বইমেলা থেকে : অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শুদ্ধস্বর থেকে প্র্রকাশিত হলো রাশিদা সুলতানার উপন্যাস ‘সাদা বিড়ালেরা’। এর আগে চারটি গল্পগ্রন্থ ‘আপনামাঁসেঁ হরিণা বৈরি’ (২০০৪), ‘আঁধি’ (২০০৭), ‘পরালালনীল’ (২০০৯), ‘পাখসাট’ (২০১২) এবং একটি কবিতাগ্রন্থ ‘জীবন যাপন দখিন হাওয়া’ (২০০৮) প্র্রকাশিত হলেও উপন্যাসে এবারই বৌনি হলো তার।
জাতিসংঘে কর্মরত সুদান প্রবাসী লেখক রাশিদা সুলতানা বরাবরের মতো এবারও প্রাণের বইমেলাকে উপলক্ষ্য করে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রথম উপন্যাস, বইমেলা ও সাম্প্রতিক লেখালেখি নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।
বাংলাদেশ তথা বইমেলায় এসে কেমন লাগছে জানতে চাইলে রাশিদা সুলতানা বাংলানিউজকে বলেন, “নিঃসন্দেহে ভালো লাগছে। আমি প্রতি দুই মাস পরপরই ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে আসি। আর যে কোনোভাবেই হোক বইমেলায় তো আসতেই হয় প্রতি বছর।”
নিয়মিত বাংলাদেশে এবং যেকোনওভাবে বইমেলায় আসার জন্য ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে তার বর্তমান কর্মস্থল সুদান বেশ উপযোগী উল্লেখ করে তিনি জানান, এ কারণে অন্য কোনো দেশে পোস্টিং নেওয়ার ব্যাপারে তিনি চেষ্টা তদবির করেন না!
প্রকাশিত উপন্যাস ‘সাদা বিড়ালেরা’র কাহিনী আবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মূলত আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা। নিঃসঙ্গতার সৌন্দর্য ও ভয়াবহতা, এর উদযাপন আর অনিবার্যতার গল্প। মূল চরিত্র ফাহিমা দেশ ছেড়ে জাপানে পড়াশুনা করতে যায়। সেখানে সৃষ্ট তীব্র নিঃসঙ্গতাবোধই তার ভালো লাগতে শুরু করে।
নৈঃসঙ্গ ও নৈঃশব্দ্যের নৈকট্যে প্রথমবারের মতো নিজের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। একটা ব্যালকনিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন একা বসে থাকতে আলোড়িত বোধ করে সে। মেঘের ভিতর থেকে সাদা বিড়ালেরাও নেমে আসে ব্যালকনিতে। ফাহিমা আর ব্যালকনি, এবং মেঘের ভিতর থেকে নেমে আসা সাদা বিড়ালেরা— এর মধ্যকার পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও অনিবার্য একাত্মতার জাদুবাস্তবতায় আবর্তিত হয়েছে উপন্যাস।”
উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার উপস্থিতি ও এর কাব্যিক উৎসারণের জায়গাটিকে চিহ্নিত করে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাশিদা বলেন, “হ্যাঁ, এখানে ম্যাজিক রিয়ালিজম প্রবলভাবে উপস্থিত। আপাত আনরিয়েল জিনিসগুলোরেই ন্যাচেরালি টিউনিং করা হয়েছে। অনিবার্য বাস্তবতায় অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করার কাব্যময়তাও রাখতে হয়েছে।
কারণ আমার যেটা মনে হয় মূলত কবি না হলে, কাব্যবোধ না থাকলে শিল্পের কোনো প্রকাশ মাধ্যমই পরিপূর্ণতা পায় না। কবিতা এখানে একটা ধারণার নাম, একটা পর্যায়ের নাম— একটা কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যমের নাম নয়।
এখানে ছবিগুলো আঁকতে হয় চিত্রকর হয়ে, দৃশ্যগুলোকে ভাষাবন্দি করতে হয় কবিতায় আর সর্বোপরি গদ্যের বিশ্বাসযোগ্য গাঁথুনিতে জমাট বাঁধাতে হয় গল্প, পারম্পর্য, সামঞ্জস্য। একটা টোটাল ব্যাপার। পরস্পর বিচ্ছিন্ন, অথচ গুপ্ত একাত্মতা রয়েছে।”
বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের পুকুর ঘাটে বসে চালানো আলাপচারিতায় উঠে আসে আরও নানা প্রসঙ্গ। বর্তমান লেখালেখি আর সমাজের প্রতি লেখকের দায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি সাহিত্যের জন্যই সাহিত্য করি। সেটা শেষ পর্যন্ত শিল্প হয়ে উঠলো কি না, সেটাই আমার দেখবার বিষয়। সমাজ পরিবর্তনের ব্রত নিয়ে সাহিত্য করি বললে মিথ্যে বলা হবে। এমনকি আমি সাহিত্যে কোনো বাদ-প্রচারকের ভূমিকাও নিতে চাই না, বা পারি না। সেটা নারীবাদই হোক আর সমাজতন্ত্রবাদই হোক, আমি মনে করে বাদনিরপেক্ষ হয়ে লিখলেও সেখানে আদতে সবকিছুই উপস্থিত থাকে। কেননা যিনি লেখেন, লিখতে আসেন তার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই সংবেদনশীলতা থাকে। আর এই সংবেদনশীলতাই নিজের মতো করে সকল কিছুর সাথে কম্যুনিকেট করে ফেলতে পারে।”
রাশিদা সুলতানার প্রথম উপন্যাস পাঠপরবর্তী সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আরেক লেখক লুনা রুশদী ই-মেইলযোগে বাংলানিউজকে বলেন, “রাশিদা সুলতানার লেখা সাদা বিড়ালেরা উপন্যাসের শুরুর বাক্যেই থমকে যেতে হয়।‘একটা ব্যালকনি আমাকে নিঃসঙ্গ করেছে’। কিভাবে? উপন্যাসের বিস্তারে রয়েছে এই নিঃসঙ্গতার বয়ান। বিয়ের তিন বছরের মাথায় উচ্চশিক্ষার জন্য জাপান যায় ফাহিমা। স্বামী রোমেলের সাথে সম্পর্ক খুব আন্তরিক হতে পারেনি কখনও। স্বামী সম্পর্কে তার নৈর্ব্যক্তিক স্মৃতিচারণে ফাহিমা পাঠককে জানায় ‘রোমেলকে সারাক্ষণই আমার একজন বিদেশী অতিথি মনে হতো’। সে পাঠককে জানাতে থাকে বাবা, মা, স্বামী, বন্ধু ইত্যাদি সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতার কথা। ট্র্যাপিজ শিল্পীর মতো আলগোছে, ভয়ে ভয়ে এই সম্পর্কগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতে রাখতে ক্লান্ত ফাহিমা জাপানে নিজের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতেই শান্ত থাকে শুধু। এখানেই সে শুধু নিজের ভালো লাগাটুকু ছাড়া অন্য সবকিছুকে উপেক্ষা করার সাহস করতে পারে। তার নানাবিধ বিচরণে সারাক্ষণ বয়ে চলে ব্যালকনিতে ফিরে যাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা। আপাত নির্লিপ্ত স্বরে বলা এই গল্পে একজন আশ্বাস ও আশ্রয়হীন একলা মানুষের গভীর বিষণ্নতা জড়িয়ে আছে।”
রাশিদা সুলতানার ষষ্ঠ গ্রন্থ ও প্রথম উপন্যাস ‘সাদা বিড়ালেরা’র ফ্ল্যাপ প্রিভিউ লিখেছেন কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী রনি আহম্মেদ।
বাংলাদেশ সময়: ২০৪৮ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৩
সম্পাদনা: আসিফ আজিজ, নিউজরুম এডিটর