 |
| ছবিঃ উজ্জল ধর/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: টানা বর্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলো অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নিচু এলাকা ছাড়াও বেশ কিছু নতুন এলাকাও জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরপানিতে তলিয়ে গেছে নগরী। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার সকালে বাকলিয়ার তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় সব এলাকা, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, দেওয়ানবাজার, বাদুরতলা, চকবাজার, কাপাসগোলা, শুলকবহর, বিবিরহাট, পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহর ও পতেঙ্গাসহ নতুন নতুন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নিচতলার বেশিরভাগ বাসা-বাড়ি, গ্যারেজ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে লেপ-তোষক, সোফার গদি, গাড়ির মূলবান যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। নগরীর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর ও বাকলিয়া এলাকায় পানিতে আটকা পড়েছে প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশাসহ বেশ কিছু ইঞ্জিনচালিত গাড়ি।
চান্দগাঁও-মুরাদপুর-বাকলিয়া এলাকার বেশির ভাগ মানুষকে সকালে কোমরপানি ভেঙে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারসদাই করতে হয়েছে। তেমনই একজন শুলকবহর এলাকার গৃহিণী রাবেয়া আকতার। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘সামান্য বৃষ্টিতেই এখন পানি ওঠে আমাদের এলাকায়। সহ্যেরও তো একটা সীমা আছে। আমরা কর্পোরেশনকে ট্যাক্স দিই, সরকারকে ট্যাক্স দিই। তারা আমাদের দুর্ভোগ দেখে না। কোনো কাজ করে না।’’
মুরাদপুরের মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শরীফ বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘প্রধান সড়কে সকালে পানির যে তীব্র স্রোত দেখেছি, তাতে সন্তানদের স্কুলে যেতে নিষেধ করে দিয়েছি। বলেছি, ঘর থেকে কেউ যেন বের না হয়।’’
জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টির কারণে শিক্ষার্থী, কর্মজীবীসহ খেটে খাওয়া মানুষ কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেননি। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়া মানুষ অবৈধ দখলে চলে যাওয়া নগরীর খাল, নালা, ফুটপাত, সেতুসহ পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর না করায় সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলেন, ‘‘ভোটের আগে সুন্দর সুন্দর কথা বলে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা আমাদের জন্য কিছুই করেনি।’’
নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাষ কর্মকর্তা ফরিদ আহমদ বাংলানিউজকে জানান, সোমবার ভোর ৬টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৩ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া দফতর। এরপর সকাল ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৩৫ মিলিমিটার। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৯১ মিলিমিটার।
তিনি জানান, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এ অঞ্চলে অতি ও ভারী বর্ষণের সতর্ক সংকেত (বুলেটিন) রয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
মুরাদপুরের ব্যবসায়ী আবদুল করিম বাংলানিউজকে বলেন, নালা, খাল দখল করে অপরিকল্পিত বাড়ি ঘর ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করায় পানি নামতে পারছে না। প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
৫৩ জামাল খান সড়কের আমেনা খাতুন বলেন, ‘‘একটু ভারী বৃষ্টি হলেই আমাদের গলিতে কোমর পরিমাণ পানি উঠে যায়। পুরো সকালটা কেটেছে ঘরের পানি সেচতে সেচতে। পানি দ্রুত নামার ব্যবস্থা করে দিলে এখানে অল্প বৃষ্টিতে পানি জমতে পারতো না।’’
দুই নম্বর গেট এলাকায় জলাবদ্ধতার জন্য আটকে পড়া পোশাক কারখানার শ্রমিক আবদুল মাবুদ বলেন, ‘‘প্রতি বছর এসব এলাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ওঠে যায়। শুনেছি, লাখ লাখ টাকা খরচ করে খাল-নালা সংস্কারের কাজে। কি কাজ করে বুঝি না।’’
ফায়ার সার্ভিসের আগ্রাবাদ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের টেলিফোন অপারেটর আবদুল মান্নান জানান, সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় ১-বি সড়কের ১০০ নম্বর বাড়ির গ্যারেজের ওপর পাহাড় ধসে পড়লে এক ব্যক্তি আহত হন, একটি প্রাইভেট কার মাটির নিচে চাপা পড়ে। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। ফায়ার সার্ভিসের একটি দল গাড়িটি উদ্ধার করার জন্য ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) জলাবদ্ধতা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও কাউন্সিলর প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী কিষান বাংলানিউজকে বলেন, যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে নালা ও খালগুলোর ধারণক্ষমতা তার চেয়ে অনেক কম। তাই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় জোয়ারের পানি উঠে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের লোকজন জরুরিভিত্তিতে পানি নামতে বাধা সৃষ্টি হলে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করছেন।
খাল-নালা অবৈধ দখলে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহেশখাল ও মির্জাখালে কোনো অবৈধ দখল নেই বললেই চলে। চাক্তাই খালের ৮০ শতাংশ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশও উচ্ছেদ করা হবে। মূল কথা হলো, ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী যেসব খাল, নর্দমা সৃষ্টির কথা ছিল তা তো হয়নি, উল্টো নগরীর অনেক জলাধারে অপরিকল্পিত ভবন গড়ে উঠেছে।
প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী বলেন, ‘‘এ নগরীর ড্রেনেজ সিস্টেম ৩০-৪০ বছরের পুরোনো। কিন্তু এরপর অনেকগুলো ভবন ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। মুজিব সড়কের নিচের নালাটি ছাড়া আর কোনো নালা বা খাল তৈরির কথা আমার জানা নেই। তাই দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিতে হবে। সুপরিকল্পিতভাবে বাড়ি-ঘর তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নগরবাসীকে নালায় পলিথিন ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।’’
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে ৭ কোটি টাকা খরচ করে ১৭টি স্কেভেটরের মাধ্যমে খাল থেকে ২২ হাজার ট্রাক মাটি তুলেছে সিটি কর্পোরেশন।
বাংলাদেশ সময়: ১২৪৩ ঘণ্টা, জুন ২৬, ২০১২
এআরএম/সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর