 |
তোমার আত্মা মিশে আছে আমার আত্মায়
তোমার আত্মা মিশে আছে আমার আত্মায়
মদ যেমন মিশে থাকে জলে;
যা-কিছুই তুমি স্পর্শ করো আসলে স্পর্শ করো আমাকে
আত্মার প্রতিটি স্টেশনে তুমিই আমি।
আমাকে খুন করো, বিশ্বস্ত বন্ধুরা আমার
আমাকে খুন করো, বিশ্বস্ত বন্ধুরা আমার,
কারণ আমার নিহত হওয়াতেই আমার জীবন।
ভালোবাসা হলো, তুমি দাঁড়িয়ে আছো
তোমার ভালোবাসার সামনে
যখন খুলে ফেলছো তোমার সমস্ত বিশেষণ;
তখন তার বিশেষণ হয়ে ওঠে তোমার গুণাবলি।
তোমার আর আমার মাঝখানে, আছি কেবল আমি।
আমাকে সরিয়ে নাও, তুমি রবে শুধু।
তুমি বয়ে চলো হৃদয় আর তার আবরণের মাঝে
তুমি বয়ে চলো হৃদয় আর তার আবরণের মাঝে যেমন অশ্রু গড়িয়ে পড়ে
চোখের পাতা থেকে।
তুমি থাকো আমার অন্তর্মুখীনতায়, আমার হৃদয়ের গহীনে, যেমন আত্মা বাস
করে শরীরে।
বিরাম থেকে গতি পায় না কিছুই যদি না তুমি তাকে নাড়া দাও গোপন উপায়ে,
হে নতুন চাঁদ।
দিওয়ান আল-হাল্লাজ থেকে
১.
ভালোবাসার সমুদ্রে আমি ভাসতে শুরু করি,
একটি উত্তাল তরঙ্গ আমাকে উপরে তোলে, অপরটি নিচে নামিয়ে দেয়;
আর এভাবেই আমি এগিয়ে যাই, এই উঠছি, এই নামছি.
যতক্ষণ পর্যন্ত না দেখতে পাই গভীর সমুদ্রের একেবারে মাঝখানে,
ভালোবাসা আমাকে নিয়ে গেল এমন এক স্থানে যেখানে কোনো বেলাভূমি নাই
ভয় পেয়ে আমি সাহায্যের জন্য ডাকলাম তাকে (পরম) যার নাম আমি খোলাসা
করব না,
এমন একজন যার ভালোবাসার কাছে কখনও মিথ্যা ছিলাম না আমি:
‘প্রকৃতই ন্যায়ানুগ তোমার নিয়ম’ আমি বললাম, ‘আমি আমার এই জীবন দিয়ে
তোমার সুষমাচারের সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত।’
আমাদের ভেতরের চু্ক্তিনামার কোনো বিষয় এটি নয়।
২.
অনেক বেদনার ব্যাপার যে আমি নিরন্তর ডাকছি তোমাকে,
যেন আমি অনেক দূরে তোমার থেকে কিংবা তুমি অনুপস্থিত আমার কাছে,
আর আমি অবিরাম চেয়ে যাচ্ছি তোমার করুণা, যদিও জানি না কী প্রয়োজন,
কখনওই আগে এমন বাসনাপূর্ণ তপস্বী দেখি নাই আমি।
৩.
আমার হৃদয়ে তোমার স্থান হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে,
কেননা আর কেউই নিতে পারে না তোমার স্থান।
আমার আত্মা তোমাকে স্থাপন করেছে আমার ত্বক আর হাড়ের মাঝখানে,
সুতরাং কী করব আমি কখনও যদি হারাতে হয় তোমাকে?
মনসুর আর-হাল্লাজের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
পারসিক কবি এ সুফী সাধকের পুরো নাম আবুল মুঘীত আল-হুসাইন বিন আল হাল্লাজ। হাল্লাজের জন্ম ৮৫৮ খৃস্টাব্দে ইরানের ফারস প্রদেশের বাইজা শহরে। পরিবার সূত্রে হাল্লাজ ছিলেন সুন্নি মুসলিম, তার পিতা ছিলেন সুতো বানানোর কারিগর (হাল্লাজ)। হাল্লাজ নিজেও ছোটবেলায় পারিবারিক পেশায় হাত পাকিয়ে ছিলেন বলে ‘হাল্লাজ’ নামের পরিচয় জোটে।
সুফী সাধনার ইতিহাসে তাকে বলা হয় ‘মরমী প্রেমের শহীদ’। সুফী কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার হাল্লাজের শহীদত্বকে বলেছিলেন সুফীবাদের ‘শিখর’। আর হাল্লাজের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার ‘জাবিদ-নামা’য় তাকে উল্লেখ করেছিলেন ‘প্রমিথিয়ান ব্যক্তিত্ব’ বলে। বিশ শতকের সিরীয় কবি এডোনিস হাল্লাজকে স্মরণ করে লিখেছিলেন-
‘তোমার সবুজ বিষভরা পালকই আমাদের ইতিহাস
এবং আমাদের ভূমিতে- আমাদের পুনঃ পুনঃ মৃত্যুতে
আসন্ন পুনরুত্থান…’
অল্প বয়স থেকেই তার মরমী আত্মানুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু হয় কোরান আত্মস্থ করার ভেতর দিয়ে। কঠোর কৃচ্ছতা ও ভাবাবেশের চর্চা দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, ব্যক্তি মানুষ পরম উপস্থিতিরই সাক্ষ্য দেয়। পরমকে উপলব্ধির সোপান হলো আস্থা ও প্রেম। ব্যক্তিসত্তা সত্যরূপ ধারণ করে এই উপলব্ধির ভেতর দিয়ে।
হাল্লাজ দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করে খোরাসান, তুর্কিস্তান, সিন্ধু, ভারত প্রভৃতি অঞ্চলে তার ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন। বাগদাদে তার ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয় এবং এই শিক্ষার প্রভাবে সেখানে ক্রমশ সংগঠিত হয় নৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। এতে শিক্ষিত ও শাসক শ্রেণীর মধ্যে তার অনেক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতা ও আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ৯০৮ খৃস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফার বিরুদ্ধে সুন্নি সংস্কারকদের ক্ষমতা দখলের ব্যর্থ চেষ্টার পর হাল্লাজকে বাগদাদ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।
৯১৩ খৃস্টাব্দে হাল্লাজ আটক হন। এরপর থেকে মৃত্যু অবধি হাল্লাজ বন্দি জীবন যাপন করেন। কয়েকজন শিয়া নেতা, ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজীবী ও উজিরের ষড়যন্ত্রে হাল্লাজের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রহসনমূলক বিচার অনুষ্ঠিত হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
*কবিতাগুলি ঐতিহ্য প্রকাশিত মনসুর আল-হাল্লাজের ‘কিতাব আল-তাওয়াসিন’ কাব্যগ্রন্থের পরিশিষ্ট-৩ থেকে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হয়েছে। কবি ও অনুবাদক রায়হান রাইন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করছেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৮১৬ ঘণ্টা, জুলাই ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস