 |
চট্টগ্রাম: অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে মানসিক হতাশা এবং বদলির আদেশ মানতে না পেরে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম (যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার) আব্দুর রহমান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে ওই বিচারক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবরে এ পদত্যাগপত্র চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের প্রশাসনিক শাখায় জমা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া পদত্যাগপত্রের কপি প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী এবং আইন প্রতিমন্ত্রীর কাছেও বিচারক আব্দুর রহমান পাঠিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এবং প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলানিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে বিচারকের পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমকে বদলির ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি বুধবার বিকেল ৩টায় জরুরি সাধারণ সভা আহ্বান করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অশোক কুমার দাশ বাংলানিউজকে বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ বিচারকের বদলির সঙ্গে সঙ্গে যার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাকেও বদলি করা হল। এটা আমরা মানতে পারছি না। আমরা পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিকেলে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব।’
সম্প্রতি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আব্দুর রহমানকে বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে চট্টগ্রাম আদালতের মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) এবিএম নিজামুল হকের বদলির দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল জেলা আইনজীবী সমিতি। এ আন্দোলনের মধ্যেই অপ্রত্যাশিতভাবে তার নিজেরও বদলির আদেশ আসায় ক্ষুব্ধ হন অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আব্দুর রহমান। বিষয়টিকে ওই বিচারক অন্যায়, অযৌক্তিক এবং নিজের জন্য অপমানজনক হিসেবে বিবেচনা করে শেষপর্যন্ত পদত্যাগেরই সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বিকেলে সিএমএম’র কাছে এ পদত্যাগপত্র জমা দেয়া হলেও বুধবার সকাল পর্যন্ত সেটি গ্রহণ করা হয়নি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এস এম মুজিবুর রহমান সহ জ্যেষ্ঠ বিচারকরা অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছেন।
তবে নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগপত্রটি সিএমএম আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ, সেখান থেকে হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার হয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে যাবার কথা রয়েছে।
বুধবার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিমের জমা দেয়া পদত্যাগপত্রের একটি কপি বাংলানিউজের হাতে পৌঁছেছে।
আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবরে লেখা চিঠিতে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আব্দুর রহমান বলেন, আমি ২০০৬ সালের ১৫ মার্চ চাকুরিতে যোগদান করি। আমার নিবাস মানিকগঞ্জ, প্রথম কর্মস্থল সিরাজগঞ্জ, দ্বিতীয় কর্মস্থল দুর্গাপুর চৌকি, নেত্রকোনা এবং তৃতীয় কর্মস্থল ভোলায় আমি দক্ষতা ও সততা নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছি। আমার সাবেক জেলা জজ মহোদয়গণ বলেছেন যে, আমি বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে সর্বদা সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি এবং আমার রায় আদেশ আপিল অথবা রিভিশন শুনানিতে বহাল থাকে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সময় ট্রেনিং সেন্টারে প্রদত্ত রায়সমূহ একাধিকবার সর্বোৎকৃষ্ট মর্মে চিহ্নিত হয়েছে, যাহা আমার সহকর্মীরা জ্ঞাত আছেন। মহোদয়, একজন বিচারক মিথ্যা কথা বলতে পারে তা আমার ধারণায় ছিল না। আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রগতিশীল মানুষের বিরুদ্ধে যদি একজন বিচারপ্রার্থী বা আইনজীবীও বলে যে, ন্যায়বিচার হচ্ছে না, তাহলে ওই ব্যক্তির বিচারক হিসেবে আসনে থাকা যুক্তিসংগত নয়।
তিনি বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম, বিজ্ঞ সিএমএম (সদ্য বদলি হওয়া এবিএম নিজামুল হক) আমার বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধান বিচারপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও আপনার (সচিব) বরাবর আমার কার্যক্রম ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবংবর্তমান পদ থেকে আমার প্রত্যাহার চেয়েছেন, যার বিরুদ্ধে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি সাধারণ সভার ২টি রেজুলেশন হয়েছে এবং তাঁর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার যোগদানের পূর্ব থেকে আন্দোলন ছিল, তাঁর কর্তৃক আনীত অভিযোগের কোন তদন্ত ছাড়াই আমাকে মাত্র চার মাসের মধ্যেই বদলির আদেশে আমি মানসিকভাবে হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হব মর্মে আশঙ্কা করছি।
তিনি বলেন, ইতিপূর্বে ভোলা জেলায় আমার এক বছর দু’মাস চাকরিকাল অবধি আমার বাবার বয়স ও অসুস্থতাজনিত কারণে সদাশয় সরকার টাঙ্গাইল জেলা বদলির প্রস্তাব করলে উহা মাহামান্য হাইকোর্ট স্বল্প চাকরিকাল বিবেচনায় নামঞ্জুর করেন মর্মে শুনছি।
তিনি বলেন, গত ১৪ জুন তারিখে দ্রুত বিচার আইনের কোতয়ালী থানার মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট থেকে জামিনপ্রাপ্ত আসলাম চৌধুরী নামীয় এক আসামীর জামিন বাতিল করে জেলহাজতে প্রেরণের জন্য বিজ্ঞ সিএমএম আমাকে নির্দেশ প্রদান করলে আমি উহা আইনত: না করলে ক্ষিপ্ত হয়ে মাননীয় রেজিস্ট্রার, হাইকোর্ট বিভাগ এবং পাবনার বিজ্ঞ জেলা জজ মহোদায়ের নাম নিয়ে বলেন যে, আমাকে তাদের সহায়তায় দ্রুত বদলি করে দেবেন। আমাকে তিনি তৎক্ষণাৎ অমানবিক আচরণ সহ চেম্বার থেকে বের করে দেন এবং পরবর্তী ২-৩ দিনের মধ্যে আমার আমলী মতা সহ ভারপ্রাপ্ত তিনটি আদালতের দায়িত্ব থেকে এজলাস চলাকালীন অব্যাহতি প্রদান করেন।
সচিবকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, মহোদয়, আপনার বরাবর প্রেরিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুমতি চেয়ে প্রেরিত পত্র তিনি (সিএমএম) আটকে রেখেছেন। এছাড়া আমার শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ও ঈদের ছুটি ভোগ থেকে বঞ্চিত করেন। সর্বোপরি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম যে, বিজ্ঞ সিএমএম আমার নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনয়ন করে বদলি করতে সমর্থ হলেন।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় আমাদের উপরে এক অভিভাষণে বলেছেন যে, বিচারকদের পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই আমি সর্বদা স্ত্রী, কন্যা নিয়ে কর্মস্থলে বাস করি এবং আমার চার বছর বয়স্ক কন্যাকে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছি এবং সে মাত্র সাতদিন সেখানে ক্লাস করেছে।
তিনি বলেন, আমি জানি, মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বিচার বিভাগে সততা, স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই বিশ্বাস থেকে অপ্রতুল বেতন কাঠামোয় অতি কষ্টে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছি শুধু ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষার নিমিত্তে। কিন্তু এখন বিনা তদন্তেই আমি ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলাম।
তিনি বলেন, বিচারের ন্যায়দণ্ড ধরে রাখতে পারলাম না বলে আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতি ও বাংলাদেশের সকল ন্যায়বিচারক মহোদয়দের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। আমি ভূতপূর্ব আইন পেশায় (মহামান্য হাইকোর্টে) ফিরতে আগ্রহী। এমতাবস্থায়, আমি চাকরি হতে অব্যাহতি চাই বিধায় আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণের আদেশ পাওয়া আবশ্যক।
বাংলাদেশ সময়: ১২ ১৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১২
আরডিজি, সম্পাদনা : তপন চক্রবর্তী, ব্যুরো এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com