 |
| ছবি: শেখ নাসির/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
সিলেট: আর মাত্র কিছু সময় পেরোলে তারা বাড়ি ফিরতে পারতো। ট্রেনযোগে এতো দূর ঢাকা থেকে সিলেট এলেও খুব কাছে সিলেট থেকে কামালবাজার বাড়িতে তাদের ফেরা হলো না। সিলেট রেলস্টেশন থেকে মাইক্রোবাসযোগে বাড়িতে ফেরার সময় ভুল পাশ দিয়ে আসা বাস কেড়ে নিলো ওই পরিবারের ১০ জনেরসহ মোট ১৩ জনের প্রাণ।
একটি হত্যা মামলার আসামি হয়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ফিরছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই জীবনের জামিন হারালেন তারা।
শুক্রবার ওই ভোরের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছে মা, কেউ বাবা, কেউ বোন, আর কতো------। সব হারানোর কান্নাই এখন সম্বল কামালবাজার থেকে একটু উত্তরে কামালবাজারের লালপুর গ্রামের ওয়ারিস আলীর পরিবারে। ওয়ারিস আলীসহ তাদের তাদের আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে নিহত হন ১৩ জন। শুধু লালপুর গ্রাম নয়, শোক ছুয়ে গেছে পাশ্ববর্তী কয়েকটি গ্রাম বেটুয়ার মুখ, আজরাইয়েও। এসব এলাকায়ও শোকে স্তব্ধ লোকজন।
নিহতরা হলেন- ওয়ারিস মিয়া (৬০), তার স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৫৫), তাদের বড় ছেলে বাবুল মিয়া (৪০), বাবুল মিয়ার স্ত্রী হাজেরা বেগম (৩০), ওয়ারিস মিয়ার মেয়ে সুফিয়া বেগম (২৬), মেয়ের স্বামী আব্দুল করিম (৩২), ওয়ারিস মিয়ার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাজিয়া বেগম (৫০), শ্যালক রফিক মিয়া (৩২), নাতি আল আমিন (১২) ও সালমা (৯), দক্ষিণ সুরমার চৌধুরী গাঁওয়ের মাইক্রোবাস চালক হিরণ মিয়া (২৫), একই গ্রামের জামাল উদ্দিন (৩০) ও ফাতেমা (৭)।
এ পরিচয়গুলো বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেছেন নিহত ওয়ারিস মিয়ার ভাতিজা রফিক মিয়া।
এতো শোকের ভার সইতে পারছে না এখন লালপুর গ্রাম। বাড়ির ওপরে আকাশের সব সাদা মেঘ যেন গ্রামের শোকের মাতমে শরীক হয়েছে। চোখের পানি গলে পড়ছে ও ঘরের আমিনা, ওয়ারিস মিয়ার ভাতিজা রফিক মিয়াসহ শিশু-কিশোরদের।
বাড়িতে লাশ পৌঁছায়নি। প্রিয় মুখগুলো দেখতে তাই হাসপাতালে ছুটেছেন কেউ। কেউ ছুটে চলেন দক্ষিণ সুরমা থানায়। যেখানে সারি বেঁধে রাখা আছে ১২ জনের মৃতদেহ।
সকাল ৮টার দিকে ওয়ারিস আলীর ছোট ভাই স্ত্রী রাজিয়া বেগমের লাশ দেখে মুখের কথা হারিয়ে ফেলেন। কয়েকজন তাকে ধরে রাখেন। লাশঘরে একা স্ত্রীকে রেখে যেতে চাচ্ছিলেন না তিনি।
এরই মধ্যে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এলাকার লোকজন। এ সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে টানা ৩ ঘণ্টা ধরে অবরোধ করে রাখেন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। বন্ধ হয়ে যায় ওই সড়কে যান চলাচল। পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের লোক ছুটে যান ঘটনাস্থলে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রশাসনের কাছ থেকে দ্রæত এই সড়কের অতিরিক্ত গতির গাড়ি নিয়ন্ত্রণসহ দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে অবরোধ প্রত্যাহার করেন এলাকাবাসী।
সিলেটের পুলিশ কমিশনার অমূল্য ভূষণ বড়ুয়া ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, ‘‘দুর্ঘটনা রাস্তার যে পাশে ঘটেছে তা দেখে এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা গেল, তাতে বাসটি চলছিল ‘রং সাইড’ দিয়ে। আমার ধারণা, চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যাত্রীরাও বলেছেন যে, তিনি (চালক) খুব ভালোভাবে চালাচ্ছিলেন না।’’
নিহতদের আত্মীয় না হলেও বিক্ষুব্ধ লোকজনেরা বলছেন ‘‘এই সড়কে আর কতো মৃত্যুর মিছিল দেখবো আমরা। মাত্র ৫ মাস আগে প্রায় একই স্থানে একই রকম দিন শুক্রবার একই সময়ে এভাবে নিহত হয়েছিলেন সিলেটের রাজনীতির দিকপাল জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীম। তার সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন সিলেটগামী ওই বাসের আরো ৭ যাত্রী। আহত হন তার স্ত্রী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সভাপতি নাজনীন হোসেন এবং তাদের মেয়ে সেজীনাসহ অন্তত ১৫ জন।’’
এ দুর্বহ শোক আর অপূরণীয় ক্ষতি কোনো দিন পোষাবে। কোনো ভাবেই তাই এ মৃত্যুর মিছিলকে মেনে নিতে পারছেন না ওয়ারিস মিয়ার আত্মীয়-স্বজনরা। এলাকাবাসীও শোকার্ত, এতোগুলো লাশ, এতো শোক আর কত?
তাদের প্রশ্ন, সড়কে দানব যখন বেপরোয়া, পুলিশ তখন কোথায় থাকে? এর নিয়ন্ত্রণে আইনই বা কোথায়? এ প্রশ্নের জবাব নেই ঢাকা-সিলেট মহাড়কে ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলা যাত্রীদের কাছেও।
একটাই শুধু উত্তর, কয়েক দিন পর পর মৃত্যুর মিছিল। আর এ মিছিলের সহযাত্রী হচ্ছেন নিরীহ লোকজন।
বাংলাদেশ সময়: ১৯১১ ঘণ্টা, অক্টোবর ০৫, ২০১২
এসএ/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর