 |
ঢাকা: সংবিধান নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানিতে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের সভাপতি মুফতি আমিনীর বক্তব্য শুনেছেন হাইকোর্ট এবং বৃহস্পতিবার এ শুনানির রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
বুধবার বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
হাইকোর্টে উপস্থিত হয়ে আমিনী বলেন, ‘আমি একজন মুফতি। মুফতির দায়িত্ব কোরআনের পক্ষে কথা বলা। এজন্য যদি আমার জীবনও চলে যায় আমি তাতেও পরোয়া করি না। আমার পূর্বপুরুষও করেন নাই।’
শুনানির শুরুতেই রিটকারী শাহরিয়ার কবীর তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালের এই দিনে (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশের ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা হয়েছিল। সেই বোমা হামলার পড়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
সেসব প্রতিবেদনে ইসলামী ঐক্যজোট এবং জামায়েতে ইসলামীর সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বাংলাদেশের পত্রিকার কথা বাদ দিতে চাই। কারণ তাতে অনেকে বলবেন আমি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এ কথা বলেছি।
কিন্তু ২২ আগস্ট পাকিস্তানের দৈনিক পত্রিকা ডেইলি টাইমসে ‘বাংলাদেশে ইসলামের জোয়ার পাকিস্তানের চেয়ে বেশি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। সেখানে মুফতি আমিনীর কথা উল্লেখ করা হয়।
এ সময় শাহরিয়ার কবির ডেইলি টাইমসের ওই প্রতিবেদনের কিছু অংশ পড়ে শোনান।
তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে সবকিছুর জন্য বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগ এবং ভারতকে দায়ী করেছে। কিন্তু প্রতিটি বোমাস্থলে কয়েক লাখ ইশতেহার ছিল। ইশতেহারের বক্তব্য ছিল আল্লাহর বিধানের বাইরে কোনো বিধান নেই। আল্লাহর বিধান এখন কার্যকর নাই। আমরা আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, এই ইসলামী ঐক্যজোট বিচারকদের হত্যা করেছে। আইনজীবী, নিরীহ মানুষ, বিচার প্রার্থীদের আদালত প্রাঙ্গণে হত্যা করেছে। আজ মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যে যা খুশি ইচ্ছা বলতে পারে না। আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে আমরা কি বুঝি এবং রাজনৈতিক বক্তব্য কি? মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমরা সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলতে পারি না।
এরপর শাহরিরয়ার কবীর বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে উইকিপিডিয়া থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনান। আদালতে তিনি বলেন, সারা পৃথিবী যেখানে এ সংবিধানকে মর্যাদার চোখে দেখে, সেখানে আমাদের দেশের রাজনীতিকরা সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায়। আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সমালোচনায় আমরা কতদূর যাব।
তিনি আদালতে বলেন, আমি আপনার কাছে আবেদন জানাব একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার (আমিনী) কী ভূমিকা ছিল? জঙ্গি হামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কী ছিল ? জামায়াত এবং আল-কায়েদার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুঁজে দেখার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেবেন। এই লোক বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়। এই ব্যক্তি রাজপথে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিল ‘আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’
এরপর আমিনী তার বক্তব্যে বলেন, শাহরিয়ার কবীর যা বলেছেন সব মিথ্যা। সে স্বঘোষিত নাস্তিক। তার কথায় দেশের কেউ বিশ্বাস করবে না।
এ পর্যায়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, আপনাকে সুযোগ দিয়েছি আপনার বক্তব্যের ব্যাখা দেওয়ার জন্য, ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য নয়।
আমিনী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো মুসলমান মানতে পারে না। আমি দেশদ্রোহী কিংবা রাষ্ট্রদোহী নই। আমি ইসলামী গণতন্ত্রের রাজনীতি করি। কোরানের বিরুদ্ধে কিছু এলে আমরা প্রতিবাদ করি।
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আপনি আপনার বক্তব্যে পঞ্চদশ সংশোধনী উল্লেখ করেননি। তখন আমিনী বলেন, আমি এই সংবিধান বলতে পঞ্চদশ সংশোধনীকেই বুঝিয়েছি।
এরপর মুফতি আমিনীর আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, রুল নিষ্পত্তির আগেই সরকার মামলা করেছে। অপরদিকে সরকার পক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেন, সংবিধানের ৭এর (ক) এবং (খ) অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান বা তার কোনো অনুচেছদ নিয়ে কেউ কোনো কথা বললে সেটি রাষ্ট্রদ্রোহীতার সামিল বলে বিবেচিত হবে। উনি ব্যাখ্যা যতই দেন না কেন কোনোটাই আইনে আসে না।
মুরাদ রেজা বলেন, `ওনাকে এখনে এসে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। বিন্তু রুলের জবাব উনি সংবাদ সম্মেলন করে দিয়েছেন।`
মুরাদ রেজার বক্তব্যের পর শাহরিয়ার কবীর আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, মুফতি আমিনী বলেছেন, ‘আমি স্বঘোষিত নাস্তিক। তিনি এটা কিভাবে পেলেন।’
আদালত আগামীকাল রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।
শাহরিয়ার কবীর আরও বলেন, ওলামা মাশায়েক ঐক্যজোট সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, তিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছেন। একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে হলে ১০০ কোটি টাকার দরকার হয়।
তিনি এত টাকা কোথায় পেলেন, তার প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না। জাতীয় পতাকা ওড়ে না। তার সাথে আল-কায়েদার সম্পর্কের প্রমাণ করার জন্য সরকারকে আদালতের নির্দেশ চাচ্ছি।
বাংলাদেশ সময়: ১৯০১ ঘণ্টা, আগস্ট ১৭, ২০১১