১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শুক্রবার মে ২৪, ২০১৩ ৮:৪০ এএম BDST banglanew24
10 Sep 2012   07:21:40 PM   Monday BdST
E-mail this

গল্প

ঢেউ ভেঙে যায়


নরেশ মণ্ডল
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঢেউ ভেঙে যায় গল্প

অনেকক্ষণ সুমন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। বেলা পড়ে এসেছে। সূর্যের মধুর হাসি চলকে ওঠে জলে। ঘোলাটে জল, ওপাড় ঘেঁষে সিঁদুর ছড়ায়। সুমন বসে। বাঁধানো পাড়। তলার দিকে বোল্ডারের গায়ে আছড়ে পরে জল। আড়াআড়ি পার হয় কয়েকটা নৌকা। মাথার উপর দিয়ে কয়েক ঝাঁক পাখি ঢুকে পড়ে পেছনের গ্রামে। সমস্ত ভালোলাগা আজ যেন তাকে পেয়ে বসেছে। পথের ক্লান্তি জুড়িয়ে যায়। অনেকটা পথ পার হলে তবেই নদীটা। শুনেছে এখানে কোথাও আরো একটা নদী এসে মিশেছে। আসার পথটা দারুণ লাগলো সুমনের। দু’ ধারে শিশু, বাবলা, ইউক্যালিপটাস। মধ্যিখান দিয়ে চওড়া পিচ ঢালা রাস্তা। এ রাস্তায় এক আধটা বাস চলে। ভ্যানেরই আধিপত্য। বাঁ দিকে ইটভাটার চিমনি মাথা তুলে। ওদিকে কিছুটা এগোলে ডায়মন্ডহারবার। ডানদিকে ফলতা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। গড়ে উঠেছে বড়ো বড়ো বাড়ি, জলের ট্যাঙ্কও নজরে পড়ল। দু’পাশে গাছের সারি। মধ্যিখান দিয়ে চলে গেছে পাকা রাস্তা।

-আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটাতো তোমায় আগেও বলেছি। এখন আবার এ নিয়ে কথা বলছো। এক ঝটকায় কথাগুলো বলে রুনা।

কিছুক্ষণ বাকরহিত হয়ে পড়ে সুমন। ভাবতে পারেনি রুনা এভাবে কথাগুলো বলবে। স্বরটাও বেশ কর্কশ শোনায়। নিজেকে যথাসাধ্য সংযত করে, “তুমি এতটা অবুঝ হচ্ছো কেন। একটু বুঝবার চেষ্টা করো। প্রথম প্রথম একটু আধটু অসুবিধা হবে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্লিজ, রুনা তুমি একটু ভাবো।”

-এ নিয়ে আবার নতুন করে ভাবার কি আছে। আর এ নিয়ে তোমারইবা এতো মাথা ব্যথা কেন। আমাকে জড়ানোর কোন অর্থই হয় না। এ ব্যাপারে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। আর এটাই আমার শেষ কথা।

কথাগুলো বলে রুনা দম নেয়। একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এভাবে বলতে হয়তো চায়নি। কিন্তু বলা হয়ে গেল।

সুমন রুনার মুখের দিকে চায়। চোখ দুটো অসম্ভব শান্ত। কিছু আগেও সুমনের চোখে ছিল আগুন। কিন্তু কণ্ঠস্বর অনেকটা খাদে নামিয়ে এনে কথা বলে গেল। ভেতরের উত্তেজনা বুঝতে দেয়নি একবারও। শুধু বলল, “ওদের পাশে দাঁড়ালে ভালো করতে। কিছু শেখাতে পারতে। ওদের শেখানোর দায়িত্বটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই রুনা।”

-অমন মাষ্টারি ঢঙে কথা বোলো না।
-এটা আমাদের লজ্জা। শিক্ষিতের অহঙ্কার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে রুনা। নিজেকে এভাবে তুমি দূরে সরিয়ে রাখতে পার না। অন্ধকার। ভয়ঙ্কর এক অন্ধকারে আচ্ছন্ন সব। বস্তু থেকে আলো ঠিকরে এলে তবেই আমরা যেমন সেই বস্তুকে চোখে দেখি। জ্ঞান তেমনি আলোকচ্ছটা যা আমাদের চোখকে খুলে দেয়। প্রভেদ বুঝতে সাহায্য করে। জ্ঞানের ভাণ্ডারকে যত সমৃদ্ধ করা যায় ততই প্রসারিত হয় দৃষ্টি। এই অন্ধকারের পর্দাকে সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব আমাদেরও।

রুনা কোন কথা বলে না। হাতের রুমালটা আঙুলে পেঁচায়। চোখ চলে যায় দূরে। যেখানে সূর্যাস্তের অন্তিম লালিমা আন্দোলিত জলে। কখন যেন নদীটা রুনার বুকে তিরতির করে বয়। ফেলে আসা বইয়ের পাতা ভেসে ওঠে ছবির মতো। রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে ছবি। আজও আউড়ে যেতে পারে কত কবিতা। ফ্রক পরে বেণী দুলিয়ে আলপথে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া। খুনসুটি করা। মুগ কড়াই তুলে খাওয়া। ক্রমে শরীরে উঠল শাড়ি। চৈতি হাওয়া একদিন জানান দিল রুনা আর ছোটো নেই। হঠাৎই রুনা বড়ো হয়ে গেছে। উচ্ছলতার মধ্যেও এক সীমাবদ্ধতা কাজ করে। এই বয়ে যাওয়া নদী এক অন্য মাত্রা আনে রুনার জীবনে। কলকল করে বয়ে যাওয়া, পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ আছড়ে পড়া নদী। পাহাড়-পর্বত, চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এক সময়ে গভীর সমুদ্রে এসে লীন হয়ে যায়। রুনাও লীন হয়ে যেতে চায় গভীর প্রত্যয়ে।

-চলো যেতে হবে।

উঠে পড়ে সুমন। দূরে জ্বলে ওঠে আলো। আলো আঁধারির ঘেরা টোপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে এক মানব মানবী। অদ্ভুত এক নৈঃশব্দতা চারপাশ ঘিরে।

কলকাতা থেকে অনেক দূরে গড়েওঠা এই আধা শহরে এসেছিল সুমন। এক অমোঘ টানে। ভালোলাগার মহিমময় রূপ অন্বেষণে। এক উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই টান। তাই ছুটে আসা।

আলোর রোশনাই গ্রামময়। রাত বাড়ে। বাজির শব্দ। উচ্ছাস, হুল্লোড়। বলি হবে। বাজবে কাঁসর ঘণ্টা। কপালে রক্ত তিলক। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের উন্মাদনা। জল ছপছপে শরীরে নারী-পুরুষের হত্যে দেওয়া, দণ্ডি কাটা। কাদায় কাদাময় শরীর। পিচ্ছিল চারধার। উপবাস। মানত। আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের অভিপ্রায়ে কৃচ্ছ্রসাধন। টিভির পর্দায় দেখা ডিস্কো, পপ। পোশাক-আশাকে ফিল্ম স্টার। মেলাতে পারে না সুমন। এ যেন অনেকটা প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো।

আকাশের তারাগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। নদী থেকে ভেসে আসা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরময় খেলা করে। সামনে রিকশা স্ট্যান্ড। রিকশা মানে ভ্যান-রিকশা। রুনা গুন গুন করে গাইতে থাকে কোনো এক গানের কলি।

চেনা অচেনার রহস্যময়তার মধ্যদিয়ে ভ্যান-রিকশার টিম টিম আলো ওদের নিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে চলে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮২০ ঘণ্টা, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান