বের একটা হিসাব দাঁড়া করায়। এই সময়ের মধ্যে যাওয়া যাবে, যদি বড় কোনো জ্যামে না আটকা পড়ে যায় সে। আর পাঁচ-দশ মিনিট এদিক-ওদিক হলেও বাংলাদেশে সবাই সেটাকে স্বাভাবিক হিসাবেই মেনে নেয়। এই রিকশাচালকের বয়স আর শারীরিক অবস্থা দেখেও তার রিকশায় চড়তে সম্মত হওয়ায় মনে মনে নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে করতে সে আবার স্মৃতি-তাড়িত ভাবনায় ডুবে যায়।

যুবায়ের বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর একটা সুপরিচিত পত্রিকার বিনোদন পাতার দায়িত্ব পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে পাঠচক্রের সঞ্চালক হিসেবে তার যে পরিচিতি গড়ে ওঠে সেটা এক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল কিছুটা। যুবায়ের অবশ্য চেয়েছিল সাহিত্য পাতা, কিন্তু স্বনামধন্য এক অথর্ব কবি সেই স্থান অধিকার করে বসে থাকায় এবং তার নড়াচড়ার কোনো আভাস পাওয়া না যাওয়ায় সম্পাদকও নিজে থেকে তাকে ঘাঁটাতে সাহস পায় নি। যুবায়ের পত্রিকার কাটতির কথা ভেবে আপাতত বিনোদন পাতার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরে সুযোগ আসবেই, তখন নিজের জায়গা বুঝে নিতে তার কোনো অসুবিধা হবে না।

মোর্শেদ একদিন যায় যুবায়েরের অফিসে। চারিদিকে ছুটোছুটি, দেয়ালে বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি সিনেমার জগতের নায়িকাদের পোস্টার, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের আলো এবং বাতাস মাখামাখি, তার ভেতর যুবায়ের একটা ইজ্জতপূর্ণ চেয়ারে অধিষ্ঠিত হয়ে বসে আছে। কিন্তু তার মুখটা মোর্শেদের কাছে সুখী সুখী বলে মনে হয় না। কারণটাও সে বুঝতে পারে। সাহিত্য পাতায় তার কাঙ্ক্ষিত অধিষ্ঠানের আশু সম্ভাবনা না থাকায় নিজেকে নিজের কাছে কিছুটা অপমানিত এবং ক্লিষ্ট বোধ করছে যুবায়ের। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে সে মোর্শেদকে কয়েকবারই বলেছিল তার স্বপ্নের কথা। চাকরি নেবে সে স্বনামধন্য পত্রিকা অফিসে। সাহিত্য কিংবা উপসম্পাদকীয় পাতায়। সেখানে রাজনীতি-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ভিন্নমতগুলোকে বিশেষ প্রশ্রয় দিয়ে ছাপানোর ব্যবস্থা করবে। সম্পাদকের চোখ-রাঙানিকে সে মোটেও পাত্তা দেবে না, কারণ দ্রুত সময়ের মধ্যে তার পরিচালিত পাতাটি অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাওয়ায় সম্পাদক ব্যাটাও তার কাজে হস্তক্ষেপের আগে কয়েকবার ভেবে নেবে। কিন্তু এখন এই বিনোদন নামক ভাঁড় পাতায় রুটিনবদ্ধ ভারবাহী জীবন অতিবাহিত করার অধিক কিছু করণীয় নেই।

মোর্শেদকে দেখে যুবায়ের খুশি হওয়ার ভান করে। আগে নিজের টানা সিগারেটটাই মোর্শেদের দিকে এগিয়ে দিত, এখন সে ড্রয়ার টেনে চকচকে একটা আস্ত প্যাকেট বের করে।

দুজনে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়া চলে। যুবায়ের ছাদের দিকে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলে যায় নিজের কথা, ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। কলেজ জীবনে সে যে তুখোড় বিতার্কিক ছিল সেটা মোর্শেদকে আরো একবার স্মরণ করিয়ে দ্যায়। নিজের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পাঠচক্রে অনিয়মিত উপস্থিতির জন্য সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
‘এখন খুব একটা সময় দিতে পারি না। তবে তক্কে-তক্কে আছি। ঐ ঊনিশ শতকীয় বুড়াটা সরলেই আমি জায়গাটা পাবো। সম্পাদকের সাথে কথা হয়ে আছে। মালিকেরও নাকি সায় আছে। তখন আমার এইখানেই পাঠচক্রের নতুন অফিস খুলব। তোমরা সবাই এইখানে আড্ডা দিতে পারবা। পাঠচক্রের সাহিত্য-বিষয়ক আলোচনাগুলি সাহিত্য পাতায় যাবে। কেউ কিছু কইতে পারব না। ... তারপর তোমাদের অবস্থা-টবস্থা কী? নিয়মিত চলতেছে তো সব কিছু ঠিকঠাক?’

মোর্শেদ ইতস্তত করে। সামনে পরীক্ষা, পাঠচক্রে নিয়মিত যাওয়া হয় না পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ততার কারণে। কিন্তু এইটা অজুহাত হিসাবে দেয়াটা ঠিক না। যুবায়েরের অনুপস্থিতিতে শুভাশীষ আর শাহানা নামের একটা মেয়ে সামলায় সব কিছু। পরীক্ষা তো শুভাশীষেরও আছে। আর শাহানা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়ে। পড়াশোনার চাপ তার কম নয়। কিন্তু পাঠচক্রের বিষয়ে তাকে মনে হয় আত্মোৎসর্গীকৃত। মোর্শেদ চারিদিকে হাতড়ে উপযুক্ত অজুহাত খুঁজে পায় না। তারপর মিনমিন করে পড়াশোনার ব্যস্ততার কথাই শোনায়, নিজের স্বর তার কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারে পেঁচিয়ে যাওয়া ফিতে হতে উৎসারিত ভঙ্গুর ধ্বনির মতো মনে হয়।

যুবায়ের বুঝতে পারার ভঙ্গিতে মাথা দোলাতে থাকে। ‘পড়াশোনার চাপ তো থাকবেই। সেইটা নিয়া কিছু করার নাই। এর মাঝেই সময় বের কইরা কাজও চালাইতে হবে। পাঠচক্রের কাজ এখন অনেক বিস্তৃত হইছে। আলোচনার বিষয়বস্তু বেড়ে গেছে। কার্যক্রমও আর আগের মতো কথাবার্তায় সীমিত নাই। এখন আমরা হাতে লেখার বদলে ছাপানো রঙিন পোস্টার লাগাই ভার্সিটির দেয়ালে দেয়ালে। সদস্য সংখ্যাও আগের তুলনায় বাড়ছে অনেক। সব জায়গায়ই পরিবর্তনের ছোঁয়া। মনে হইতেছে ‘প্রশ্ন’ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই অবস্থায় সম্পৃক্ত থাকাটা জরুরি। তবে তাই বইলা তোমার অধিক প্রেশার নেওনের দরকার নাই। যখন পারো কাজকর্মে হাজির হইয়ো। শাহানার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাইখো। আর মনের মধ্যে সব সময় প্রশ্ন জাগায়ে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে মানুষের চিন্তাজগতের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হইল- কেন।’


আট বছর পর একদিন অফিসের টেবিলে রাখা সেল ফোনে রিং বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর দেখে কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর কল রিসিভ করতেই ওপাশ হতে কানে ভেসে আসে স্মৃতিকোষ থেকে প্রায় মুছে যাওয়া একটি
কণ্ঠস্বর:
‘কী মিয়া, আছো কেমন?’
‘ভালো।’ মোর্শেদ অনিশ্চিত স্বরে জবাব দ্যায়।
‘চিনতে পারো নাই নাকি?’
মোর্শেদকে বাধ্য হয়ে অপরাগতা কবুল করে নিতে হয়। বিনিময়ে ওপাশ থেকে উদ্দাম হাসির স্রোত কর্ণকুহরের তটে আছড়ে পড়তে শোনে সে।
‘তোমারে মিয়া আমার শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করতাম এতোদিন। এখন দেখি তুমি আসলে শুভা-খানকি ছাড়া আর কিছু হইতে পারো নাই।’
কণ্ঠের বিশেষ টোনে এবার মোর্শেদ তাকে চিনে ফ্যালে এক নিমিষেই।
‘যুবায়ের ভাই! এতোদিন পর? কোথায় আছিলেন এতোগুলা বছর?’
ঐপাশে কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর ভেসে আসে, ‘সে অনেক কথা। কমুনে একদিন। সময় কইরা আমার বাসায় আসো। ধানমণ্ডিতে নতুন বাসা ভাড়া নিছি। গ্রাম থেকে আম্মারে নিয়া আসছি। তারে একটা ঘর দিছি, সে সেইখানে বইসা আল্লা-বিল্লা করে সময় কাটায় আর আমারে খালি বিয়ার জন্য বকে। পঁয়তিরিশ বছর বিয়ার জন্য একটা বয়স হইল মিয়া। এখনো তো দুনিয়াটাই ঠিকমতো দ্যাখতে পারলাম না।’

কথা শেষ হলে ফোন রেখে দিয়ে মোর্শেদ অতীত স্মৃতি রোমন্থনে ডুবে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরোনোর পর একটা চাকরির জন্য বেশ কিছুদিন ঘুরতে হয়েছিল তাকে। পাঠচক্রের অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগ ক্ষীণতর হতে হতে একপর্যায়ে প্রায় মিলিয়ে যায়। সেই সূত্রে যুবায়ের-প্রসঙ্গও তার জীবন থেকে অন্তর্হিত হয় একসময়। তবে জেনেছিল যে তার ইচ্ছা পূরণ হয় নি শেষাবধি, ঊনিশ শতকীয় বৃদ্ধের তিরোধানের পর মালিকের পছন্দসই এবং সাহিত্য-চিন্তায় যুবায়েরের বিপরীত মেরুর বাসিন্দা এক তরুণ লেখককে সাহিত্য পাতার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। বীতশ্রদ্ধ যুবায়ের এরপর চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ বিনোদন ম্যাগাজিনে জয়েন করে। ম্যাগাজিনটি লব্ধপ্রতিষ্ঠ- বাংলাদেশের বিনোদন পাঠকসমাজে তার বিপুল চাহিদা। পত্রিকাটা একবার স্টান্ট নেয়, কান চলচ্চিত্র উৎসবের বিস্তারিত প্রতিবেদন করার জন্য যুবায়েরকে পাঠানো হয় ফ্রান্সে। শুনে বেশ শিহরিত বোধ করেছিল মোর্শেদ। সে তখন কোনোমতে একটা বায়িং হাউজে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। সেখানে দুই বছর কাজ করার পর একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কিছুদিন কন্টেন্ট রাইটারের ভূমিকায় দেখা যায় তাকে। এরপর একটা মাঝারি ধরনের দৈনিক পত্রিকায় বিনোদন পাতা, রাজনীতি পাতা, গ্রামের খবর পাতা- তাকে কিছুতেই স্থিতিশীল হতে দ্যায় না সম্পাদক মহাশয়। তার মধ্যে বিশেষ কোনো প্রবণতা অথবা দক্ষতার উদ্ভব হতে পারে না। কিছুদিন থেকে সে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে বেড়াচ্ছে। সেগুলো সব যে ছাপা হয় তা নয়, কিছু যায় জঞ্জালের ঝুড়িতে আপেক্ষিক চাহিদার বিবেচনায়। সাহিত্য পাতার বিভাগীয় সম্পাদকের কাঁচির তলে কিছু হয় খর্বকায়। সেগুলোর সব যে তার ইচ্ছাতে হয় এমন নয়; নগরীর লেখকবৃন্দ অনেক সময়ই আবেগাক্রান্ত অথবা বিশেষ চিন্তার বশবর্তী হয়ে সমকালীন অন্য এক প্রতিদ্বন্দ্বী লেখক সম্পর্কে হয়তো আক্রমণাত্মক কিছু বলে ফ্যালেন, পরে হুঁশ ফিরলে ততক্ষণাৎ টেলিফোন মারফত সে সমস্ত বক্তব্য কাটছাঁট করে ভদ্রস্থ অবস্থায় ছাপানোর অনুরোধ আসে। তখন বিষয়গুলোকে ঢেলে সাজাতে হয়, কোনো প্রশ্নের উত্তর আবার নতুন করে লিখতে হয়, কখনো পুরো অংশটিকেই বাদ দিতে হয়। এমনও হয়েছে যে লেখাটা সে তৈরি করে এনেছিল, বিভাগীয় সম্পাদকের টেবিলে তার সামনে বসে পুরোটাই পরিবর্তন করতে হয়েছে। মোর্শেদ এইসব নিয়ে ভাবে না। সাক্ষাৎকার ছাপা হওয়ার বিনিময়ে সে টাকা পায়, টাকা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকে। তার মধ্যে বিরূপ ভাবের উদয় হয় যখন তার পরিশ্রমসাধ্য পুরো কাজটিকেই বাতিল করে দেয়া হয়।

যাই হোক, তার বর্তমান চাকরি নিয়ে মোর্শেদ ভালোই আছে। পল্টনের একটা মেসে কয়েকজন উঠতি সাংবাদিকের সাথে বসবাস করছে, আপাতত বিয়েশাদি কিংবা চাকরি পরিবর্তন-সংক্রান্ত অন্য কোনো চিন্তা তার মানসজগতে নাই। দুয়েকটা গল্প-টল্প মাঝে-মধ্যে সে লিখছে অবশ্য, সেগুলো লিটল ম্যাগাজিনে আর পত্রিকার সাহিত্য পাতায় ছাপা হচ্ছে। কিন্তু ঐ গল্পগুলো মধ্যরাতে দুয়েকটা নারী-কণ্ঠের সপ্রশংস ফোনকল ছাড়া অন্য কিছু আকর্ষণ করতে পেরেছে বলে তার মনে হয় না। এর মধ্যে যুবায়ের করিম আর তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্রোতে হাবুডুবু খেতে খেতে স্থায়ীভাবে ডুবে গেছে কখন, কবে- সেটা মোর্শেদ এখন আর নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। এর মধ্যে অনেকদিন পর অপ্রত্যাশিত এই ফোনকল তার স্মৃতির অনেকগুলো খণ্ডচিত্রকে একসাথে জাগিয়ে তোলে।

দিন দুয়েক বাদে মোর্শেদ এবার কল দ্যায় যুবায়েরকে। নম্বরটা সে সেভ করে রেখেছিল প্রথম দিনই। ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেল। মোর্শেদ আবার কল করল। এবার বার চারেক বাজার পর ওপাশ থেকে ভেসে আসে যুবায়েরের সেই ভরাট কণ্ঠস্বর, বয়সের কারণে যা পূর্ণতা পেয়েছে এখন।
‘কী মিয়া, স্মরণ করলা যে হঠাৎ?’
‘একদিন আপনার সাথে দেখা করতাম, যুবায়ের ভাই। অনেক দিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই তাই ভাবতেছিলাম ...’
মোর্শেদের কানের পর্দায় পরিচিত হাসির ধ্বনি বোমার মতো সশব্দে ফেটে পড়ে। হাসি শেষ হলে যুবায়ের বলে যায়, ‘তুমি আবার কী ভাবতেছিলা মিয়া। তোমার তো কোনো খবরই আছিল না। আমি ফোন করায় না তোমার হুঁশ হইল। যাউগ্গা ব্যাপার না, তুমি আসতেই পারো। ঠিকানাটা লিখা লও।’
ফোন রাখার আগে মোর্শেদের মনে পড়ে যায়, ‘আরেকটা কথা যুবায়ের ভাই।’
‘কী কথা?’
‘আপনি আমার নম্বর পাইলেন কোথায়?’
‘দ্যাখো মিয়া তুমি পুরানাদের ভুইলা যাইতে পারো, সবাই তো তা করি নাই। তুমি পত্রিকায় লেখালিখি করো, তোমার গল্প-কবিতা ছাপা হয়, সেইগুলি তোমার পুরানো বন্ধুবান্ধবরা অনেকেই এখনো আগ্রহ নিয়া পড়ে। আমিও দুয়েকটা পড়ছি। তোমার নম্বর পাইছি শুভাশীষ ... নাহ্, ও তো দিতে পারল না ... তোমার নম্বরটা আমি শাহানার কাছ থিকা নিছি।’

কথোপকথন পর্ব শেষ হলে মোর্শেদ এবার শাহানার কথা ভাবে। বছর খানেক আগে নিউ মার্কেট এলাকায় দেখা হয়েছিল একবার। কোলে এক বছরের কাছাকাছি বয়সী একটা বাচ্চা। চোখে সানগ্লাস, লিপস্টিকে আরক্ত ঠোঁট। কৃত্রিম মেহেদি রঙের স্পর্শপ্রাপ্ত চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ক্ষীণাঙ্গিনী ছিল, এখন শরীরে কিছুটা মেদ-মাংসের আবির্ভাব হয়েছে। তখন তেমন একটা সাজগোজও করত না। এছাড়া তার মধ্যে কোনো আদিখ্যেতার ভাবও আগে লক্ষ করে নি কখনো মোর্শেদ, অথচ সেদিন ‘বাবু ভাই’ (মোর্শেদের ডাকনাম বাবু- ঐ নামেই জুনিয়রদের কাছে পরিচিত ছিল) বলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায়। তারা মার্কেটের মধ্যে একটা খাবারের দোকানে ঢুকে চটপটি খেতে খেতে আড্ডা দিয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ। তখনই শাহানার সাথে নম্বর বিনিময় হয়েছিল। সে তখন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের নিয়ে কাজ করছে এমন একটা এনজিওতে চাকরি করে। স্বামী একটা আধাপরিচিত বিদেশি কোম্পানিতে বেশ উচ্চপদেই আছে। বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো। একটাই ছেলে, বয়স এক বছর দুই মাস।

আশ্চর্যের বিষয়, মোর্শেদ এখন ভাবে, তাদের কথাবার্তার মধ্যে যুবায়ের-প্রসঙ্গ, যেই লোকটা কিনা তাদের পরিচয়-সূত্র, একবারও আসে নাই। সে এবার সেল ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট থেকে শাহানার নম্বর বের করে কল দ্যায়। গত এক বছর কোনো যোগাযোগ ঘটে নি তাদের মধ্যে। তবে আশা করা যায় সে নিশ্চয় এর মধ্যে নম্বর পরিবর্তন করে নি। যুবায়েরের সাথে দেখা করার দিন নির্ধারিত হয়েছে আগামী বুধবার বিকাল সাড়ে চারটায়, মাঝখানে এখনো তিনটা দিন বাকি। শাহানাকে বলে দেখবে যদি ব্যস্ত না থাকে তাহলে ওকেও নিয়ে যাওয়া যায়।

শাহানার নম্বরটা বাজতে বাজতে কেটে যায়। মোর্শেদ আবারও কল করে। আবার। এভাবে চারবার। কিন্তু ওপাশ থেকে কারো সাড়া মেলে না। মোর্শেদ ফোন রেখে দ্যায়। সে যে চারবার ফোন করেছিল এই তথ্য শাহানার মোবাইলে থাকবে। তার কাছে নিশ্চয় নম্বরটা সেভ করা আছে। কিন্তু সেদিন এবং তারপর গত তিনদিনেও সেই নম্বর থেকে মোর্শেদের কাছে আর কোনো কল আসে নি।


রিকশাচালক ভাড়া নিয়ে ঘাড়ের গামছা দিয়ে কপালের স্বেদকণাগুলো মুছে ফ্যালে। তারপর টাকাটা লুঙির কোচরগত করে। ভাড়া মিটিয়ে মোর্শেদ বাড়িটার দিকে একবার তাকায়। আলিশান বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু না। কিন্তু স্বচ্ছলতার ছাপ তাতে পরিস্ফূট। সে একবার ঘড়ি দ্যাখে, চারটা বিয়াল্লিশ বাজে। রাস্তায় যানজট তেমন কিছু ছিল না কিন্তু বৃদ্ধ রিকশাচালকের ক্লান্ত শরীর তাকে কায়ক্লেশে টেনে নিয়ে আসতে অতিরিক্ত সময়টুকু ব্যয় করেছে।

দারোয়ানের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে যুবায়েরের নাম করায় সে একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। যেন এই বাসায় যুবায়ের করিম নামে কেউ থাকে না।
‘কী নাম কইলেন? যুবায়ের করিম- এই নামে তো কেউ এই বাসায় থাকে বইলা মনে হয় না। আপনের নামটা আরেকবার কইবেন?’
‘মোর্শেদ হাওলাদার।’
‘হ, মোর্শেদ নামে একজন আসব বলছিল, কিন্তু সেইটা তো আহমেদ যুবায়ের সারের মেহমান।’
যুবায়ের করিম আবার আহমেদ যুবায়ের কবে হলো। মোর্শেদ মনে মনে ভাবে।
‘বুঝবার পারছি। একজনের নামের তো কতো লেঞ্জুরই থাকে। আপনে তারে চেনেন যুবায়ের করিম নামে, এইখানে তার পরিচয় আহমেদ যুবায়ের হিসাবে। বিরাট ল্যাখক। আচ্ছা, আপনে লিফট ধইরা যান, পাঁচে টিপবেন। সোজা উইঠা হাতের ডান দিকের ফ্লাট।’
দারোয়ান-নিদের্শিত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোর্শেদ এবার দেখতে পায় সেখানে নেমপ্লেটে বড় আকারে লেখা আছে:


আহমেদ যুবায়ের
স্ক্রিপ্ট রাইটার

নামটা এতোক্ষণে তার স্মৃতিকোষে একটা ছোটখাটো ধাক্কা দ্যায়। আহমেদ যুবায়ের! হ্যাঁ, এখন পরিচিত লাগছে বৈকি। চলচ্চিত্র এবং বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য লেখক। দুয়েকটা নাটকও বোধহয় লিখেছে সে। মোটামুটি চাহিদা সম্পন্ন। গত প্রায় তিন-চার বছর ধরে নিয়মিত কাজ করছে সে। কিন্তু এই ব্যক্তি যে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যুবায়ের ভাই এই চিন্তা তার মাথায় কখনো ঘুণাক্ষরেও আসে নি। আসার কোনো কারণও ছিল না। পেশাগত দায়িত্ব পালনে মাঝে মধ্যে যাদের কাছে যাওয়া হয় তাদের কারো মুখে ক্বচিৎ উঠে থাকবে তার নাম। এই তো, মাস দুয়েক আগে একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিকের ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানিয়েছিলেন তার ‘বর্ষায় মেঘ নাই’ উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে। চিত্রনাট্য লিখছে আহমেদ যুবায়ের। নামটা তখনো তার মাঝে দ্যোতনা সৃষ্টি করে নি কোনো।

কলিং বেলে আঙুল রেখে মোর্শেদ ভেতরে টুংটাং ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পায়। একটা পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে থাকে। অল্প বয়সী মেয়েটি দরজা খুলে দিয়ে মোর্শেদের দিকে প্রশ্নচি‎হ্নিত চোখে তাকায়।
‘যুবায়ের ভাই আছে না?’
মেয়েটির মধ্যে কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হওয়ার আগেই তার পেছনে পরিচিত একটা মুখ উঁকি দ্যায়। মুখাবয়বটা আগের মতোই আছে। ঝাঁকড়া চুলের সাথে ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি চেহারার মধ্যে ভারিক্কি ভাব এনে দিয়েছে। সেই ভাবের সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্যই বোধহয় হাতের জ্বলন্ত সিগারেটে টান দিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত গম্ভীর স্বরে সে সম্ভাষণ জানায়, ‘আসছ তাইলে। তোমারই অপেক্ষায় আছিলাম। আসো ভিতরে।’

ভেতরের দিকের কোনো একটা কক্ষ থেকে টেলিভিশনের শব্দ আসছিল, দরজা খোলার আগেই মোর্শেদ বাইরে থেকে শুনেছিল। যুবায়ের তাকে সেই দিকেই নিয়ে যায়। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই হাতের ডানে ড্রয়িং রুম, সেখান থেকে একটা ভারি সুগন্ধ উঠে এসে মোর্শেদের নাসারন্ধ্র আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। সেখানকার দামি সোফা সেট এবং বিশাল স্ক্রিনের একটা এলসিডি টেলিভিশন কয়েক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টিগোচর হয়। সম্মুখের প্যাসেজ ধরে সে যুবায়েরের পিছু পিছু অগ্রসর হয় শব্দ ভেসে আসা ঘরটার দিকে। ঘরে ঢুকে মোর্শেদ দেখতে পায় বড়সড় কম্পিউটার মনিটরে একটা সিনেমা চলছে। গানটা দেখেই সে ছবিটাকে চিনতে পারে। বলিউডে সাম্প্রতিক সময়ে হিট করা চলচ্চিত্র এটা। গানটা ইদানিং হিন্দি চ্যানেলগুলোয় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায়ই দেখায়। যৌনাবেদনময়ী নায়িকা শরীরের সমস্ত বাঁক যতোদূর সম্ভব দৃশ্যমান রেখে নৃত্যরত। তার ফরসা নিটোল পেটের ঠিক মধ্যখানে নিখুঁত সুগোল নাভিমূলের তৎপরতার সাথে আশ্চর্য সমন্বয় রেখে পেছনে নাচছে একই ধরনের সবুজ পোশাক পরিহিত একঝাঁক উদ্দাম পুরুষ। নেপথ্যে বাজনাসমৃদ্ধ হৈহৈপূর্ণ সঙ্গীত, সাথে নায়িকার লিপসিং চলছে। মোর্শেদ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে এরপর ঘরটার দিকে নজর বোলায়। আসবাব বলতে কম্পিউটার টেবিল ছাড়া আছে সংলগ্ন চেয়ার, একটা আলনা যাতে বেশ কিছু কাপড়-চোপড় রাখা। একপাশে আলমারি। আর মেঝের ওপর ধবধরে সাদা চাদর আবৃত একটা ম্যাট্রেস। ঘরের এক কোণে ফ্রিজ, পাশে একটা তেপায়া- কাছাকাছি দূরত্বে মাইক্রোওয়েভ ওভেন স্থান দখল করে আছে। জানালাগুলো ভারি পর্দায় ঢাকা। যুবায়ের তাকে ম্যাট্রেসের দিকে সংক্ষিপ্ত অঙ্গুলিনির্দেশ করে বসতে বলে। নিজে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে, তারপর ফ্রিজ খুলে অ্যাবসলিউট ভদকার বোতল বের করে। পাশ্ববর্তী তেপায়ার ওপর থেকে অপেক্ষমান দুটো গ্লাস নিয়ে তাতে পানির মতো স্বচ্ছ তরল ঢালে, লেমোনেড মেশায়। ডিপ ফ্রিজ থেকে বরফের কুচি নিয়ে ছড়িয়ে দ্যায় ওপরে। ফ্রিজ থেকে বের করে দুটো ঠাণ্ডা বার্গার, ওভেনে ঢুকিয়ে সেটিকে চালু করে। একটা গ্লাস মোর্শেদের দিকে এগিয়ে আরেকটা হাতে নিয়েই সে পাশে বসে পড়ে। রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে কম্পিউটারের সাউন্ড অফ করে দ্যায়।
‘তারপর মিয়া, বলো খবর-টবর কী তোমার।’

মোর্শেদ সংক্ষিপ্তাকারে যতোটা সম্ভব তার বর্তমান অবস্থা বয়ান করে। নিস্তরঙ্গ জীবনে উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো ঘটনা নাই। সে বরং আগ্রহী হয় যুবায়েরের দিনকাল সম্পর্কে জানতে। তার প্রশ্ন শুনে যুবায়ের হেসে মাথা নাড়ে।

‘আমি আছি একরকম আরকি। ফ্রান্সে গেছিলাম সেইটা শুনছ নিশ্চয়। সেইখানে এক জার্মান ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। ভালো ইংরাজি জানে। সাহিত্যের ঘরের লোক। আমার কথা শুইনা আর জার্মান সাহিত্য বিষয়ে আমার জ্ঞানের বহর দেইখা কইল জার্মানি চইলা আসো, দেখি তোমার একটা ব্যবস্থা করা যায় নাকি। দেশে আইসা সুযোগের অপেক্ষায় আছিলাম। লোকটার সাথে ই-মেইলে নিয়মিত যোগাযোগ হইত। ঐ ব্যাটা সাহায্য না করলে জার্মানি যাওয়া হইত না। বছর খানেক বাদে সেইখানে গিয়া পড়লাম আরেক বিপদে। ইংরাজি যা জানতাম তাতে সুবিধা হইল না বিশেষ। হোটেলে অড জব করন লাগত। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হইয়া জার্মান ভাষা শিক্ষা কোর্স করলাম, ভিসার মেয়াদ বাড়াইলাম পর্যায়ক্রমে। ঐ লোক একটা পত্রিকায় কিছু কাজ দিছিল জার্মান থিকা বিভিন্ন লেখা ইংরাজিতে অনুবাদের। বেশিদিন ভাল্লাগলো না। যখন বুঝলাম সস্তায় কাজ করায়ে নিতেছে তখন একদিন ভাগলাম। দুই বছরের কিছু বেশি আছিলাম জার্মানি, ঐখান থিকা গেলাম সুইডেন। রেস্টুরেন্টে-টেস্টুরেন্টে কাজ করলাম, ঘুইরা বেড়াইলাম। হাতে কিছু পয়সাপাতি হইল অবশ্য। প্রায় বছর চারেক হইল বাংলাদেশে ফিরছি, আসার পর আর বইসা থাকি নাই, কাজ শুরু কইরা দিছি। এখন বিজ্ঞাপন আর সিনামার স্ক্রিপ্ট বানাই।’ যুবায়ের কম্পিউটার স্ক্রিনের নৃত্যরতার দিকে নির্দেশ করে হাতের গ্লাসে চুমুক দ্যায়, ‘তুমি হয়তো ভাবতেছ বইসা বইসা এই নায়িকার দুধ-পাছা দ্যাখতেছি ক্যান। আসলে আট-দশটা বলিউডি মুভির ডিভিডি আইনা রাখছি। ঐগুলি বারবার ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া চালাইতেছি। যেইখানে যেই আইডিয়াটা হিট করে আমার কারেন্ট স্ক্রিপ্টে হান্দাইয়া দিমু। পরিচালকের তাগাদা আছে বুঝলা না মিয়া?’ হাসিমুখে সে চোখ টিপে দ্যায়।
‘স্ক্রিপ্ট লিখে ভালোই তো কামাইতেছেন।’

‘সেইটা ঠিকই বলছ’, গরম বার্গারে কামড় বসিয়ে যুবায়ের গ্লাসে আরেকটা ছোট চুমুক দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। ‘এই লাইনে খারাপ নাই। চলতি ধারার বাংলা সিনামার একটা সুবিধা হইল, চিত্রনাট্যে ঊনিশ-বিশ করলেই হইল। সেই সাথে কিছু বলিউডি আর দক্ষিণী মশলা যোগ করা, ব্যস। বিশ-পঁচিশ বছর ধইরা দর্শক এক মালই ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দ্যাখতেছে। তবে আমি নিজের ক্রিয়েটিভি দিয়া সংলাপে নতুন কিছু কিছু কথাবার্তা ঢুকাই, পরিচালকগণ মজা পায়। সেইজন্য ব্যস্ততাও বাড়তেছে। বিজ্ঞাপনেও সমানে কাজ করতেছি ইদানিং। ঐখানেও প্রায় একই অবস্থা। এখন তো শেভিং ক্রিম থিকা শুরু কইরা মোবাইল ফোন পর্যন্ত- কিছু ইয়াং পোলামাইয়া আইনা রঙচঙা পোশাক পরাইয়া বৃষ্টির মধ্যে নাচাও আর সাথে একটা গান জুইড়া দাও, জিঙ্গেলের মধ্যেও ব্যতিক্রম তেমন কিছু নাই। নির্দিষ্ট ঘরানার জিঙ্গেল কোন মিউজিশিয়ান করব সেইটা আগেই ঠিক করা থাকে। সত্যিকার অর্থে এখন বিজ্ঞাপনে কে কী কইল এইটা নিয়া পাবলিক তেমন মাথা ঘামায় না। তারা যেই জিনিসটা ব্যবহার করার সেইটা ঠিকই করব। তারা টিভিতে মাইয়াগুলার নাচ দেইখাই খুশি। এখন তো আবার পত্রপত্রিকার বিজ্ঞাপনও টিভিতে মহাসমারোহে শুরু হইছে।’ যুবায়ের হাসে।

তারা এবার কিছুক্ষণ চুপচাপ কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে নিরবে ঘটে যাচ্ছে খণ্ড প্রলয়। তুমুল মারামারি, গোলাগুলি। শত্রুপক্ষ অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ছে, নায়কের গায়ে একটাও লাগছে না। কিন্তু তার নিশানা অব্যর্থ, পিস্তল থেকে ছুটে আসা প্রতিটা গুলিতে একেকজন করে ছোটখাটো ভিলেন কুপোকাত। সাউন্ড বন্ধ থাকায় কানে কিছু আসছে না।

নিস্তব্ধতা ভাঙে যুবায়েরই প্রথম। জিজ্ঞেস করে, ‘শাহানার সাথে দেখা-সাক্ষাত হয়?’
‘না’, ছোট করে জবাব দ্যায় মোর্শেদ, গ্লাসটা তার ঠোঁটের কাছাকাছি এসে থেমে যায়। একবার মনে হয় তাকে বারবার ফোন করে না পাওয়ার ঘটনাটা বলে কিন্তু কী মনে করে আবার এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকে। আঙুল দিয়ে বার্গার নাড়াচাড়া করে।

‘আমার সাথে মাঝে মধ্যে হয়। কোনো বারে অথবা ক্লাবে বসি আমরা। সে তো এখন বিরাট নারী নেত্রী। হাসব্যান্ড একটা ফরেন কোম্পানিতে চাকরি করে। শাহানাদের এনজিওর সাথেও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। তারা অফিসে পার্টি-টার্টি দ্যায়। ওদের প্রতিষ্ঠান আবার বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বড় পৃ-ষ্ঠ-পো-ষ-ক।’ পৃষ্ঠপোষক শব্দটা ব্যঙ্গাত্মকভাবে ইচ্ছে করেই বিশেষ সুরে টেনে টেনে বলে যুবায়ের। ‘সেইসব অনুষ্ঠানেও যাওয়া হয়। ভাবতেছি শাহানার সাথে যৌথভাবে একটা কাজ হাতে নিব। নির্যাতিত নারীদের নিয়ে একটা সিনামার স্ক্রিপ্ট লিখুম। সেইখানে অভিনয় করব শাহানার প্রতিষ্ঠানের ভিকটিমরা। ও-ই প্রস্তাবটা আমারে দিছে। আমার কাছে দারুণ লাগছে। ও এই নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়া একটা বই লিখতেছে। ম্যানুস্ক্রিপ্ট শেষ হইলে প্রকাশের আগেই আমারে দিব। ঐখান থিকা আমার চিত্রনাট্যের প্রয়োজনীয় মাল-মশলা নিয়া নিমু। এই ধরনের ছবির পরিচালকের এখন অভাব নাই বাংলাদেশে। কতো পোলাপান এখন সিনামা নিয়া পড়াশোনা করতেছে। অবশ্য এই ব্যাপারে আমার পছন্দ নারী পরিচালক। প্রযোজকের সমস্যা নাই, শাহানার হাসব্যান্ড আছে। শাহানারেও আজকে ডাকতাম এইখানে কিন্তু দেশে নাই, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া গেছে হাসব্যান্ড আর পোলা নিয়া ঘুরতে।’
মোর্শেদ অকারণেই আরেকবার ঘরটার চারপাশে নজর বোলায়। ‘এখন কে কে আছে বাসায়?’
‘আম্মারে আইনা রাখছি সেইটা তো আগেই বলছি। কাজের মাইয়া আছে একজন, আর আছে রান্নার লোক। নিচে আছে গাড়ির ড্রাইভার, সে-ও এই বাড়িতেই একটা ঘর নিয়া থাকে। তবে আম্মায় যেইরকম জোর-জবরদস্তি শুরু করছে তাতে মনে হয় ঘরের লোক শিগগিরই আরেকজন বাড়ব।’ যুবায়ের হাসে, তার ঈষৎ স্থূলকায় উদরখানি হাসির তালে কাঁপতে থাকে।

বিদায় নেয়ার সামান্য আগে মোর্শেদ নিছক ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেস করে, ‘এই মুহূর্তে কী কাজ করতেছেন?’
নতুন ধরানো সিগারেটটায় জোরে পরপর দুইটা টান দ্যায় যুবায়ের। ‘ব্যস্ত, বুঝলা না? কাজের প্রেশার আছে। এই মুহূর্তে দুইজন ডিরেক্টরের কাজ করতেছি। দুইটা বাণিজ্যিক সিনামা। একটার নাম ‘চাকর কেন আসামী’, আরেকটা ‘স্বামী কেন বেইজ্জত’।’

বাংলাদেশ সময়: ১৯৩০ ঘণ্টা, ১১ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান