 |
| ছবি: জাহিদ সায়মন |
ঢাকা: ভোরের আলোর তখনও ঠিকমতো ফোটেনি। রাজধানীর সব রাস্তা যেন মিলিত হয়েছে সায়েদাবাদ টার্মিনালে। টার্মিনালে হৈ চৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি, টানা হেঁচড়া বলে দিচ্ছিল, প্রিয় মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করার বাড়ি ফেরার কষ্ট। টিকিট সংগ্রহের ঝক্কি ঝামেলা, টামিনালে পৌঁছানো সব কষ্ট দূরও হয়ে যাচ্ছে, যখন কাঙ্খিত বাস আসছে।
প্রিয় মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে যারা আগে বাড়িতে যেতে পারেননি, তাদের অনেকই ঢাকা ছাড়ছেন শনিবার। আবার কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেনের শিডিউলের চেয়ে ৫-৬ ঘণ্টা পরও ট্রেন না আসায় বাধ্য হয়ে বাসে যাওয়ার জন্য সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এসেছেন অনেকেই।
বৃহস্পতিবার ছিলো শেষ কার্যদিবস। এরপরও যারা নানা কারণে বাড়িতে যেতে পারেননি, তারাই মূলত শনিবারের যাত্রী। টানা ১১ দিনের ছুটিকে কাজে লাগাতে আগে ভাগে ঢাকা ছেড়েছে অনেকেই। ফলে শনিবার বাসে তেমন কোনো চাপ দেখা যাচ্ছে না।
ভোরে সায়েদাবাদ টার্মিনালে যাত্রীদের তেমন চাপ না থাকলেও যাত্রীদের পড়তে হয়েছে নানা বিড়ম্বনায়। কাউন্টারে সময় মতো বাস না আসায় ঘণ্টার ঘণ্টার অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
যাত্রীদের অভিযোগ, টিকিটে বাস ছাড়ার সময় সকাল সাড়ে ৬টা থাকলেও এখন সকাল সাড়ে ৯টায়ও বাস এসে পৌঁছেনি। কখন পৌঁছাবে তা ঠিক করে বলতে পারেননি কাউন্টারে কর্মরতরা। তবে বাস মালিকদের দাবি, মহাসড়ক আর ঢাকায় ঢোকার পথে কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে বাসগুলোকে। এজন্য শিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
টার্মিনালে পৌঁছাতে বিড়ম্বনা
একজন যাত্রী পেলেই শুরু হচ্ছে কাড়াকাড়ি। কোথায় যাবেন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, লক্ষীপুর, মনে হয় তিনি সব জায়গাই নিয়ে যাবেন। যাত্রীকে বলার কোনো সুযোগ দিয়ে টেনে বাসে উঠনো হলো। ভাড়া কতো যাত্রীর কথা না শুনেই বাসশ্রমিকরা বলে ওঠেন, ‘‘আপনার কাছ থেকে বেশি রাখবো না।’’
বাস ছাড়ার আগ মুহূর্তে যাত্রী জানতে পারেন, তার গন্তব্যস্থলের বাস এটি নয়। তখন বাসের হেলপার আর যাত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে হাতাহাতি। পরে পুলিশের মধ্যস্থতা সমঝোতা। যাত্রীর অভিযোগ, ‘‘আমি কুমিল্লা যাবো, অথচ হেলপার আমার গন্তব্য না জেনেই আমাকে টেনে বাসে ওঠান।’’
এদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে টার্মিনালে আসার পথে ট্যাক্সি ও অটোরিকশা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। লাকসামগামী যাত্রী লালবাগের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা শফিঊল আলম বাংলানিউজের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘অন্যান্য দিন নির্দিষ্ট সিএনজি স্ট্যান্ডে গেলেই অটোরিকশা পাওয়া যায়। অথচ শনিবার সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে একটিও সিএনজি বা ক্যাব পাওয়া গেল না। উপায়হীন হয়ে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ৪০০ টাকা ভাড়ায় দিয়ে একটি লেগোনা দিয়ে টামিনালে এসেছি।’’
কাদা আর ধুলায় মাখামাখি
পুরো বাস টামিনালে যেন কাদা আর ধুলার দখলে। ধুলার মাত্রা এতোই বেশি যে, ১০ ফুট সামনে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আর রাস্তার দু’পাশে কাদার ছড়াছড়ি। অনেককেই পানি আর কাদা পার হয়েই উঠতে হচ্ছে বাসে। কাউকে পরে আসা জামা কাপড় চেঞ্জ করতেও দেখা গেছে।
টিকিট নিয়ে জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে। টার্মিনালে কুলিদের উৎপাত সীমাহীন। তবে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা মাথায় নিয়ে টার্মিনালে পৌঁছাতে আর নির্দিষ্ট বাসে উঠতে পেরে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
তবে যাত্রীদের চাপ কম
শনিবার চাঁদ উঠলে রোববার ঈদ। তবে শনিবার ভোর থেকে সায়েদাবাদ বাস টামিনালে গিয়ে তেমন যাত্রীর চাপ চোখে পড়ে না। শুক্রবার সকাল থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে নিয়মিত ট্রিপের বাইরেও অতিরিক্ত যানবাহন ছাড়া শুরু করেছেন বাস মালিকরা। যাত্রীদের চাপ বেশি থাকলে ঈদের আগের দিন আগামী রোববার দুপুর পর্যন্ত একইভাবে অতিরিক্ত ট্রিপ চলবে বলে জানিয়েছেন একাধিক বাস মালিক ও সংশ্লিষ্টরা। তবে যাত্রীর চাপ কম থাকায় তারা কিছুটা হতাশ।
সায়েদাবাদ থেকে মূলত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের যাত্রী তাফসির বাংলানিউজকে জানান, ‘‘ভোর সাড়ে ছয়টায় বাস সায়েদাবাদ ছেড়ে যাওয়ার কথা। এজন্য আধ ঘণ্টা আগেই সায়েদাবাদ চলে এসেছি। অথচ সাড়ে নয়টা বেজে গেলেও বাসের দেখা পাইনি। কখন দেখা পাবো, সে ব্যাপারে কাউন্টারের লোকজনও নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না।’’
প্রায় পুরো টার্মিনাল এলাকার অধিকাংশ পরিবহনের কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকেই যাত্রীরা সেখানে বাসের জন্য অপেক্ষমান। বাসের সময়সূচির বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে সায়েদাবাদ শ্যামলী পরিবহনের সুপারভাইজার মিজান বলেন, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এবং ঢাকা প্রবেশের বিভিন্ন জেলাগুলোর রাস্তা-ঘাটের বেহালদশার কারণে বাসগুলো নিদিষ্ট সময়ে ঢাকা প্রবেশ করতে পারচ্ছে না। তিনি জানান, মহাসড়কগুলোর অন্তত তিনটি স্থানে সড়কের বেহালদশা ও যানজটের কারণেই বাসগুলো নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারছে না।
কুমিল্লাগামী বাস ড্রাইভার জানান, যাত্রাবাড়ী হয়ে কাচপুর ব্রিজ পার হতেই দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পার হয়ে যায়, ঢাকা ঢোকার পথে একই অবস্থা।
এছাড়া চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি পর্যন্ত এবং কুমিল্লা থেকে কাচপুর সেতু পর্যন্ত যানজট ছাড়তে সময় লাগছে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। তিনি আরও জানান, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলছে উড়াল সেতুর কাজ। এই সেতুর অধিকাংশ লিংক রোডগুলো সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশেপাশের এলাকা দিয়ে বের হবে। ফলে টার্মিনালের আশেপাশে প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা কমপক্ষে এক ঘণ্টার জন্য প্রায় বন্ধই হয়ে থাকে।
সায়েদাবাদে চাঁদপুরগামী পদ্মা পরিবহনের ব্যবস্থাপক উজ্জ্বল জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই তারা অতিরিক্ত বাসে যাত্রী পরিবহন শুরু করেছেন, যা ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চলবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৪০ ঘণ্টা, আগস্ট ১৮, ২০১২
এনএম/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর