আজ পহেলা শ্রাবণ। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী অঝোরে বৃষ্টি ঝরার কথা আজ। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণে মেঘের ছিটেফোটা চিহ্ন দেখা গেলেও বৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা শ্রাবণ আকাশে। ঘরের বাইরে যারা বের হয়েছে তারা প্রখর রৌদ্রের খরতাপে দিশেহারা। আকাশে যখন মেঘ নাই তখন কী আর করা সাহিত্যের মেঘে ভরসা বিনা? তাই বাংলা গান ও কবিতার সাহায্যেই শ্রাবণ বর্ষণে ভিজতে পাঠকের জন্য রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ থেকে তুলে দেয়া হল কিছু কবিতা-গান।
আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে
দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে,
ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে॥
ধরিত্রী তাঁর অঙ্গনেতে নাচের তালে ওঠেন মেতে,
চঞ্চল তাঁর অঞ্চল যায় লুটে
প্রথম যুগের বচন শুনি মনে
নবশ্যামল প্রাণের নিকেতনে।
পুব-হাওয়া ধায় আকাশতলে, তার সাথে মোর ভাবনা চলে
কালহারা কোন্ কালের পানে ছুটে॥
শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সজনি গো ,
শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা
নিশীথযামিনী রে।
কুঞ্জপথে সখি , কৈসে যাওব
অবলা কামিনী রে।
উন্মদ পবনে যমুনা তর্জিত ,
ঘন ঘন গর্জিত মেহ।
দমকত বিদ্যুত , পথতরু লুন্ঠত ,
থরহর কম্পত দেহ।
ঘন ঘন রিম্ ঝিম্ রিম্ ঝিম্ রিম্ ঝিম্
বরখত নীরদপুঞ্জ।
ঘোর গহন ঘন তালতমালে
নিবিড় তিমিরময় কুঞ্জ।
বোল ত সজনী , এ দুরুযোগে
কুঞ্জে নিরদয় কান
দারুণ বাঁশী কাহ বজায়ত
সকরুণ রাধা নাম।
সজনি ,
মোতিম হারে বেশ বনা দে ,
সীঁথি লগা দে ভালে।
উরহি বিলোলিত শিথিল চিকুর মম
বাঁধহ মালত মালে
খোল দুয়ার ত্বরা করি সখি রে ,
ছোড় সকল ভয়লাজে —
হৃদয় বিহগসম ঝটপট করত হি
পঞ্জরপিঞ্জরমাঝে।
গহন রয়নমে ন যাও বালা
নওলকিশোরক পাশ —
গরজে ঘন ঘন , বহু ডর পাওব ,
কহে ভানু তব দাস।
শুদ্ধ করো আমার জীবন
কাজী নজরুল ইসলাম
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি প্রতিটি ভোরের মতো
আবার নতুন হয়ে উঠি,
হই সূর্যোদয়
আমার জীবন তুমি পরিশুদ্ধ করো, আমি প্রস্ফটিত হই
আমি বহুদিন ঝরা ব্যথিত বকুল অকারে, আমি বহুদিন
বিষন্ন বিধুর;
একবার আমার মাথায় হাত রাখো, সুপ্রসন্ন হও
এই দগ্ধ বুকে করো শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ
আমি শ্যামল সবুজ বৃক্ষ হয়ে উঠি।
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হই সূর্যোদয়,
আমি হই উদিত আকাশ
আমি হয়ে উঠি প্রতিটি শিশুর হাতে প্রথম বানান-শেখা বই,
হয়ে উঠি ভোরবেলার পাখিদের গান;
আমার জীবন তুমি শুদ্ধ করো, আমি হই নতুন সবুজ
কোনো দ্বীপ,
আমি হই বাল্যকাল, আমি হই বরষার নব জলধারা
আমি বহুদিন ব্যথিত বিষাদ, আমি বহুদিন একা
ঝাউবন।
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হয়ে উঠি সদ্যফোটা ফুল
আমি হয়ে উঠি সকালের ঘুমভাঙা চোখ।
একদিন জলসিড়ি নদীটির
জীবনানন্দ দাশ
একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে
বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে রবো;- পশমের মতো লাল ফল
ঝরিবে বিজন ঘাসে,--বাঁকা চাঁদ জেগে র`বে,--নদীটির জল
বাঙালী মেয়ের মতো বিশালাক্ষ্মী মন্দিরের ধূসর কপাটে
আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে ভয়ে--তারপর সেই ভাঙা ঘাটে
রূপসীরা আজ আর আসে নাকো, পাট শুধু পচে অবিরল,
সেইখানে কলমীর দামে বেঁধে প্রেতিনীর মতন কেবল
কাঁদিবে সে সারা রাত,--দেখিবে কখন কারা এসে আমকাঠে
সাজায়ে রেখেছে চিতা; বাংলার শ্রাবণের বিস্মিত আকাশ
চেয়ে র`বে, ভিজে পেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে
শোনাবে লক্ষ্মীর গল্প--ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনে;
চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ি--শাদা শাঁখা--বাংলার ঘাস
আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ--আপনার মনে
ভাঙিতেছে ধীরে ধীরে;--চারিদিকে এইসব আশ্চর্য উচ্ছ্বাস--
বাংলাদেশ সময়: ১৬০০ ঘণ্টা, ১৬ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস