 |
| ছবি: জীবন আমীর |
ঢাকা: মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে আটক বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অপরাধের দায়ে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যা, গণহত্যা, ধষর্ণ, দেশান্তর করা, লুটপাট, অপহরণ করে চট্টগ্রামের গুডস হিলে নির্যাতন করা ইত্যাদি অন্যতম।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক অভিযোগ গঠন করে ২৯ এপ্রিল থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে প্রসিকিউশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এর মাধ্যমে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হলো। এর আগে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
অভিযোগ গঠনের পর প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৩২(২) এর এ, সি, জি এবং এইচের ধারাগুলো অনুসারে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে, সাকার পক্ষে তার আইনজীবী জামিন আবেদন করলে তা উত্থাপিত হয়নি (নট টু প্রেস) মর্মে খারিজ করে দেন আদালত। এছাড়া যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে রিভিউ পিটিশন (পুনর্বিবেচনা আবেদন) করেন। আগামী ১২ এপ্রিল রিভিউ পিটিশনের শুনানি করার নির্দেশ দেন আদালত। এদিন মোট চারটি আবেদন করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
কতগুলো হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রয়েছে বলে জানতে চাইলে তিনি জানান, হত্যার অভিযোগ রয়েছে ৩০০ এরও বেশি। আর চট্টগ্রামের রাউজান থানার জগৎমল্ল পাড়া, উনসত্তরপাড়া, মধ্য গহিরাসহ ৪/৫টি গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে।
জেয়াদ আল মালুম জানান, ১৩ এপ্রিল’৭১ ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই সব গণহত্যাগুলো সাকা চৌধুরীর সহায়তা ও নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী সংঘটিত করেছিল।
’৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজান থানার কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নতুন চন্দ্র সিংহের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে জিয়াদ আল মালুম আরো বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে নিয়ে ওইদিন ভোর সাড়ে ৬টায় কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে প্রবেশ করেন সাকা চৌধুরী। তখন নতুন চন্দ্র সিংহ তার মন্দিরে প্রার্থনারত ছিলেন। সেখান থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে মন্দিরের বাইরে এনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাকা চৌধুরী বলেন, ‘একে হত্যা করার জন্য বাবার (ফজলুল কাদের চৌধুরী) নির্দেশ আছে।’ এ কথা বলার পাকিস্তানি বাহিনী গুলি করে। এ গুলিতে মারা না গেলে সাকা চৌধুরী নিজে গুলি করে নতুন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করেন। নতুন চন্দ্র সিংহ হত্যায় তাই সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত বলেও জানান জেয়াদ আল মালুম।
অন্যদিকে, সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম বলেন, যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে সেটি অবৈধ এবং এই ট্রাইব্যুনালের এক্তিয়ারাধীন নয়।
এর আগে গত ২৭ মার্চ সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতি অনুপস্থিত থাকার কারণে তা দেননি আদালত। পরে ৪ এপ্রিল আদেশের দিন ধার্য করা হয়।
এরও আগে গত ১৩ মার্চ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অভিযোগ গঠন করা হবে কিনা সে বিষয়ে আদেশ দিতে ২৭ মার্চ ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
সেদিন সাকা চৌধুরীর করা জামিন আবেদন, দালাল আইনের বিচার, তার অভিযোগ ও তদন্তের সব নথিপত্র চেয়ে করা আবেদন, আন্তর্জাতিক আইনে বিচার, তার জেল পরিবর্তনের আবেদন এবং এ মামলা থেকে তার অব্যাহতি চেয়ে আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায়ই সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ১৯ ডিসেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধেও গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। পরে ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত দল।
একই বছরের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ১৮ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন।
এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ করে গুডস হিলে নির্যাতন, দেশান্তরে বাধ্য করা, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অপরাধ।
বাংলাদেশ সময় : ১৬০২ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০১২
জেএ
সম্পাদনা: নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর, রানা রায়হান ও অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর