 |
বাংলা সংগীতের ভুবনে শহীদ আলতাফ মাহমুদ অমর সুরস্রষ্টা। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা গানের জগতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশেষ করে আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি’ গানের সুরকার হিসেবে বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন তিনি। অমর এই সংগীত সাধকের অন্তর্ধান দিবস ৩০ আগস্ট। শহীদ আলতাফ মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলানিউজের এই বিশেষ রচনা।
বিবিসির জরিপে সেরা দশ বাংলা গানের মধ্যে শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রয়ারি’ গানটি স্থান পেয়েছে। শহীদ আলতাফ মাহমুদের গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনেক বেশি প্রেরণা যুগিয়েছে। সংগীতের এই অমর স্রষ্ঠা সুরের মায়াজালে মানুষকে জাগিয়ে রেখেছিলেন আমাদের গৌরবের সেই দিনগুলোতে। তিনি গানের মাধ্যমে নিরন্ন মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদে জেগে ওঠার কথা বলেছেন।
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট আমরা হারিয়েছি সুরের এই জাদুকরকে। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আরো ১২ জনের সঙ্গে এই মানুষটিকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হানের মতো তিনিও আর কোনোদিন ফিরে আসেননি। এরপর থেকে তিনি মিশে আছেন এই মাটি আর মানুষের ভালোবাসায়। সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি জানতে বাংলানিউজ কথা বলেছে শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা আরা মাহমুদের (বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত) সঙ্গে। তিনি বাংলানিউজ পাঠকদের জানিয়েছেন সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা।
‘আমরা তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টা দিকে থাকতাম। ২৫ মার্চ রাজারবাগ আক্রমণের পর অনেকেই বলেছেন, এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আলতাফ রাজি ছিল না। সেই বাসা থেকেই আলতাফ গানের সুর করতো এবং গোপনে সেই গান চলে যেত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাজারবাগের সেই বাসা থেকেই পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায় তাকে। সকালবেলা অনেকগুলো বুটের শব্দ শুনে আমি আলতাফকে বলি, আমাদের বাড়ি মনে হয় আর্মি ঘেরাও করে ফেলেছে। তখন আলতাফ বলেছিল, কোনো চিন্তা করো না। এটাই ছিল আলতাফের সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা। এরপরই আর্মি বুট এবং বন্দুকের বাঁট দিয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকে, দরজা খুলে যায়। একজন অফিসার জিজ্ঞাসা করে, আলতাফ মাহমুদ কৌন? আলতাফ তখন বলে, আমি আলতাফ। তারপর দু’জন আর্মি দুই দিক থেকে ওকে ধরে নিয়ে বাইরে চলে যায়। তারপর আমি আর কিছু দেখিনি।’
সারা আরা মাহমুদ সেদিনের স্মৃতিচারণ করে আরো বলেন, ‘আমার ছোট বোন শিমুল (শিমুল ইউসুফ) দেখেছিল আলতাফকে মারতে মারতে বাড়ির পিছন দিকে একটা আম গাছ ছিল সেদিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে লুকানো দুটো আর্মস ছিল, সেগুলো বের করে নিয়ে যায়। এরপর আলতাফকে ট্রাকে করে আর্মিরা নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন আলতাফের ভাই আবুল বারাকাতকেও (এখন চারুকলার শিক্ষক) ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি আরো ১২ জনকে নাকি আর্মিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তিন দিন পরে বাকিদের ছেড়ে দিলেও আলতাফকে ওরা ছাড়েনি। পরে ওদের দেখেছি অনেক টর্চার করেছিল। আলতাফকে অনেক বেশি টর্চার করেছিল সেটা সেদিন আমাকে বলেনি। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের বিভিন্ন ইন্টারভিউতে শুনেছি।’
শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আগামী ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রতি বছরের মতো এবারো ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন’ তার অন্তর্ধান দিবস পালন করবে। এদিন তারই নামে প্রবর্তিত পদক প্রদান করা হবে। এবারের পদক প্রদানের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাককে। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন ভাষা সংগ্রামী শেখ তোফাজ্জল হোসেন ও শিল্পসমালোচক মফিদুল হক। এ দিন আলতাফ মাহমুদ ওয়েব সাইট উদ্বোধন করা হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯০০ ঘণ্টা, আগস্ট ২৯, ২০১২
সম্পাদনা: বিপুল হাসান, বিভাগীয় সম্পাদক; আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর