 |
অধরা কল্পনার জগৎ থেকেই আসে রং, দৃশ্য, শব্দ। আর এসব কবির কবিতার মাধ্যম। ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে তার সবই কবির মস্তিষ্কে ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু তার কতটুকুই বা আমরা করি? নিউরনের ট্রিলিয়ন ভাগের একভাগও মানুষ ব্যবহার করে নি। তাই কাব্য সৃষ্টিতে অভিনবত্বের ঘাটতি কোনকালেই হবে না।
কথাগুলো বলছিলেন এসময়ের কাব্য চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ নাম কবি জুয়েল মাজহার। বাংলানিউজের কনসালট্যান্ট এডিটর জুয়েল মাজহারের পাশের টেবিলে বসার সুবাদে তার সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিলো স্রেফ গল্পের ঢঙে। এবারের বই মেলায় জুয়েল মাজহারের ‘দিওয়ানা জিকির’ বের হয়েছে। বইটির একটি কপি এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে যখন সে খবর জানান দিলেন তখন খুব ভালো লাগছিলো। প্রকাশকের সঙ্গে জুয়েল মাজহারের কথাবার্তা প্রায়শই শুনতাম, তাই বই বেরোচ্ছে সে কথা অজানা ছিল না। বইটি হাতে নিয়ে প্রথমেই পড়লাম বইয়ের নাম কবিতা ‘দিওয়ানা জিকির’। এরপর ‘পরিযায়ী দিন’ কবিতাটি পড়ে ঝটিতি পড়ে ফেললাম ‘ছেঁড়া মেঘ, ছেঁড়া জামা’।
ছেঁড়া মেঘ, ছেঁড়া জামা
দুটোই আমার
দুটোই ঝুলুক আজ
আমার গরিব জানালায়
রোদ এসে কুয়াশারে শিশু ভেবে
কোলে তুলে নেয়। আর
সবার চোখের সামনে গলা টিপে মারে
চিরদিন এই দৃশ্য লেপ্টে থাকবে
আমার গরিব জানালায়!
কবির টেবিল থেকে জানালার ওপারের চিত্রকল্প নিয়ে অনেক কবিতা রয়েছে। তবে রোদ এসে কুয়াশারে শিশু ভেবে কোলে তুলে নেয় আর সবার চোখের সামনে গলা টিপে মারে এমন দৃশ্যের বর্ণনা নতুন ঠেকলো।
পাশের টেবিলে জুয়েল মাজহার তখন খবর সম্পাদনায় ব্যস্ত। জানতে চাইলাম আচ্ছা কবিদের জন্য উপমার বা দৃশ্যকল্পের অভিনবত্বের দিন কী কখনো শেষ হবে? আসবে কি এমন কোনো দিন যেদিন সব দৃশ্যকল্প লেখা হয়ে যাবে আর থাকবে না নতুন কবিতার জন্য মোক্ষম একটি দৃশ্য?
তারই উত্তরে জুয়েল মাজহার বললেন, মানুষ নিজেই গ্যালাক্সির মতো অসীম। মানুষের কারণেই অস্তিত্বশীল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। তাই মানুষের ভাবনার জগতে আসা বিষয় বৈচিত্রের কোনো শেষ নেই, হবে না কোনো কালে।
জানতে চাই তাহলে আমরা কেনো দেখি এক কবির উপমা প্রভাব ফেলে ফেলে অন্য কবির কবিতায়।
এটি কবির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকেই টেনে নেওয়া ---কেউই স্বয়ম্ভূ নয়। রবীন্দ্রনাথে বিহারীলালের ব্যাপক প্রভাব ছিল। জীবনানন্দ দাশের প্রথম দিককার কবিতায় নজরুল –জসীম উদ্দীনের প্রভাবটা সহজেই চোখে পড়ে। টি.এস. এলিয়টতো বলেইছিলেন, আমার কবিতায় পাওয়া যাবে পাউন্ডের (এজরা) নিশ্বাস। এর মানে প্রভাব খারাপ কিছু নয়। শিল্প যিনি করবেন তিনি আসলে পূর্ববর্তীদের রিলে রেসের কাঠিটাই বহন করবেন আর নিজের নিজস্বতার জায়গাগুলো খুঁজবেন। দৌড়টাকে আর একটু সামনের দিকে নিয়ে যাবেন। প্রভাবিত না হতে পারাই যেনো লজ্জার। তবে কবি তার নিজের সময়ের বাস্তবতাকেও নির্মাণ করেন। নতুন বাস্তবতা বা বিকল্প এক বাস্তবতার নির্মাণই কবির কাজ, বলেন জুয়েল মাজহার।
হাজার বছর আগে যখন লেখার উপকরণ ছিলো না তখন মুখে মুখে রচিত হতো কবিতা। মুখে মুখেই তা টিকে থেকেছে হাজার বছর। এক প্রজন্মের কবি আগের প্রজন্মের কবির রিলে রেসের কাঠিকে বয়ে নিয়ে গেছেন, গোত্রের ভাষায় তার গীত-গান-বীরগাথা-কবিতাকে মুখবাহিত করে ধারণ করে তা টিকিয়ে রেখেছেন। যেমন, স্বয়ং হোমার। ভ্রমণশীল চারণ কবির রূপে আখ্যানকে গেয়ে গেয়ে শোনাতেন তারা ----প্রাচীন গ্রিসে রাপসোদাইতরা বংশ পরম্পরায় সে কাজটিই করতো। তারা মুখে মুখে ধারণ করেই গোত্রের আখ্যানকে সংরক্ষণ করে গেছেন। লিখনবিদ্যা ও ছাপাখানা এসে সে স্থানটা দখল করলো।
বস্তুত, অতীতের অজস্র ‘আমি’ ও ‘আমাতে’ আমি নিমজ্জিত। তবে এটাও বলবো, কোনো কবিতাই পুরোপুরি নতুন বা পুরোপুরি পুরাতন নয়। একই নদীতে কেউ দ্বিতীয়বার গোছল করতে পারে না, আবার স্নান যে করছে সে ভাবে তার প্রতিটি স্নানই নতুন।
এতো যোগাযোগের তত্ত্ব বললেন। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাসের তত্ত্ব- ‘ওয়ান ক্যাননট স্টেপ টোয়াইস ইন দ্য সেম রিভার’ এমন মন্তব্য করলে কবি জুয়েল মাজহারের উত্তর কবিতা একটি শ্রেষ্ঠ, তবে সূক্ষ্ণতম যোগাযোগ মাধ্যম।
আসলে সংবেদনশীলতাই হলো যে কোনো শিল্প মাধ্যমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাবনার জগৎকে তৈরি করতে মূল ভূমিকা পালন করে এই সংবেদনশীলতা। এখানে দেখার ভঙ্গিটি আর তাকে নিজের মতো করে ফুটিয়ে তোলার কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক বা শিল্পভোক্তা বাস্তবের উপরিতলের বাসিন্দা। কিন্তু কবি বা চিত্রকর তার পাঠককে বা শিল্পভোক্তাকে অন্য এক বাস্তবতার দিকে অলক্ষ্যে হাত ধরে নিয়ে যান। তবে এটা করা খুব কঠিন। প্রতিভার পাশাপাশি তাকে তা ফুটিয়ে তুলতে হয় উপযুক্ত ভাষায়-রঙে। এ জন্য কবির শব্দের পরিমিতিবোধ, ছন্দবোধ ও সুষমা, সুসমতা থাকা খুব প্রয়োজন। এটি আর দশজনের মতোই কবি বা চিত্রকরকে কষ্ট করে শিখে নিতে হয়।
ছন্দের প্রসঙ্গ আসতেই আলোচনা গড়ালো দিওয়ানা জিকির-এ লেখা আরেকটি কবিতা ‘ঈর্ষার এঞ্জিন’ নিয়ে। এটি বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্দাক্রান্তা ছন্দে লেখা একটি কবিতা-
‘ঈর্ষার এঞ্জিন গরজি ওঠে আজ; ঘুরছে মঞ্জুল মেঘাঙ্কুর;
ঘুম এক চিৎকার! আকাশে চুনিলাল সূর্য-ক্রন্দন ঝড়ায় খুন।
জুয়েল মাজহারের দাবি, বাংলাদেশি কবিদের মধ্যে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজই প্রথম মন্দাক্রান্তা ছন্দে কবিতা লেখেন। আর সেটি তিনি উৎসর্গ করেন তার কবিবন্ধু জুয়েল মাজহারকে। আর তারই জবাবে প্রত্যুপহার হিসেবে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে জুয়েল মাজহার উৎসর্গ করেন তার লেখা মন্দাক্রান্তা কবিতাটি। বাংলাদেশে তাদের আগে আর কেউ মন্দাক্রান্তা ছন্দে কবিতা রচনা করেছেন বলে তাদের জানা নেই।
লঘু ও গুরুধ্বনির স্বর সঙ্গতি মেনে সংস্কৃতভাষার এই অভিনব ছন্দের গুরুকবি কালিদাস। তবে বাংলায় প্রথম এ ছন্দকে আত্মস্ত করেছিলেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তার লেখা ‘যক্ষের নিবেদন’ এমনই একটি কবিতা।
‘পিঙ্গল, বিহ্বল ব্যথিত নভঃতল কই গো কই মেঘ উদয় হও
সন্ধ্যার তন্দ্রার, মূরতি ধরি আজ, মন্দ্র মন্থর বচন কও।
সত্যেন্দ্র নাথের এই কবিতাও শতভাগ মন্দাক্রান্তা ছন্দের ছিলো না বলেই মত জুয়েল মাজহারের। তিনি বলেন, খাটিঁ সংস্কৃত মন্দাক্রান্তায় অন্ত্যমিল থাকে না। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘যক্ষের নিবেদন’-এ অন্ত্যমিল রেখেছেন। খাঁটি সংস্কৃত মন্দাক্রান্তার বিভিন্ন পর্বে চালটি হবে এরকম :
ধিন-ধিন-ধিন-ধিন---- ৮
তা-তা-তা-তা-তা-ধিন-- ৭
ধিন-তা-ধিন-ধিন------৭
তা-ধিন-ধিন...--------৫
আর প্রতিটি স্তবক চার পংক্তিতে বিভক্ত।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কবিবন্ধু সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এই ছন্দের সব শর্ত মেনে বাঙলায় প্রথম মন্দাক্রান্তা কবিতাটি লিখেছেন উল্লেখ করে জুয়েল মাজহার বলেন, পশ্চিমবঙ্গের কবি মন্দাক্রান্তা সেন, সৌম্য দাশগুপ্ত ও অন্য কয়েকজন লিখেছেন এই ছন্দের বাংলা কবিতা।
‘ত্রিশরণ’ নামের মন্দাক্রান্তা ছন্দের কবিতাটি জুয়েল মাজহারকে উৎসর্গ করেন সুব্রত অগাস্টিন। প্রতি উত্তরে একটি মন্দাক্রান্তা দিয়েই বন্ধুর ঋণ শোধ করেন তিনি। একারণে ‘ঈর্ষার এঞ্জিন’ কবিতাটি উৎসর্গ করা হয়েছে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে।
বইটিতে স্থান পেয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। যার অন্যতম ‘পরিযায়ীদের দিন’। তোটক ছন্দের চালে কিন্তু বিশুদ্ধ তোটক নয়। বরং বলা যায় প্রতিপর্বে সাত মাত্রায় বাঁধা এ কবিতাটি।
‘ভিন্ন রণ-অভিজ্ঞতা হইতে আসি’ শিরোনামের কবিতাটি যে কোনো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। ধর্মীয় গ্রন্থের ক্লাসিক্যাল ভাষাভঙ্গীর অনুকরণে পাঁচ পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ কবিতাটি রচিত। যার শুরুটা এভাবে-:
[ও হে, মানুষের ভালোবাসার চোরসকল, যে তোমরা আমা হইতে উত্তম, সেই তোমাদিগের প্রতি অসমাপ্ত রূপে- নিবেদন করি- ভয়ে- এই পঙক্তিসকল। আমেন]
কবিতাটির অভিনব ভাষা ও শব্দের ব্যবহারের পাশাপাশি এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সামাজিক অসঙ্গতি কবি জুয়েল মাজহারকে নতুন একটি উচ্চতায় নিয়ে যাবে তা পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করবে বলে প্রত্যাশা রাখি।
আশির দশকের কবি-বন্ধুদের নিয়ে জুয়েল মাজহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘মম প্রিয় বন্ধুগণ’ কবি-পাঠকদের অন্য রকম নাড়া দেবে--একথাও হলফ করে বলা যায়। নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ও সেসময়ের বন্ধুদের অনেক গোমড় ফাঁস হয়েছে এই কবিতায়। যার জন্য প্রযোজ্য তিনি নিশ্চয় বুঝবেন তার কীর্তি কবিকে কতটাই খুশি কিংবা বেজার করেছে। করেছে অভিমানী এবং প্রীত।
তবে অভিমানের সবচেয়ে বড় প্রকাশ পেয়েছে বইয়ের নামকবিতা ‘দিওয়ানা জিকির’-এ।
আমারে পড়বো মনে, জানি তুমি, ডাকবা আমায়
খাড়া-সোজা-উপ্তা হয়া দিওয়ানা জিকিরে অবিরাম;
বাঁশের ঝিংলা দিয়া, জালিবেত-সুন্ধিবেত দিয়া
কানমলা দিয়া মোরে আর কতো করবা প্রহার।
আমি এর প্রতিশোধ নিব ঠিক। খাল-বিল নদীনালা বাইদ
পার হয়া চলে যাব একশো ক্রোশ দূরে একদিন।
কার প্রতি এই প্রতিশোধ? প্রশ্ন করতেই কবির উত্তর মায়ের প্রতি। জানালেন, কিশোর বয়সে ঘরছাড়া হয়েছিলেন কবি জুয়েল মাজহার। ভবঘুরে জীবন ছিলো তার। সেই সময়ের অভিমান ঝরে ঝরে পড়েছে এই কবিতায়।
কবিতাটি নজরুলের ‘অভিশাপ’এর ধাঁচের হয়েছে এমন মন্তব্যের জবাবে জুয়েল মাজাহার বলেন, এটি ঠিক অভিশাপ নয়, এটি মায়ের প্রতি সন্তানের অভিমান। নিজের মায়ের কাছে না থাকতে পারার অভিমান। গাঁয়ে না থাকতে পারার অভিমান। প্রিয় মগড়া নদীতে, খালে-বিলে নৌকায় ঘুরে বেড়াতে না পারার অভিমান।
কবিতাটিতে বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার রয়েছে যা অনেকের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে, এমন প্রসঙ্গে জুয়েল মাজহার বলেন, ওই শব্দগুলোই কবিতার প্রাণ। ওগুলো না থাকলে এটি কবিতাই হবে না।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানান কলকাতার ‘সমসাময়িক বাংলা’ পত্রিকার অক্টোবর ২০১২ সংখ্যায় (শারদীয় পূজা সংখ্যায়) কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে। সেসময় অন্তত ২৯টি শব্দের অর্থ জানিয়ে পাঠাতে হয়েছিলো সম্পাদক স্বাগতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আমি খুশি যে কলকাতার বন্ধু কবিরা এবং পাঠকরা কবিতাটির রস গ্রহণ করেছেন। অচেনা শব্দ কোনো বাধা হয়নি এক্ষেত্রে।
জুয়েল মাজহারের ‘দিওয়ানা জিকির’ প্রকাশ করেছে অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা ‘শুদ্ধস্বর’। প্রচ্ছদ এঁকেছেন পীযুষ দস্তিদার। ৩৯টি কবিতার এই বইটি পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়, শুদ্ধস্বরের স্টলে। দাম ধরা হয়েছে ১৭৫ টাকা। পাঠক কমিশন বাদ দিয়ে কিনতে পারবেন ১৩০ টাকায়।
বইটির শেষ প্রচ্ছদে জুয়েল মাজহারকে নিয়ে দ্বিতীয় দশকের প্রতিভাবান কবি ও নাট্য নির্মাতা হিজল জোবায়ের যথার্থই লিখেছেন:
‘জুয়েল মাজহার ‘ভিন্ন রণ-অভিজ্ঞতা হইতে আসা ক্ষাত্রতেজী এক যোদ্ধা ও বীর, শান দেওয়া অস্ত্রের মতো কণ্ঠস্বর তার, কোথাও দূরে, খর রৌদ্রে, ঠিকরে উঠছে তার বর্ম ও বল্লম।’
বাংলাদেশ সময় ২০৩২ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৩