 |
ঢাকা: বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিল্ট অ্যান্ড অপারেট (বিওটি) ভিত্তিতে পরিচালিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সোনামসজিদ ও হিলি স্থলবন্দরের ভেরিয়েবল রয়্যালিটি, স্থাপনা ভাড়া ও ভূমি কর বাবদ বকেয়া রয়েছে ৬ কোটিরও বেশি টাকা। লাভজনক এ স্থলবন্দর দু’টির বকেয়া নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হলেও তা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অংশীদারিত্বে বিরোধের কারণে পাওনা আদায় করতে পারছে না সরকার।
পাওয়া আদায়ের উদ্যোগের অংশ হিসেবে নৌ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সোনামসজিদ স্থল বন্দরের আসল পাওনা (ভেরিয়েবল রয়্যালিটি স্থাপনা ভাড়া এবং ভূমিকর ও সুদ) ৩ কোটি ২৯ লাখ ৬৯ হাজার ৪০১ টাকা তিন কিস্তিতে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়।
ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি, ১২ এপ্রিল ও ১২ জুনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের কথা থাকলেও কার্যত তা হয়নি। বিষয়টি ওডিট রিপোর্টে উঠে এলেও ওই প্রতিষ্ঠানকে সতর্কও করা হয় নৌ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত গত ১৫ জুলাই’র সভায়।
উপরন্তু, গত ২৮ মার্চ প্রথম কিস্তির নির্ধারিত এক ১ কোটি ১০ লাখ টাকার একটি আগাম একাউন্ট পে চেক গত ৩০ এপ্রিল জমা দেয় পানামা-সোনামসজিদ পোর্ট লিংক।
প্রতিষ্ঠানটির এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে চেক ফেরত দেয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে মাত্র ৫৩ লাখ ৩১ হাজার ৯০১ টাকা পরিশোধ করে তারা। যদিও পানামাকে এই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে সতর্ক করা হয়েছে।
এছাড়া গত জানুয়ারি থেকে চলতি পাওনা স্থলবন্দরের অভ্যন্তরের সোনালী ব্যাংকের বুথে ব্যাংক চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করার কথা থাকলেও নির্দেশ মেনে নিয়মিত পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে না। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।
অপরদিকে সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যে সব অবকাঠমো নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিলো তা করেনি পানামা-সোনামসজিদ পোর্ট লিংক। পানামা ওপেন ইয়ার্ড, রাস্তা এবং ১০ একর জমির চারিদিকে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ ছাড়া অন্য কোন নির্মাণ কাজ আরম্ভই করেনি তারা। গত ১২ মার্চ পানামাকে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য তাগাদা দিয়ে চিঠিও পাঠানো হয়।
গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, পানামা-সোনামসজিদ পোর্ট লিংক সুদ মওকুফের জন্য আবেদন জানায়। পানামার আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই সভায় কিস্তিতে পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় কিস্তি ৬ লাখ, চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ কিস্তি ১২ লাখ এবং অবশিষ্ট কিস্তি ২৫ লাখ করা হলেও তা পরিশোধে ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্টরা। পরবর্তী সভায় বিষয়টি জানানো হয়।
এর পরের সভায় আরও জানানো হয়, স্থলবন্দর শুরুর পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পানামার মোট বকেয়া ভেরিয়েবল রয়ালিটি, স্থাপনা ভাড়া, লিজ রেন্ট, ভুমি কর ও এসবের সুদসহ (১৫ শতাংশ হারে) মোট ৪ কোটি ৮৪ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।
এদিকে হিলি স্থলবন্দরে পানামা-হিলি পোর্ট লিংকের কাছে পোর্ট অপারেটর সুদ ছাড়া ব্যবস্থাপকের পাওনা ১ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭২ টাকা। এ টাকা প্রতি দুই মাস অন্তর ১০ লাখ করে ৩০ লাখ কর পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হলেও পানামা-হিলি পোর্ট লিংক নামের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি তা করেনি।
গত ২৬ মার্চের মধ্যে প্রথম কিস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও গত ২৮ মার্চ মাত্র ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে তারা। এ কারণে সভা থেকে ওই প্রতিষ্ঠানে সতর্ক করা হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, পানামা-হিলির ভেরিয়েবল রয়্যালিটি, স্থাপনা ভাড়া, লিজরেন্ট ইত্যাদির সুদসহ সর্বমোট বকেয়া ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার ৭৩৮ টাকা।
এ বিষয়ে পানামা হিলি পোর্ট লিংকের প্রতিনিধি মনজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলানিউজকে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে কোন পাওনা নেই। সোনামসজিদের পাওনা থাকতে পারে। বরং আমরাই সরকারের কাছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পাই।”
সোনামসজিদ স্থলবন্দর
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ স্থলবন্দরটি ২০০৬ সালে বিওটি ভিত্তিতে ২৫ বছরের চুক্তিতে পরিচালনার দায়িত্ব নেয় পানামা-সোনামসজিদ পোর্ট লিংক লিমিটেড।
চুক্তি অনুযায়ী, ২৫ বছর কোম্পানিটি বন্দর পরিচালনা করে মোট লভ্যাংশের শতকরা ৪৯ ভাগ সরকারকে দেবে। আর বাকি ৫১ শতাংশ লভ্যাংশ পাবেন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা। কিন্তু এর বিনিময়ে বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে কোম্পানিটিকে।
কিন্তু গত ৬ বছরে চুক্তি মেনে নতুন ওয়্যারহাউস নির্মাণ, নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন, হিমাগার, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণসহ অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করেনি পানামা।
বর্তমানে ১৮ দশমিক ৩ একর জমিতে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এজন্য পানামা-সোনামসজিদ আরও ১০ একর জমি চেয়ে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে।
হিলি স্থলবন্দর
২০০৫ সালে ৯ অক্টোবর পানামা হিলি পোর্টলিঙ্ক লিমিটেড গঠন করে সরকারের সঙ্গে বন্দর পরিচালনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় পানামা ট্রেডিং। সোনামসজিদ স্থল বন্দরের মতো বিওটি পদ্ধতিতে এ বন্দরটিও পরিচালিত হবে। পানামা ট্রেডিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে ২৫ বছর। এ সময়ে কাস্টমস শুধু রাজস্ব আদায় করবে। ব্যবস্থাপনার লভ্যাংশ (যা মূলত বন্দরের মাসুল থেকে আসে) যাবে ইজারাদারের কাছে।
চুক্তি অনুযায়ী, তারা সরকারকে প্রতিবছর লভ্যাংশের ৪৯ শতাংশ দেবে। ৫১ শতাংশ পাবে তারা।
মোট চুক্তি ২৭ বছরের জন্য হলেও প্রথম দুই বছর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ধরা হয়। ১০ একর জমির ওপর চারটি ওয়্যার হাউজ, একটি খোলা ইয়ার্ড, একটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড ও একটি ট্রাক টার্মিনাল নিয়ে ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে তারা।
পোর্ট অপরেটরের জন্য অতিরিক্ত ১৫ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য গত জুলাইতে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। সেই আলোকে পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৫০৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১৯, ২০১২
এআর/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর