 |
মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে আমাদের কাজ কী বা আমরা পৃথিবীতে কেন এলাম এ নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসা। এই একটি প্রশ্নের সমাধান পেতে মানুষ নানা সময়ে নানা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
কিছু মানুষ বিশ্বাস করেছে স্রষ্টা খেলার ছলে উদ্দেশ্যহীনভাবে আমাদের এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আবার কারও কারও বিশ্বাস মানুষের জন্ম একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার ফলশ্র“তি ছাড়া আর কিছু নয়। তাই মানুষের কর্মকাণ্ড তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়।
কারও বা বিশ্বাস মানুষের জন্ম আগের জন্মের পাপমোচনের উদ্দেশে। আবার বস্তুবাদী দর্শনে মানুষের কাজ শুধুমাত্র ভোগ করা।
মানুষের পৃথিবীতে আসার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন আমাদের কাছে একটি সুস্পষ্ট কারণ তুলে ধরে।
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “যখন তোমার মালিক ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানাতে চাই;’ তখন তারা বলল, ‘তুমি কি সেখানে এমন কাউকে (প্রতিনিধি) বানাতে চাও যে সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? আমরাই তো প্রশংসার সাথে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি।’ তিনি বললেন, ‘আমি যা জানি তা তোমরা জানো না।’ এরপর আল্লাহ আদমকে সমস্ত বস্তুর নাম শিখিয়ে দিলেন, পরে সেগুলো তিনি ফেরেশতাদের কাছে পেশ করে বললেন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমরা এ নামগুলো আমাকে বলো তো। ”(সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০-৩১)
বোঝা যাচ্ছে, মানুষের পৃথিবীতে আসার একমাত্র কারণ আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। সুতরাং বিশ্বচরাচরে আমাদের সব কাজের মূল সুর হবে একটাই এবং সেটা হলো আল্লাহর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।
আল্লাহর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টায় আল্লাহর প্রতিনিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অন্যকে সৎপথের দিকে আহ্বান করা এবং অসৎপথ থেকে বিরত রাখা। সমাজে অন্যায় রয়েছে, অপরাধ রয়েছে, পাপ রয়েছে। অন্যায় প্রতিরোধে সোচ্চার কণ্ঠ ও ন্যায়ের পথে মুয়াজ্জিনের ভূমিকা নেওয়া আল্লাহর প্রতিনিধিরই কর্তব্য।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকা উচিত, যারা ন্যায়ের আদেশ দেবে আর অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং এরাই হলো সফলকাম।” (৩:১০৪)
অর্থাৎ, আল্লাহর একজন প্রতিনিধির জীবনে সাফল্য-ব্যর্থতার একটি মাপকাঠিও এটি।
পবিত্র কুরআনে এই কুরআন অনুসারীদেরই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব কী তা তুলে ধরতে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরাই হলে সর্বোত্তম দল। তোমাদের আগমন সমগ্র মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখবে। আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।” (৩:১১০)
কুরআনের অনুসারী মুসলিম হিসেবে আমরা এ দায়িত্ব কোনোভাবেই ভুলে থাকতে পারি না।
পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিবাদ-অত্যাচারের কারণ হিসেবে আমরা শুধুমাত্র বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেই দায়ী করতে পারি না। এর জন্য দায়ী আমরা সাধারণ মানুষেরাও, যারা অন্যায়-অপরাধকে মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছি, অন্যায়-অপরাধ দেখে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিচ্ছি।
ইসলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিকতাকে উৎসাহিত করে। সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক দেখেও চুপ থেকে শুধুমাত্র ধর্মীয় কিছু আচার-রীতি পালন করার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার চিন্তা করা বোকামি।
রাসূল (সা. ) চমৎকারভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তিনি একটি দোতলা জাহাজের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ‘জাহাজে চড়ার জন্য একদল মানুষ দোতলায় সুযোগ পেল। আর একদল নিচ তলায় আরোহণ করলো। নিচ তলার দল পানির জন্য বারবার দোতলায় যেতে লাগলো। তাই দোতলার যাত্রীরা বিরক্তিবোধ করলো। ফলে নিচ তলার যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে কুড়াল নিলো এবং জাহাজের তলা ছিদ্র করে পানি নিতে উদ্যত হলো। এখন দোতলার যাত্রীদের কাজ কী হবে? তারা কি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? না কি কুড়ালধারীদের হাত চেপে ধরে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করবে?’
সমাজের আলোকিত তথা বিবেকবান শ্রেণি যদি অন্ধকারে ধুকে ধুকে মৃতপ্রায় গোষ্ঠীর কাছে কিছু আলো না বিলায়, তাহলে সমস্ত সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে, যার ফলাফল সামগ্রিক ভরাডুবি ছাড়া আর কিছু নয়।
বর্তমান সমাজের দূরাবস্থা দেখে কোনোভাবেই সাধারণ মুসলমানেরা নিজেদের নির্দোষ বলতে পারি না। কেননা, আমরা যদি ন্যায়ের দিকে ডাকা এবং অন্যায়কে প্রতিহত করার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতাম, তাহলে আমাদের দুঃখসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে হতো না।
আল্লাহ বলেছেন, “মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদের কিছু কাজকর্মের জন্য তাদের শাস্তির স্বাদ দিতে চান।” (৩০:৪১)
একজন মুসলিমের ঈমান তথা বিশ্বাসের প্রশ্নের সাথে জড়িত আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের এ দায়িত্বটি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজ হতে দেখবে, তখন সে যেন তার হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে। যদি সে তা না পারে মুখ দিয়ে সে অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে। যদি তাও না পারে, তবে ওই অন্যায়কে মনে-প্রাণে ঘৃণা করবে। আর এটা দুর্বলতম ঈমানের পরিচয়।”
মুসলিম মাত্রই রাসুলকে (সা.) আদর্শ হিসেবে মানে। আল্লাহ বলেছেন, “হে রাসুল, যা কিছু তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে, তা তুমি (অন্যের কাছে) পৌঁছে দাও। যদি তুমি না করো, তাহলে তো তুমি বার্তা পৌঁছে দিলে না।” (৫:৬৭)
রাসুল (সা.) এর অনুসারী হওয়ার দাবিদার হিসেবে সত্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার বৈশিষ্ট্য আমাদের ভেতরে থাকা উচিত।
রাসুল (সা.) এর পূর্ববর্তী নবী ও রাসুলদেরও একই দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। কিছু মানুষ তাঁদের কথা মেনেছে, কিছু মানুষ মানেনি।
আজকের পৃথিবী যতটুকু শুভ্রতা, সৌন্দর্য ও নির্মলতা ধারণ করে রেখেছে, তা ওই আহ্বানকারী ও তাঁদের কথা মেনে নেওয়া মানুষগুলোর অবদানে। সুতরাং মানুষকে ডাকুন ভালোর দিকে, আলোর দিকে। এটা এই জীবন এবং অন্য জীবনের শান্তি ও সাফল্যের পূর্বশর্ত।
লেখক-শিক্ষক, আলোড়ণ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুর, ঢাকা
সম্পাদনা : শিমুল সুলতানা
bn24.islam@gmail.com