১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ২৫, ২০১৩ ১১:১০ এএম BDST banglanew24
29 Apr 2012   02:15:10 PM   Sunday BdST
E-mail this

ভয়াল ২৯ এপ্রিল: ২১ বছরেও স্থায়ী ঠিকানা হয়নি উদ্বাস্তুদের


নুপা আলম, জেলা প্রতিনিধি
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ভয়াল ২৯ এপ্রিল: ২১ বছরেও স্থায়ী ঠিকানা হয়নি উদ্বাস্তুদের

কক্সবাজার: ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। ১৯৯১ সালের এদিনে ‘ম্যারি এন’ নামে প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশের উপকূলে।

কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ওই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী উপজেলার জনপদ ছিন্নভিন্ন ও লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল ম্যারি এনের ছোবলে।

ঘূর্ণিঝড় ও সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার হলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। মারা যায় ২০ লাখ গবাদি পশু। গৃহহারা হয় ৫০ লাখ মানুষ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ২১ বছর পেরিয়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনও ভুলতে পারেনি দুঃসহ সেই স্মৃতি। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ২১ বছর ধরে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন স্বজন হারানো উদ্বাস্তু মানুষগুলো।

একদিকে স্বজন হারানোর ব্যথা, অপরদিকে গৃহহীন জীবন যেন তাদের তাড়া করে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। ২১ বছরেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি স্থায়ী ঠিকানা।

এছাড়া উদ্বাস্তু যেখানে বসত করেন সেখানেই উচ্ছেদ আতংক ভর করে তাদের ওপর। এর মধ্যেই অন্ন-বস্ত্র সংগ্রহের নিরন্তর চেষ্টা করতে হয় তাদের। ২১ বছর পেরিয়েও এসব মানুষ কান্নায় বুক ভারী করেন আর একটি স্থায়ী বসতভিটার আশায় দিনাতিপাত করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের একটি ব্যাপক অংশ বসবাস করেন কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দরের পশ্চিমের এলাকায়। নাজিরারটেক, কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনারডেইল, সমিতিপাড়া নামের এ এলাকাকে ঘিরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস। তার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার পরিবার ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তু।

কক্সবাজার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল বাংলানিউজকে জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার পরিবারের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ ওই এলাকায় বসবাস করেন। এসব মানুষের প্রধান পেশা মাছ শিকার ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণ।

কাউন্সিলর আকতার কামাল বাংলানিউজকে জানান, উদ্বাস্তু মানুষগুলো যখন থেকে এ এলাকায় বসবাস শুরু করেন তখন থেকেই এ এলাকাটি অত্যন্ত অবহেলিত। এ এলাকায় এতোদিন বাস করার পরও এখানে তাদের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ওঠেনি। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকমানের করতে সরকার পুরো এলাকা অধিগ্রহণ করেছে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছেন উচ্ছেদ আতংকে থাকা লোকজন।

তিনি উদ্বাস্তু মানুষের স্থায়ী ঠিকানা তৈরির জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারিয়ে উদ্বাস্তু মানুষের মনে এখন কেবল স্থায়ী ঠিকানা তৈরির আকুতি। তারা আর ভবঘুরে থাকতে চান না।

মাবিয়া খাতুন (৭৫) এখন বাস করে পশ্চিম কুতুবদিয়া পাড়ায়। তার স্বামী মৃত বাচু মিয়া। কুতুবদিয়া উপজেলার মধ্যম কৈয়ার বিল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তারা। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মাবিয়া খাতুন হারিয়েছেন ১৪ জন স্বজন।

তিনি বাংলানিউজকে জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সময়টা ছিলো ১৫ বৈশাখ সোমবার। ওই দিন তুফানে তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, আট নাতি-নাতনি, শ্বশুর ও শাশুড়িকে হারিয়েছেন। এর মধ্যে সাতজনের লাশ পাওয়া গেলেও অন্যদের হদিস পাওয়া যায়নি।

মাবিয়া খাতুন জানান, তুফানে স্বজন হারানোর পাশাপাশি বসতভিটাও সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দরের পশ্চিমে আশ্রয় নেন। ওখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পরই পশ্চিম কুতুবদিয়া পাড়ায় আশ্রয় নেন। এখন বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য ওখান থেকেও উচ্ছেদ করার কথা শোনা যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ২১ বছরে বসত ঘর পরিবর্তন করে ভবঘুরে জীবন যাপন করছেন তিনি। বেঁচে থাকা মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে মাছই শিকার ও প্রক্রিয়াকরণই এখন জীবিকা ও বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।

কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ইউনিয়নের খুদিয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা শাকের আহমদ (৬২)। এখন বসবাস করেন নাজিরারটেক এলাকায়। একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে একজন দর্জি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি হারিয়েছে সাতজন নিকট স্বজনকে।

শাকের আহমদ বাংলানিউজকে জানান, বাবা, মা, স্ত্রী ও চার ছেলে-মেয়ে হারিয়ে তিনি একা। ২৯ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে মুহূর্তের মধ্যে সাগরের পানিতে প্লাবিত হয় তার এলাকা। এসময় এক মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। মসজিদ বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভেসে গিয়ে আশ্রয় জোটে প্যারাবনে। রাত শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তিনি আর ফিরে পাননি স্বজন। এরপর এসে নাজিরারটেক এলাকায় আশ্রয় নেন ১৯৯২ সালে।

তিনি বাংলানিউজকে জানান, তিনি ছাড়াও ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার পরিবার ওই গ্রামে বসবাস করেন।

বিমানবন্দরের জন্য এদের উচ্ছেদ করার কথা শোনা যাচ্ছে। এতে তিনি আতংকে রয়েছেন। তার দাবি সরকার তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।

২১ বছরে সরকার তাদের দিকে কোনো প্রকার নজর না দিয়ে ভবঘুরে করে রেখেছে বলে বাংলানিউজের কাছে আক্ষেপ করেন তিন সন্তান হারানো মা মোতাহেরা বেগম (৪৮)।

কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ইউনিয়নের খুদিয়ারটেক এলাকার দুদু মিয়ার স্ত্রী মোতাহেরা বেগম বাংলানিউজকে বলেন, ‘৯১ সালে তার ৯ ও ৭ বছরের দুই মেয়ে এবং দুই বছরের ছেলে মারা যায়। একটি লাশ পাওয়া গেলেও বাকি দু’টির সন্ধান মেলেনি। এরপর থেকে একবার এখানে, একবার ওখানে এভাবে জীবন যাপন করে আসছেন’
 
মোতাহেরা বেগমের স্বামী দুদু মিয়া বাংলানিউজকে জানান, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিটার মালিক হতে পারেননি। পারবেনও না। এভাবেই হয়তো পুরো জীবন শেষ হবে।

ছয় সন্তান হারানো মৃত নুরুল আবছারের স্ত্রী আমেনা খাতুন (৫০) বাংলানিউজকে জানান, এক মেয়ে এবং পাঁচ ছেলে হারানোর পর স্বামীকে নিয়ে আশ্রয় নেন বিমানবন্দরের পশ্চিমের চরে। ওখান থেকে বিতাড়িত হয়ে সমিতি পাড়া এবং পরে নাজিরারটেকের নিকটে আশ্রয় জোটে। এরমধ্যে স্বামীও মারা গেছে। এখন জীবিকার জন্য শুঁটকি মহালে কাজ করেন তিনি। যেদিন কাজ জোটে ওইদিন ভাত জোটে। যেদিন কাজ জোটে না, সেদিন ভাতও জোটে না।

এরূপ স্বজন হারানো আরও ৮ হাজার মানুষের আশ্রয় ঘিরে এখন কেবল উচ্ছেদ আতংক।

সমিতি পাড়ার স্কুল শিক্ষক ও সংবাদকর্মী মোস্তফা সরওয়ার বাংলানিউজকে জানান, স্বজন এবং বসতভিটা হারানো মানুষের দিকে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। উচ্ছেদ নয় এদের স্থায়ী ঠিকানা তৈরির জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক জয়নুল বারী বাংলানিউজকে বলেন, ‘জেলায় যারা উদ্বাস্তু মানুষ রয়েছে এদের পর্যায়ক্রমে আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে পুনর্বাসন করা হবে। আর বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এখান থেকে পর্যায়ক্রমে যেসব পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে তাদের অবশ্যই পুনর্বাসন করা হবে। আর যেখানে পুনর্বাসন করা হবে সেটাই হবে এসব মানুষের স্থায়ী ঠিকানা। এতে আতংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

বাংলাদেশ সময়: ১৩৩৩ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৯, ২০১২
প্রতিবেদন: নুপা আলম
সম্পাদনা: তানিয়া আফরিন, নিউজরুম এডিটর/সাইফুল ইসলাম, কান্ট্রি এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান