 |
ঢাকা: রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন জামায়াতের তৎকালীন আমীর গোলাম আযম। ৪০ বছর পরও ধর্ষণ, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞের কথা স্মরণ করে শিউরে উঠি। তারা পাক-বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ না করলে হয়ত ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কমে যেত এবং আমরা আগেই জয়ী হতে পারতাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন।
রোববার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থিত হয়ে তিনি সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। ট্রাইব্যুনালে গোলাম আযমকেও হাজির করা হয়।
সাক্ষ্যে মুনতাসীর মামুন বলেন, “২৫ মার্চের কয়েকটি সংবাদপত্র যেমন ডেইলি অবজার্ভার, দৈনিক পাকিস্তান, সংগ্রাম, পূর্বদেশ পত্রিকাগুলোর ব্যাপারে আমি বলতে পারি। এসব তখন ছিল অবরুদ্ধ দেশের সংবাদপত্র। কোনো পত্রিকাই সরকারের অনুমোদনহীন খবর প্রকাশ করতে পারত না। সেসময় এসব পত্রিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতকারী বলা হতো। আমরা রাজাকার বাহিনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে এসব পত্রিকা পড়তাম। এছাড়া প্রকৃত খবরের জন্য রেডিও অস্ট্রেলিয়া, আকাশবাণীর ওপর নির্ভর করতে হতো। মার্চ মাসে যেসব রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন করছিল, তার মধ্যে আছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের বিভিন্ন অংশ, পিডিপি এবং আরও কিছু দলের শাখা। তবে জামায়াত ও মুসলীম লীগের ভূমিকাই ছিল বেশি।”
“২৫ মার্চের পর থেকে কোনো কোনো দল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে এবং তাদের প্রতিনিধি পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জেনারেল টিক্কা খানকে সহায়তা করছিল। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেছিল, যখন প্রতিদিনই পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট, ধর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এদের প্রধান সহযোগী ছিলেন নুরুল আমীন ও গোলাম আযম। তাদের পরামর্শেই শান্তি কমিটি গঠিত হয়। শান্তি কমিটি পরে দুইভাগ হলেও খাজা খয়েরউদ্দিন ও গোলাম আযমের নেতৃত্বে শান্তি কমিটি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তারা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা পেয়েছিল। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে গঠন করা হয়েছিল রাজাকার, আলবদর, ও আলশামস বাহিনী। এসব বাহিনীতে জামায়াতের লোকদেরই প্রাধান্য ছিল।”
মুনতাসীর মামুন বলেন, “সেসময় সংবাদপত্রগুলো দেখলে আমরা গোলাম আযমের বক্তব্য দেখতে পাব। রাজাকার বাহিনীর সূত্রপাত হয়েছিল গোলাম আযমের মাধ্যমে। পরে পাকিস্তান সরকার এর একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছিল। আলবদরের নেতৃত্বে ছিলেন জামায়াতের বর্তমান আমীর মতিউর রহমান নিজামী।”
মামুন তার কয়েকটি বইয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমার বইগুলোয় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির ওপরই বেশি আলোচনা করেছি। পাকিস্তানিদের যারা সহায়তা করেছিল তাদের মনোযোগ কেমন সেটা নিয়েই ছিল আমার প্রধান কৌতূহল। তারা এমন ধ্বংসযজ্ঞ কীভাবে চালাতে পারল?”
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের উপর অধ্যাপক মুনতাসীন মামুনের লেখা কয়েকটি বই আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: রাজাকারের মন` (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), পাকিস্তানের জেনারেলদের মন`, সেই সব পাকিস্তানি`, মুক্তিযুদ্ধকোষ` (সম্পাদনা), মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র` (সম্পাদনা), ১৩ নম্বর সেক্টর` প্রভূতি।
তিনি বলেন, “আমার সম্পাদনায় সোয়া দুইশর মতো বই আছে।”
“মূলত পাকস্তানি সহযোগীদের লক্ষ্য ছিল তৎকালীন ক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকা, সম্পদ লুটের মাধ্যমে আহরণ করা, হত্যা ও ধর্ষণকে জনগণকে দমিত করার জন্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।”
তিনি বলেন, “তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত শান্তি কমিটি পাক হানাদার বাহিনীকে পথ দেখিয়েছে, বাঙালি নারীদের তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সদস্য ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নারী-পুরুষদের হত্যা-ধর্ষণ করেছিল তারা। তারা পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের প্ররোচনা ও প্রণোদনা দিয়েছিল। আর এসবের নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম আযম। এর প্রমাণ আমরা পত্রপত্রিকায় পাই।”
দুপুরের বিরতির পর মুনতাসীর মামুন তার জবানবন্দিতে বলেন, “দেশজুড়ে অসংখ্য যে বধ্যভূমি পাওয়া গেছে, তাতে আমার ধারণা ১৭ সালে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। অনেককে হত্যা করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অনেকের গণকবরে স্থান হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমি বরিশালের উজিরপুরে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ধানচাষিদের সঙ্গে কথা বলেছি। রাজকাররা পাকস্তানি বাহিনীকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। তারা ওই গ্রাসে বহু মানুষকে হত্যা করেছিল।”
“মুক্তিযুদ্ধের সময় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে জামায়াত নেতারা সাক্ষাৎ করেন। এ বিষয়ে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। আমি বিশেষ করে নারী নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। আমার কাছে যেসব কাগজ আছে তাতে দেখা যায়, ১৩ থেকে ২০ বছর বয়সী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল রাজাকাররা। বলা হয়, ধর্ষিতার সংখ্যা চার লাখ। কিন্তু আসল সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। আমি এসব কথা মনে করতে চাই না। কারণ শান্তি কমিটির বেশির ভাগই ছিল বাঙালি। সেসময় আমরা কতটা মনুষ্যত্বহীন হয়ে পড়েছিলাম?”
“বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও গোলাম আযম ‘পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন’ করে। আমার জীবনকালে আমি এত রক্ত, হত্যাকা- দেখতে চাই না।”
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুমের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একটি কথা সত্যি, ৭১ সালে এসব ঘটনা ঘটেছিল।’
এদিন বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২৪ জুন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের তারিখ নির্ধারণ থাকলেও আসামিপক্ষ এবং রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১ জুলাই পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
জবাবন্দির পর অধ্যাপক গবেষক মুনতাসীর মামুনকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। রোববার জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
মুনতাসীর মামুনকে মিজানুল ইসলাম জিজ্ঞাসা করেন, “গোলাম আযমের সঙ্গে আপনারা কি কখনো দেখা হয়েছিল?’ মামুন উত্তরে বলেন, ‘আমার সঙ্গে গোলাম আযমের কখনো দেখা হয়নি। তার সঙ্গে দেখা করা আমি নিরাপদও মনে করি না।”
আরেক প্রশ্নোত্তরে মুনতাসীর মামুন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলাম।” এরপর সোমবার পর্যন্ত মুলতবি জেরা মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে, জামায়াতের আইনজীবী প্যানেলের সদস্য অ্যাড. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা রোববার গোলাম আযমের পক্ষে সাক্ষী তালিকা, ১০সিটি, ছয় হাজার পৃষ্ঠার ১২ খণ্ডের নথিপত্র জমা দিয়েছেন। গোলাম আযমের পক্ষের সাক্ষী সংখ্যা দুই হাজার ৯৩৯ জন।
রোববার জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের কথা ছিল। নিজামীর আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী রোববার পর্যন্ত তা মুলতবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৭২৫ ঘণ্টা, জুলাই ০১, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com