 |
অমিত সম্ভাবনার আলো নিয়ে পৃথিবীতে আসে শিশু। এ সম্ভাবনার বিকাশ কতটুকু ঘটবে তা নির্ভর করে তাকে কিভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক এবং মননে সমৃদ্ধ নাগরিকই আমাদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ একে অপরের পরিপূরক হলেও আমরা এতদিন শিশুর শারীরিক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দু’টি ভিন্ন প্রক্রিয়া।
শারীরিক বিকাশ বলতে শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধিতে বুঝায়। আর মানসিক বিকাশ বলতে ব্যবহার, ভাষার যথাযথ প্রকাশ, চিন্তা চেতনা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্রমাগত অধিকতর ক্ষমতা অর্জনকে বুঝায়। তাই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের যে অঙ্গ মানসিক কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করে সেই অঙ্গ অর্থাৎ মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয় মাতৃগর্ভে-যা প্রায় শতকরা আশি ভাগ। আর অবশিষ্ট কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি হয়-জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত। জন্মলগ্নেই শিশুর মস্তিষ্কে কোটি কোটি কোষ বিদ্যমান থাকে। মূলত: এই কোষ গুলো এককভাবে কিছু করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন এক কোষের সাথে অন্য কোষের সংযোগ। শিশুর পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে মস্তিষ্কের ৮০-৯০ ভাগ কোষের সংযোগ ঘটে।
তবে এর বেশির ভাগ সংযোগই ঘটে প্রথম ৩ বছর বয়সের মধ্যে। মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও বাড়ানোর জন্য এগুলোকে উদ্দীপ্ত করতে হয়। কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করার প্রধান উপায় হলো শিশুর সাথে ভাব-বিনিময় ও পারস্পরিক ক্রিয়া।
এরূপ প্রতিটি পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি হতে থাকে, ফলে মস্তিষ্কের একটি নেটওয়ার্ক বা কাজ করার উর্বর ক্ষেত্র গড়ে উঠে। এ প্রক্রিয়ায় শিশুর মস্তিষ্ক পরিপক্ক হতে থাকে। শিশুর সাথে ভাব বিনিময় ও পারস্পরিক ক্রিয়াদি যত বেশি হয়; শিশুর শিখন ও মস্তিষ্কের বিকাশ তত দ্রুত হয়।
শিশুর সুস্থ ও সঠিক মানসিক বিকাশের সঙ্গে শিশুর পারিপার্শ্বিক আবহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর পারিবারিক আবহ, সামাজিক আবহ, সর্বোপরি পরিবেশগত আবহ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রভাব রাখে শিশুর মানসিক বিকাশের পর্যায়ে। জন্মের পর থেকেই শিশু শিখতে শুরু করে। প্রতিটি মুহূর্ত তার শেখার সময়, প্রতিটি ক্ষেত্রই তার পাঠশালা। তাই, এ সময় শিশুর যতেœ পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া দরকার। শিশুকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়।
জন্মের পরই শিশুর বিভিন্ন ইন্দ্রিয় তথা-দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ-কাজ করতে শুরু করে। এগুলো উদগ্রীব থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। আর এ অভিজ্ঞতা দিতে হবে বার বার অত্যন্ত মনযোগ ও ভালবাসার সাথে।
ছোট শিশুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ হচ্ছে কথা বলতে শেখা ও ভাষা বোঝা। শিশুকে গান শুনিয়ে, কথা বলে, ছড়া শুনিয়ে যা বলা হয়, তার মাধ্যমে শিশু সবচেয়ে ভাল শেখে। মনে রাখা দরকার, কথা বলতে পারার অনেক আগেই শিশু ভাষা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে। তাই শিশুকে অনবরত ধ্বনি, শব্দ, কথা, গান, ছবি দেখিয়ে ও অঙ্গভঙ্গি দিয়ে ভাবিয়ে রাখুন। ফলে শিশু শুনে, অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে তার নিজস্ব ধ্বনি গুলোকে বোঝার মত শব্দে পরিণত করে কথা বলতে শিখবে।
শিশুকে প্রচুর খেলতে দিতে হবে। খেলা করে শিশুরা আনন্দ পায়। খেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। শিশুদের আচার আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে বড়দের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বড়রা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভাব দেখায় তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। এতে তার মানসিকতা ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে থাকবে।
তবে এর বিপরীত আচরণের ক্ষেত্রে শিশুরা ক্রোধ, অন্যের কথা না মানা, সহিংস আচরণ রপ্ত করতে থাকবে। শিশুর আবেগ অনুভূতি বা আচরণ অনেক সময় বড়দের কাছে অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য এটা স্বাভাবিক ও বাস্তব।
তাই এ ব্যাপারে পিতা-মাতা ও বড়দের যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হতে হবে। শিশু নতুন কিছু শিখলে, তা যতই সামান্য হোক, তার সামনে সম্মতি, উৎসাহ ও আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।
সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালবাসার দাবিপূরণ করে প্রতিটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকশিত করে তোলা সম্ভব। প্রত্যেক পিতা-মাতাই তার শিশুকে হাসি-খুশি, স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিদীপ্ত ও পূর্ণ বিকাশমান দেখতে চায়। আমরা যদি প্রতিটি শিশুকে ঐ একইরূপে দেখার চেষ্টা করি এবং সেভাবে গড়ে তুলতে আন্তরিক হই তবেই ভবিষ্যতে একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ও জাতি পাবো।
* পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার।
বাংলাদেশ সময়: ১৫০০ ঘণ্টা, এপ্রিল ১৩, ২০১২
নৃপেন/মোতাহের/বিপু/
সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর