 |
| ছবি: নাজমুল হাসান/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
নুহাশ পল্লী থেকে ফিরে: “স্যারকে যদি অন্য কোথাও কবর দেওয়া হতো তবুও এই লিচুতলার মাটি খুঁড়ে সে কবরে দিয়ে আসতাম। কারণ তিনি যে এই মাটিতেই ঘুমাতে চেয়েছিলেন। এই মাটি না দিলে তিনি কষ্ট পেতেন।”
বলছিলেন নুহাশ পল্লীর মালি মোশাররফ হোসেন। সদ্য পতন হওয়া বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নক্ষত্র কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে তার প্রিয় লিচুতলায় চির বিদায়ের পর বাংলানিউজের কাছে তার প্রিয় স্যারের স্মৃতি আওড়াতে আওড়াতে একথাগুলো বলেন তিনি।
মোশাররফ বলেন, “স্যার এখানে এলে সবার আগে আমাকেই খোঁজ করতেন। কারণ স্যারের আসা মানে নতুন কোনো গাছ আসা। সে গাছ লাগানো আর আগের লাগানো গাছগুলোর খোঁজ নেওয়াই ছিল তার প্রধান কাজ। এমনকি, শেষ বার যখন স্যার এখানে আসেন, কয়েকটি প্রজাপতি গাছ, বাগান বিলাস গাছ আমাকে দেখিয়ে বলেন, এগুলোর যত্ন নিও। ফিরে এসে দেখব গাছগুলো।”
‘‘স্যার যখন বলছিলেন ‘ফিরে আসব’, তখন স্যারকে যে কি সুন্দর লাগছিল তা কাউকে বোঝাতে পারব না। অত সুন্দর স্যারকে আর কোনোদিন দেখিনি।’’
“গাছের যতœ নিতে নিতে বহু সময় স্যারের সঙ্গে কাটিয়েছি। সেসব সময়ে স্যার কয়েকবার বলেছেন, এই লিচু তলায় আমার কবর হবে। তবে তোমরা দিও- এমন কথা তিনি বলেননি। শুধু বলতেন এখানেই থাকব আমি।”
মোশরারফ যোগ করেন, “যখন শুনলাম নুহাশ পল্লীতে স্যারকে চিরদিনের জন্য ঘুমাতে দেওয়া হবে না, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম তখন। সারারাত ধরে দোয়া করেছি, যেন স্যারের কবরটা স্যারের প্রিয় জায়গাটিতেই হয়।”
স্মৃতি হাঁতড়ে মোশারফ বলতে থাকেন, “১৪ বছর আগে (তারিখ মনে নেই) এখানে যখন ঢুকি, দেখলাম স্যার একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর আগে আমার হাতে থাকা একটি বরই গাছের কলম অন্য একটি গাছের সঙ্গে লাগিয়ে দিই আমি। সেটি তাঁকে জানালে খুবই খুশি হয়ে সে গাছটি দেখতে চান স্যার। দেখার পর তিনি আমায় বলেন, এখন থেকে এখানকার গাছগুলোর দেখাশুনা করবে তুমি। কত বেতন চাও বল? বেতনের কথা মুখ দিয়ে কিছুই বলিনি আমি। দেখলাম মাস শেষে ১৫০০ টাকা বেতন দিলেন স্যার। বিভিন্ন সময়ে তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন আমি ৫০০০ টাকার বেতন পাই।”
“এখন স্যার নেই। যদি বেতন নাও পাই, তবুও সারাজীবন স্যারের কবর পাহারা দিয়ে যাব।” বললেন মোশাররফ।
মোশাররফ শুধু হুমায়ূন আহমেদের বাগানের মালিই ছিলেন না। ছিলেন বিনোদন সঙ্গীও। তার গল্পে বের হয়ে আসে সে কথা, “হঠাৎ করেই স্যার ডাক দিয়ে বলতেন গান ধর তো মোশাররফ! আমি স্যারের পছন্দের গানগুলো গাইতাম। খাজা বাবার গানটাই আমার কাছে বেশি শুনতেন স্যার।”
হাত দিয়ে বাঁশি বাজানোর মত অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে মোশাররফের। সেটিও মুগ্ধ করেছিল হুমায়ূন আহমদকে।
মোশাররফ বলেন, “একদিন নুহাশ পল্লীতে গ্রামের একটি ব্যান্ড পার্টি এলো। তাদের কাছে লম্বা মোড়ানো বাঁশি দেখে খুব বাজানোর লোভ হল। চাইলে দিল না। তখন ওই বাঁশির মত করে গান বাজানোর জন্য খুব ইচ্ছা করছিল। তাই মুখ দিয়েই চেষ্টা করলাম। এক সময় পেরেও গেলাম। একদিন রিয়াজ ভাই (নায়ক রিয়াজ) সেটি শুনে স্যারকে বলেন। স্যার শুনতে চাইলে লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবুও শোনালাম শেষ পর্যন্ত। খুব খুশি হলেন তিনি। এরপর থেকে লোকজন এলেই আমাকে ডেকে তাদেরকে আমার মুখে বাঁশির বাজানো শোনাতেন।”
এ প্রতিবেদকসহ উপস্থিত অন্যান্যদেরকেও তার বিখ্যাত মুখে বাঁশির বাজানো থেকে বঞ্চিত করলেন না। শোনালেন হুমায়ূন আহমেদেরই লেখা দুটি গান।
গান শেষ করে আবারও বলতে থাকেন মোশাররফ, “স্যারের কত কথা শুনবেন! তার কথা কি বলে শেষ করা যায়?”
‘স্যার কখন ঘুম থেকে উঠতেন, কেউ বলতে পারত না। কখন কোন জায়গা থেকে স্যার এসে পড়তেন বোঝা মুশকিল ছিল। ঘুম থেকে উঠে তিনি নুহাশ পল্লীর পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতেন। একটা দা নিয়ে কখনো আমায় ডেকে নিতেন। কোনো গাছের ডাল লম্বা হতে অথবা ভেঙে পড়তে দেখলে কেটে দিতে বলতেন। আমি সঙ্গে সঙ্গেই তা কেটে দিতাম।”
“স্যার ছিলেন খুবই পরিচ্ছন্ন মানুষ। একদিন শ্যুটিংয়ে সাপ নিয়ে এলে দু’হাতে দুটি সাপ ধরে ক্যামেরার সামনে উঁচু করে ধরি আমি। তা দেখে স্যার বকা দিয়ে বলেন, আমাকে আর খাবার দেবে না তুমি। এরপর প্রায় দুই মাস স্যারকে আমি খাবার দেইনি। একদিন স্যারই বলেন, কে তোমাকে খাবার দিতে নিষেধ করেছে, যাও খাবার নিয়ে এসো।”
স্যার আমাদেরকে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি মাঝে মাঝে বকাও দিতেন। বের হয়ে যেতে বলতেন। এসময় বুকের মধ্যে কেঁপে উঠত। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, বকাবকির পর দু’ঘণ্টা স্যারের সামনে না গেলেই স্যার নিজেই আবার ডাকতেন। এমনই ছিলেন আমাদের স্যার।”
কথা বলতে বলতে চোখের কোণে পানি জমা হয় মোশাররফের। ভাঙা গলায় আবারো বলেন, “নুহাশ পল্লীতে স্যার এলে আমি তাকে রেখে কখনো বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে পারিনি। স্যার ফাকায় গেলে আমি বাড়ি যেতাম। এখন স্যার সবসময় এখানে থাকবেন। তাঁকে রেখে কিভাবে বাড়ি গিয়ে থাকব আমি।”
আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন মোশাররফ!
তার গল্প শুনতে থাকা কেউই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তাই যে যার পথ ধরেন। মোশাররফও এগিয়ে যান স্যারের প্রিয় লিচু বাগানের দিকে।
বাংলাদেশ সময়: ০২১০ ঘণ্টা, জুলাই ২৫, ২০১২
জেপি/সম্পাদনা: আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর