ছোটবেলায় সজল ছিলেন খানিকটা নার্ভাস প্রকৃতির ছেলে। আত্ম-বিশ্বাস ছিল না তেমন। যে কোন কাজ শুরুর আগেই ভয় পেয়ে যেতেন। বয়স একটু বাড়ার পর ভেবে দেখলেন, এগিয়ে যেতে হলে আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরী। শুরু হয় তার পাল্টে যাওয়া। আত্মবিশ্বাস নিয়েই সজল ২০০১ সালে মিডিয়ায় আসেন। গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় খুঁজে পান কাঙ্খিত গতি। আজকের সময়ে পৌঁছে সজল হয়ে উঠেছেন ছোটপর্দা অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা।
প্রতিবার ঈদ আসার প্রায় দুমাস আগে থেকেই মহাব্যস্ত হয়ে উঠেন সজল। আজকে গাজীপুর তো কালকে কক্সবাজার, সকালে পুবাইল তো বিকালে পুরান ঢাকা। প্রতি ঈদের মতো এবারও সজল প্রায় ডজন তিনেক ঈদের নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করছেন। এবার তিনি মোহন খান, রবি হাসান, রনি, ওয়ালিদ হাসান, মাহমুদ দিদার, আহমেদ সুস্ময়, নুজহাত আলভী আহমেদ, নবী মোর্শেদসহ বেশ ক`জন পরিচালকের ঈদের নাটকে কাজ করছেন।
কাজের ব্যস্ততা প্রসঙ্গে সজল বাংলানিউজকে বলেন, একক নাটকের তুলনায় সারা বছর ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি বেশি। তবে ঈদ এলে একক নাটক ঘিরেই থাকে সব ব্যস্ততা। বিরতিহীনভাবে কাজ করে যেতে হয়। বিশ্রাম নেওয়ারও সময় বের করা কঠিন হয়ে যায়। প্রতিবারই ভাবি, এবার কাজের পরিমাণ কমিয়ে দেব। কিন্তু পারি না। কারণ আমার ঘনিষ্ঠ ও শুভাকাঙ্খী পরিচালকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। ঈদে তারা প্রত্যেকেই দু-চারটা নাটক তৈরি করে থাকেন। তাদের অনুরোধ ফেলা আমার পক্ষে কঠিন, তাই কাজ করতে হয়। দিনে-রাতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হচ্ছে।
কাজের প্রতি সবসময়ই সজল বেশ সিরিয়াস ও সিনসিয়র। চেষ্টা করেন ঘড়ির কাটার আগে ছুটতে। শুটিংয়ের সবাই তার আসার অপেক্ষায় হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না সজল। সময়টা তাই খুব মেনে চলেন। কাজের প্রতি সজলের সিনসিয়রিটি ও কমিটমেন্ট কতটুকু, তা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা থেকে বোঝা যায়।
কিছুদিন আগে সজল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সুস্ময় সুমনের `নীল সীমানা` নাটকে অভিনয় করছিলেন। শুটিং চলাকালে একজন মোটর সাইকেল আরোহী তাকে বিপরীত দিক থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে সজল রাস্তায় পড়ে যান। এতে তার পায়ের গোড়ালি ও হাঁটুর বেশ কিছু স্থান ছিলে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটানায় হকচকিয়ে যান পরিচালক সুস্ময় সুমন। তিনি শুটিং সেদিনের প্যাক-আপ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাতে বাঁধা দিলেন সজল নিজেই। চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এসে খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, শুটিং শুরু করতে। পরিচালক সজলের শরীরের অবস্থা চিন্তা করে বিশ্রাম নিতে তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। সজল রাজি হন না। পরিচালককে স্রেফ জানিয়ে দেন, কাজটা শেষ না করে বাড়ি গেলে তার অস্থীর লাগবে। যেখানে অন্য অভিনেতারা একটা অজুহাত পেলেই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেখানে সজল জোর করে ক্যামেরা ওপেন করালেন।
অভিনয়ের জন্য সজল সবধরনের কষ্ট হাসি মুখে স্বীকার করে নিতে রাজি। তার প্রমাণ পাওয়া গেলো আরেকটি ঘটনায়।
নবী মোর্শেদের রচনা ও পরিচালনায় আগামী ঈদের জন্য নির্মিত হচ্ছে ৫ পর্বের ধারাবাহিক নাটক ‘প্রেমবাজ’। এই নাটকের একটি জায়গায় অভিনেতার এক্সপ্রেশন আর মুভমেন্ট খুব কাছে থেকে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে। ক্যামেরাম্যান পরিচালকের চাওয়া পূরণ করার উপায় খুঁজছিলেন। উপায় দেখালেন সজল। দৃশ্যটির জন্য তিনি নিজের কোমরে ক্যামেরা বেঁধে শুটিংয়ে অংশ নেন।
এ প্রসঙ্গে সজল বাংলানিউজকে বলেন, ২০/২২ কেজি ওজনের একটি ক্যামেরা কোমরে বেঁধে ছুটে চলা খুব কষ্টসাধ্য। কিন্তু ওই মুহূর্তে চরিত্রের প্রয়োজনে আমাকে তাই করতে হয়েছে। চরিত্রটিকে যথার্থভাবে ফুটিয়ে তুলতে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করি। এ বিষয়ে আমি কোন কম্প্রোমাইজ করতে চাই না।
সজল এরই মধ্যে তার সু-অভিনয়ের পরিচয় দিয়েছেন ‘`মুনিরা মফস্বলে’, ‘কুসুম ও মূর্খ মফিজের গল্প’, ‘হয়তো বা ভালোবাসা’, , ‘ডলস হাউস’, ‘প্রিয়দর্শিনী’, ‘অচলা’, ‘বিবাহ’, ‘নীলাঞ্জনা’‘মাধবীলতা’, ‘ভালোবাসার সীমানায়’, ‘দরজা খোলা ছিল’, ‘গোধূলি’ প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটকে। শহুরে এবং গ্রামীণ দুই চরিত্রেই দেখিয়েছেন অভিনয় দক্ষতা। কাজের প্রতি মনোযোগ আর চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা তাকে এ সময়ের ব্যস্ত অভিনেতায় রূপান্তরিত করেছে।
শুধু টিভি নাটকে নয়, সজল বেশ কিছু পণ্যের মডেল হয়েছেন। বড়পর্দাতেও হয়েছে তার অভিষেক। খালিদ মাহমুদ মিঠু ‘নিঝুম অরণ্য’ ছবিতে তার অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও কিছুদিন আগে তন্ময় তানসেনের পরিচালনায় `পুণ্য` নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। আগামীতে তাকে ‘চারুলতা‘ নামে একটি ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যাবে।
অনেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক পরিচালনা ও প্রযোজনায় এসেছেন। সজলের এরকম ইচ্ছে আছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটু একটু করে শিখতে শিখতেই আমি অভিনেতা হয়েছি। অভিনয় নিয়ে আমার স্বপ্নের পরিসীমা বহুদূর। তাই এখনই পরিচালনায় কিংবা প্রযোজনায় আসতে চাচ্ছি না। আমি আরও কিছুদিন একনিষ্ঠভাবে শুধু অভিনয় করে যেতে চাই। সব চরিত্রেই একজন পারফেক্ট অভিনেতা হতে চাই।
বাংলাদেশ সময়, ১৮২০, জুলাই ১৫,২০১২ সম্পাদনা: বিপুল হাসান, বিভাগীয় সম্পাদক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।