চট্টগ্রাম: কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নৃশংস খুনের শিকার মেধাবী ছাত্র হিমাদ্রি মজুমদার হিমু হত্যা মামলার প্রধান আসামি জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদের মা ও আসামি শাহ সেলিম টিপুর স্ত্রী রেহেনা আক্তার এবং মাহবুব আলী ড্যানির মা আনোয়ারা আহমেদ পুলিশ পাহারায় সংবাদ সম্মেলন করেন।
শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলনের সময় বাইরে হিমুর খুনিদের বিচারের দাবিতে শেকড় নামে একটি মাদকবিরোধী সংগঠন মানববন্ধন করে। এসময় আসামি পরিবারের লোকজন এবং তাদের স্বজনদের নিরাপত্তা দিতে তৎপর ছিল পুলিশ।
মানববন্ধনে উপস্থিত শেকড়ের কর্মীরা বলেন, “সাধারণ চোর ধরতে গিয়ে তাদের না পেলে স্ত্রী, সন্তানদের ধরে এনে সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। আর পলাতক খুনিদের স্ত্রী, মাকে কাছে পেয়েও আসামিদের সন্ধান না করে তাদের নিরাপত্তা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করানো পুলিশের প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।”
তবে প্রেসক্লাবে উপস্থিত কোতয়ালী থানার এএসআই মো. জামশেদ বাংলানিউজকে বলেন, “এটা আমাদের নিয়মিত ডিউটি। যেহেতু দু’পক্ষই এখানে উপস্থিত হয়েছে সুতরাং নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।”
সংবাদ সম্মেলনে রেহেনা আক্তার কোনো রাকঢাক ছাড়াই জানিয়েছেন, তার স্বামী শাহ সেলিম টিপু এখনও দেশেই আছেন। সময়মত তিনি সামনে আসবেন। আর অপর আসামি তার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ গত ২৭ এপ্রিল ঘটনার দিন রাতেই ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে লন্ডনে চলে গেছেন।
অন্যদিকে ড্যানির মা আনোয়ার আহম্মদ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনারা পত্রিকায় লিখে লিখে আমার ছেলেকে তো হিরো বানিয়ে ফেলেছেন, তাই সে পালিয়ে আছে। আমার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।”
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন রেহেনা আক্তার। আর উদ্ধত আচরণ করেন সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে জুনায়েদের শিক্ষক পরিচয়দানকারী সাজেদুল আজাদ চৌধুরী সাজিদ নামে এক ব্যক্তি।
উল্লেখ্য গত ২৭ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ‘ফরহাদ ম্যানশন’ নামের ১০১ নম্বর বাড়ির ৪তলায় হিমুকে কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নিমর্মভাবে নির্যাতন করে সেখান থেকে ফেলে দেয় অভিজাত পরিবারের কয়েকজন বখাটে যুবক।
গুরুতর আহত হিমু ২৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ২৩ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। হিমু পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১নম্বর সড়কের ইংরেজি মাধ্যমের সামারফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রেহেনা আক্তার দাবি করেন, ঘটনার সময় তার স্বামী শাহ সেলিম টিপু জুমার নামাজে ছিলেন। এসময় তাকে খবর দেওয়া হয়, তাদের বাড়ির আঙিনায় একটি ছেলে কাতরাচ্ছে। খবর পেয়ে তিনি এসে আহত হিমুকে উদ্ধার করে মেডিক্যালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান এবং চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন। মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে লাশ আনারও ব্যবস্থা করেন টিপু।
তবে হিমুর পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো পূর্ব পরিচয় ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
হিমুর চিকিৎসার ব্যয়ভার কেন টিপু বহন করতে গেলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে রেহেনা আক্তার বলেন, “মানবতাবোধ থেকে নিজের সন্তান মনে করে চিকিৎসার টাকা-পয়সা দিয়েছি।”
চিকিৎসার জন্য কত টাকা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা হিসাব করে দেখতে হবে।”
ঘটনার সময় পুরো বাড়িতে তিনি একা ছিলেন বলে দাবি করলেও হিমুকে কারা আহত করলো, কীভাবে করলো এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। আবার লিখিত বক্তব্যে স্বামীকে নির্দোষ দাবি করলেও ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদকে একবারের জন্যও নির্দোষ দাবি করেননি।
রেহেনা আক্তার মামলা দায়ের নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “ঘটনার পর আমরা কেউই তো পালিয়ে ছিলাম না। তখন পুলিশ আমাদের ধরেনি কেন? তখন মামলা না করে জিডি করা হল কেন? কেনই-বা দূর সম্পর্কীয় মামা বাদী হয়ে মামলা করলেন?’
সংবাদ সম্মেলনে কুকুরের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার বাসায় ৩টি বিদেশি পোষা কুকুর আছে। এগুলো আমার স্বামী শখের বশে লালন করেন। কুকুরগুলো ৫ তলার ছাদে থাকে।”
কুকুর লেলিয়ে দিয়ে হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের কুকুরগুলো কখনও শুধু আঁচড় দেয় না। সেগুলো মাংস তুলে নেয়। হিমুর শরীরে তো কুকুরের আঁচড়ের দাগ ছিল।”
রেহেনা আক্তার অভিযোগ করেন, হিংসার বশবর্তী হয়ে এবং তাদের পরিবারের মান-সম্মান ক্ষুন্ন করার জন্য একটি শক্তিশালী চক্র কলকাঠি নাড়ছে।
এ চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত? এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আপনারা সাংবাদিকরাই এটা খুঁজে বের করুন। তবে আমরা হিমুর মা-বাবাকে দোষী করছি না।”
সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে রেহেনা আক্তার সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করে বলেন, “আমাদের সন্তানদের জীবন ধ্বংস করবেন না।”
অন্যদিকে একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রশ্ন করতে চাইলে সাজেদুল আজাদ চৌধুরী সাজিদ উদ্ধত ভঙ্গিতে তার পরিচয় জানতে চান। এসময় সম্মেলনস্থলে কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলনের মাঝামাঝিতে সেখানে উপস্থিত সাজিদ ও শিক্ষক পরিচয়দানকারী আরও এক যুবক শাহেদ শরীফ এবং আসামি টিপুর বন্ধু ফয়েজউল্লাহ চৌধুরী বাহাদুর সেখান থেকে সটকে পড়েন। সংবাদ সম্মেলনের শেষে তাদের আর দেখা যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, টিপু’র শ্বাশুড়ি দেলোয়ারা বেগম ও ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের শিক্ষিকা রোকেয়া চৌধুরী।
উল্লেখ্য, হিমুর মৃত্যুর ঘটনায় তার মামা প্রকাশ দাশ অসিত বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে প্রধান আসামি রিয়াদ ও তার বাবা শাহ সেলিম টিপুসহ ধনী পরিবারের আরও ৩ যুবকসহ মোট ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত ২ জুন এ মামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি শাহাদাৎ হোসেন সাজুকে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপ থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৯১২ ঘণ্টা, জুন ১৬, ২০১২
আরডিজি/সম্পাদনা : আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর