 |
‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটা অমোঘ উচ্চারণ দিয়ে, ‘প্রকৃতির সাথে লড়াই চলে না, সমঝোতা চলে। তাও যদি প্রকৃতির সম্মতি থাকে।’ এ দুর্লঙ্ঘ্যতা পুরো উপন্যাসকে ঘিরে আছে। প্রথমত শিরোনামে। আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে গল্পে ঢোকার আগেই, যে দীর্ঘশ্বাসেরা মাছ, বা শৈবাল বা দখলিস্বত্বে পরাস্ত মানুষের শবদেহের মতো হাওরের জলে ভাসে, ভেসে থাকে দৃশ্যমান হয়ে স্থানীয় নিস্পৃহতা ও নাগরিক মনোবীক্ষায় উপেক্ষিত হওয়ার জন্য। উপন্যাসিক মাসউদুল হক হাওরকে এঁকেছেন, এর জনপদকে সেঁজা-র ল্যান্ডস্কেপের মতো দৃশ্যায়িত করেছেন প্রায় অতিরিক্ত কোন রং ব্যবহার না করেই। উপন্যাসিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লেখাকে ঋদ্ধ করেছে; কিন্তু উপন্যাসিকের ব্যক্তিত্ব রচনায় ছায়া ফেলেনি। এ নিরপেক্ষতা প্রশংসনীয়। এবং এর প্রয়োজন ছিল। বিশেষতঃ নাগরিক জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাপ্রবাহের প্রায় বাইরের একটা জনপদকে তথ্যের সাযুজ্য ও মানবিক মমতায় উপস্থাপন করার প্রয়াসে। এ জনপদে ‘ভৌগলিক দুরত্ব বিচারে দুর্গমতার ধারণা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’ এমনকি উপজেলার কর্তাব্যক্তির জন্যও জেলা সদরের সভার অবস্থান আটচল্লিশ ঘন্টার দুরত্বে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এখানে মানুষ টিকে থাকে প্রকৃতির অনুমতিতে সাধ্যাতীত সমঝোতার চেষ্টায় ‘বানরের গলায় নিজ দায়িত্বে ঝুলে থাকা বানরশাবকের মতো’। এবং দুর্গমতা আরো আছে। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সুবিধার অভাব প্রান্তিক মানুষগুলোকে ঠেলে দেয় দাদন ব্যবসায়ীর হাতে, আমরা দেখি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা এ দুর্গমতার সুযোগে নিজেও সুবিধাভোগী হয়ে যান এবং স্থানীয় সুদখোর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি প্রায় অনায়াসেই কৃষি ঋণকে অগম্য করে তোলেন। মানুষগুলো তবু লেগে থাকে, মধু প্রকোষ্ঠে আটকে পড়া নির্বোধ পতঙ্গের মতো। উল্লম্ব বাজার ব্যবস্থা কিছুতেই বিক্রয়লব্ধ শ্রমের সঠিক মূল্য পেতে দেয় না। বাঁধা-কে আরো দুর্লঙ্ঘ্য করে তোলে যুগব্যাপী গড়ে ওঠা সামাজিক অসাম্যতা, মানব-উন্নয়নের মূলগত প্রতিষ্ঠানের দারিদ্র্য। আমরা দেখতে পাই, যেখানে অন্ন সংস্থানই সবচে বড় যুদ্ধ, সেখানে ‘শিক্ষা সম্ভবত অপ্রয়োজনীয়’। ‘মাইমল’, ‘আবাদী’, ‘গাইন’ এরকম বহুধা বিভক্ত সামাজিক ব্যবস্থায় প্রকৃতির খেয়ালেই ‘এক একটা গ্রাম যেন এক-একটি ডোবায় আটকে থেকে বংশবৃদ্ধি করা কচুরিপানার স্তুপ।’ এ দিকচিহ্নহীন অন্ধকারে জলের অধিকার তাই মাছেদের জন্য প্রয়োজনীয়। মানুষের জন্যও তা ক্ষমতার প্রধান নিয়ামক। হাওরের ‘ওয়াটার লর্ড’দের জন্য ‘এক একটা বিল যেন এক একজন ইজারাদারের জমিদারী’, জীবন থাকতে তা হাতছাড়া হওয়ার নয়। তবে জীবনের সংজ্ঞাও বদলেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় টাকার নিয়ন্ত্রণে রাজনীতি, এবং রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে জলমহাল ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক কাঠামো হাওর অঞ্চলে জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুক্তিসঙ্গতভাবেই পেশীশক্তি ও আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়, রাজনৈতিক আশির্বাদের পাশাপাশি। তবে প্রতিবাদও হয়। সম্পদের অধিকার যেখানে সুসংজ্ঞায়িত নয়, অসাম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন সেখানে ক্ষীণকায় হতে বাধ্য। কৃষকের ধানি জমি বর্ষা এলে জলমহাল, তাতে তখন কৃষক নয়, অধিকার জলমহাল অধিকারীর। এর বিরুদ্ধে উচ্চারিত ভাসান পানি আন্দোলন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় নি। পায়নি বলিষ্ঠ আদর্শিক নেতৃত্বও। অথচ এর বিপরীতে সামন্তবাদের শক্তি প্রায় অপ্রতিরোধ্য।
সামন্তবাদের শক্তির জায়গাটা সুতরাং বুঝতে হবে। উপন্যাসিক সূচনাতেই এর ধারণা দিয়েছেন। হাওর অঞ্চলে বেঁচে থাকার কিছু রসদের প্রাচুর্য আছে, সহজলভ্যতা নেই। জীবিকাভিত্তিক সামাজিক স্তরবিন্যাস এ সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহার দুঃসাধ্য করে তুলেছে। ভৌগলিক দুর্গমতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন প্রয়োগ সীমিত, আইনের কাঠামোয় নূন্যতম সেবা পাওয়ার অধিকারও অনুপস্থিত। বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন যে হাওর তার প্রায় পুরোটাই বিভিন্ন ভাগে কারো না কারো দখলে। এই Socio-Ecological System-এ শস্য বুনে ফসল তোলার সামর্থ প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তায় দোল খায়। কিন্তু মৎস্য আহরণ নিশ্চিত, যদি স্তরভিত্তিক সামাজিক বুনট তার অনুমোদন দেয়। প্রক্রিয়াটি খাদ্যশৃঙ্খলের শিকারী-শিকার সম্পর্কের নিবিড় পরিচর্যায় রচিত। শিকারী ও শিকার জায়গাও বদলায়। প্রায়শঃই।
উঁচুমানের চলচ্চিত্রে সুদক্ষ ‘মনটেজ’ এর ব্যবহার চোখে পড়ে। লেখকের এ দক্ষতাটি সহজাত বলেই মনে হয়। তিনি গল্প বলেছেন এবং গল্পের ক্যানভাসটি যথেষ্টই বড়। তাতে ‘কোড়া শিকার’ এর আভিজাত্য থেকে ফসল তোলার সময় হাজং রমণীদের গান, প্রাচীন ‘হিরালি রীতি’ –তে ফসল রক্ষার অযৌক্তিক প্রচেষ্টা, অসম্পূর্ণ নবজাতকের জন্ম ও মাতৃ-মৃত্যু, জলমহাল বন্দোবস্ত নীতিমালার প্রায়োগিক বাস্তবতা এবং স্থানীয় জীবনাচরণ ও এর সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় না নিয়ে প্রণীত আন্তর্জাতিক নীতি-র অসাড়তা পাঠককে গভীরতর বিশ্লেষণে মনোযোগী করবে।
উপন্যাসের মরবিড বাস্তবতায় হেমিংওয়ে-র ‘বুড়ো লোকটা’ কখনো আফাজ মাস্টার, কখনো বা তার প্রিয় ছাত্র বাতেন, কখনো আবার ষাঁড়ের লড়াই দেখতে আসা নাম না জানা অনেক লোক। যুদ্ধের কোন নাম নেই। যোদ্ধাও তাই সর্বনাম। তবে কুরুক্ষেত্রটা চেনা দরকারী। না দেখা নগরায়নের রসদ যোগানদার বারকি শ্রমিকরা আসলে জানে না যুদ্ধটা কার বিরুদ্ধে। আফাজ মাস্টারের প্রিয় মেধাবী ছাত্রটিও ব্যতিক্রম নয়।
লেখক হেমিংওয়ের নৈতিক বিশ্বাসের সাথে কাঠামোগত পরামর্শ (‘হিমশৈল নীতি’) নিলে আরো ভালো করতেন। বইতে মুদ্রণ প্রমাদ নেই বললেই চলে। তথ্যপ্রাচুর্য ও পর্যবেক্ষণের গভীরতায় এটি গবেষণাপত্রও হতে পারতো। অন্যপথে গিয়ে লেখক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সার্বিক পরিবেশনে প্রকাশক ‘ঘাস ফুল নদী’ ধন্যবাদার্হ।
বাংলাদেশ সময়: ১৫১০ ঘণ্টা, ১৪ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস