 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
রাজশাহী: সংকট যাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে তার নাম ‘রাজশাহী কলেজ’। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ কলেজের সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করায় মলিন হতে বসেছে এর অতীত সুনাম ও ঐতিহ্য।
এসব সমস্যা থেকে এখনই মুক্তি না মিললে অদূর ভবিষ্যতে কলেজটির ঐতিহ্য আর ধরে রাখা যাবে না। এমনটাই আশঙ্কা শিক্ষার্থীদের।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে রাজশাহী কলেজের অবদান অনস্বীকার্য। মাত্র ৬ জন ছাত্র নিয়ে ১৮৭৩ সালে প্রথম আর্টস কোর্স চালুর মধ্য দিয়ে কলেজিয়েট স্কুলের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে এ কলেজ। ক্রমবর্ধমান সাফল্যের কারণে ১৮৭৮ সালেই এটি প্রথম শ্রেণীর কলেজের অনুমতি পেয়ে বিএ শ্রেণীতে পাঠদান শুরু করে। এর সুনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ওই বছরই মাস্টার্স কোর্স খোলার অনুমতি লাভ করে কলেজটি।
এ ধারাবহিকতায় ১৮৮৩ সালে খোলা হয় বিএল কোর্স। কালক্রমে কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল জাতীয় ঘটনার গর্বিত অংশিদার এ কলেজ। একই সঙ্গে চলতে চলতে রাজশাহী কলেজ হয়ে উঠেছে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বেশ কিছু সংকট প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ধরে রাখার পথে অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে।
রাজশাহী কলেজে বর্তমানে ২২টি বিভাগ। বিএ সম্মানে ১৯ হাজার শিক্ষার্থী ছাড়াও ডিগ্রি পাস কোর্স ও অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে মোট ৩০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বিপুলসংখক এ শিক্ষার্থীদের পাঠদানে কক্ষ রয়েছে মাত্র ৬০টি। রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অধ্যয়নেরও ব্যবস্থা। অথচ কোনো কোনো বিভাগের নেই নিজস্ব শ্রেণী কক্ষই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিজ্ঞান অনুষদ বিভাগগুলোর জন্য দুইটি করে শ্রেণী কক্ষ রয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের চারটি বিভাগের মধ্যে সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দুইটি করে শ্রেণী কক্ষ থাকলেও অর্থনীতি বিভাগের নিজস্ব কোনো শ্রেণী কক্ষই নেই। কলা অনুষদের ৬টি বিভাগের মধ্যে ইংরেজি ও ইতিহাস বিভাগের নিজস্ব দুইটি করে শ্রেণী কক্ষ রয়েছে।
বাংলা, দর্শন, আরবী ও ইসলামী শিক্ষা এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের নেই নিজস্ব কোনো শ্রেণী কক্ষ। একই অবস্থা বাণিজ্য অনুষদের হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগেরও। নেই নিজস্ব কোনো শ্রেণী কক্ষ।
হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, “ আমাদের নিজস্ব কোনো ভবনই নেই। কলাভবনে ঘুরে ঘুরে ক্লাস করতে হয়। কখনও নিচতলায় কখনও দোতলায়। অনেক খুঁজে-টুজে হয়তো একটা কক্ষ পাওয়া গেল। শুরু হলো ক্লাস। এমনই সময় কোনো শিক্ষক এসে বললেন, এ কক্ষ তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। কি আর করা! ক্লাস বাদ দিয়ে আবারও অন্য কোনো কক্ষের খোঁজে বেরুতে হয়। এ অবস্থায় অনেকেই রাগ করে ক্লাস না করে চলে যায়।”
এরকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে প্রায়ই- বলেই কষ্ট চেপে রাখার বৃথা চেষ্টা করতে দেখা গেল ওই তরুণকে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জামিউল হাসান বাংলানিউজকে জানান, তাদের প্রত্যেকটি বর্ষে রয়েছে ২৫০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু শ্রেণী কক্ষের ধারণ ক্ষমতা মাত্র ১০০। এজন্য অনেক ছাত্রকে দাঁড়িয়েই ক্লাস করতে হয়। অনেক সময় পেছন থেকে শিক্ষকের কথাও শুনতে পাওয়া যায় না। এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে পারেন না।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম আকতার বাংলানিউজকে বলেন, “এমনিতেই সম্মান শ্রেণীর জন্য কোনো কক্ষ নেই। এর মধ্যে আবার উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাস। শিক্ষকরা এখন উচ্চ মাধ্যমিক নিয়েই বেশি ব্যস্ত।”
তিনি জানান, তাদের জন্য যে সেমিনার কক্ষটি রয়েছে সেটিতে বসবার মতো উপযোগী নয়।
ইসলামের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সারোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে জানান, কক্ষের অভাবে প্রায়ই ক্লাস হয় না। এছাড়া বিএ সম্মানের প্রতিটি বিভাগের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই দাঁড়িয়ে থেকে ক্লাস করতে হয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছেন না।
এদিকে, রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের তুলনায় আবাসিক সুবিধা অপ্রতুল। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ৯৬০ জন শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পান। মেয়েদের হোস্টেলে সাড়ে ৩০০ আসনের বিপরীতে এক বেডে দুইজন করে ৬৫০ জন ছাত্রী থাকছেন।
এছাড়া হোস্টেলের ৫টি নলকূপের মধ্যে অধিকাংশই নষ্ট। যে কারণে তাদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে শহরের বিভিন্ন মেসে অবস্থান করে পড়ালেখা চালাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে বিরাট ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কলেজের ৭টি ব্লকের মুসলিম ছাত্রাবাস, একটি হিন্দু ছাত্রাবাস ও দুইটি ছাত্রীনিবাস থাকলেও সেগুলোতেও বিদ্যমান নানা সংকট।
শিক্ষার্থীদের এ সংকট থেকে মুক্ত করতে আরো অন্তত ২টি বহুতল ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস নির্মাণ এখনই জরুরি বলে দাবি করলেন কলেজটির উপাধ্যক্ষ হবিবুর রহমান।
তিনি বাংলানিউজকে জানান, প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রাজশাহী কলেজের ভৌত অবকাঠামো অপ্রতুল। শিক্ষার্থীদের সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখতে একটি মিলনায়তন প্রয়োজন।
তিনি জানান, বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে একটি আধুনিক মিলনায়তন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনটির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অর্ন্তভুক্ত থাকলেও কর্তৃপক্ষ তা প্রকল্প থেকে বাদ দিয়েছে বলে এসময় অভিযোগ করেন তিনি।
অপরদিকে, কলেজের বিদ্যমান সংকটগুলোর মধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে পরিবহন সংকট। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা কলেজে আসা-যাওয়ার জন্য নিজস্ব পরিবহনের উপর নির্ভরশীল। অথচ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে গাড়ি রয়েছে মাত্র ৭টি। এরমধ্যে ৬টিই ভাড়ায় চালিত।
এসব গাড়িতে চলাচলকারী শিক্ষার্থীরা জানালেন, নানা দুর্ভোগের কথা। এসব বাসে বসার জায়গা তো দূরের কথা।। দাঁড়ানোর মত জায়গাও পাওয়া যায় না। এসব কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনাও।
তবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় এ সংকটের সমাধান হচ্ছে না বলে দাবি করেন উপাধ্যক্ষ হবিবুর রহমান।
তিনি জানান, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী কলেজে অনুদান হিসেবে একটি বড় বাস দেন। সেই থেকে দীর্ঘ ঊনিশ বছরেও কলেজের পরিবহন খাতে যোগ হয়নি নতুন কোনো বাস। নানা জটিলতায় এ খাতের হয়নি কোনো মৌলিক উন্নয়ন।
তিনি আরো জানান, রাজশাহী সিটি মেয়র ও সদর সাংসদ রাজশাহী কলেজকে ২টি ডবলটেকার বাস দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সেটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। একই সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্যেও নেই কোনো পরিবহন ব্যবস্থা।
প্রতি বছর সেমিনার বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা নেওয়া হলেও অনেক বিভাগের সেমিনার কক্ষে পর্যাপ্ত বই নেই। বেশকিছু বিভাগে আবার সেমিনার কক্ষই নেই।
বিষয়টি নিয়ে সমাজকর্ম বিভাগের একজন শিক্ষার্থী জানান, সেমিনার বাবদ তাদের কাছ থেকে ভর্তির সময় ৫০০ এবং ফরম পূরণের সময় ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ তাদের কোনো সেমিনার কক্ষই নেই।
কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমান ভবন সংকট, পরিবহন ও আবাসিক আসন সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আরো ৪০টি কক্ষ প্রয়োজন। শিক্ষার্থী তুলনায় আবাসিক হোস্টেলে আসন একেবারেই নগন্য। পরিবহন সুবিধাও নেই।”
তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাছে একাডেমিক ভবন এবং আবাসিক সমস্যা সমাধানের জন্য আবেদন করেছি।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিভাগের তুলনায় আমাদের প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশি। কিন্তু সুযোগ সুবিধা একেবারেই কম। বৃহত্তম রাজশাহী কলেজের সুযোগ সুবিধা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমান হওয়া উচিত বলে এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।
রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ আলী রেজা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলানিউজকে বলেন, “দুইটি আবাসিক হোস্টেল ও একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ১২ কোটি টাকা এসেছে। এসব নির্মাণ কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে বহু সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।”
বাংলাদেশ সময়: ১৯৫০ ঘণ্টা, অক্টোবর ০২, ২০১২
সম্পাদনা: আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর