১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শুক্রবার মে ২৪, ২০১৩ ১০:৪৭ এএম BDST banglanew24
28 May 2012   06:22:28 PM   Monday BdST
E-mail this

কার্লোস ফুয়েন্তেস এর উপন্যাস

আউরা [পর্ব-২]


অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আউরা [পর্ব-২] কার্লোস ফুয়েন্তেস এর উপন্যাস

আউরা [পর্ব-১]

চলে গেলেন লাতিন আমেরিকান খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস। ১৫ মে দিনগত রাতে এই মেক্সিকান কথাসাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ফুয়েন্তেস ছিলেন আধুনিক স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের মহান রূপকারদের একজন।

ফুয়েন্তেস জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালে পানামায়। তাঁর প্রথম বই ছিল একটি ছোটগল্প সংকলন, প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। প্রথম উপন্যাস Where the Air is Clear প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ফুয়েন্তেসের ২০টির বেশি উপন্যাস,  বেশ কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন ও নাটক। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে— The Death of Artemio Cruz, The Old Gringo, The Crystal Frontier, Aura প্রভৃতি।

ফুয়েন্তেস বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারই পেয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সারভান্তেস সাহিত্য পুরস্কার। এছাড়া বহুবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য উঠে এসেছে তার নাম। কিন্তু নোবেল পুরস্কার তার ভাগ্যে জোটেনি।

ফুয়েন্তেসের ‘আউরা’ বেরিয়েছিলো ১৯৬২ সালে; আতঙ্ক, বিভীষিকা, সৌন্দর্য্য আর সংরাগে আশ্চর্যভাবে ভরপুর এই গা ছমছমে উপন্যাসটি রচনাকৌশলেও স্মরণীয়। একাধিকবার কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর লেখায় মধ্যম পুরুষের জবানি ব্যবহার করেছেন, “সেকেন্ড পারসন ন্যারেটিভ” সামলানো যে কেমন কঠিন, অথচ সামলে ওঠবার পর তার আবেদন কোনোভাবেই কমে না।

বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ফুয়েন্তেসের সম্মানে প্রকাশ করা হলো তার উপন্যাস ‘আউরা’। অনুবাদ করেছেন কলকাতার বিখ্যাত অনুবাদক— মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়




http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2012May/aura20120528183026.jpgবুড়ি মহিলা কাংস্য কণ্ঠে হেসে ওঠেন, তোমায় বলেন যে তোমার বদান্যতার জন্যে তিনি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ, আর এই তরুণী এখন তোমায় নিয়ে গিয়ে তোমার ঘরটা দেখিয়ে দেবে। তুমি শুধু ভাবছো তোমার চার হাজার পেসো মাইনের কথা, আরো ভাবছো কাজটা নিশ্চয়ই ভালো লাগবে তোমার কারণ তুমি তো এমন কাজই ভালোবাসো যার জন্যে দরকার হয় তন্নতন্ন ক’রে খোঁজখবর, গবেষণা, যার জন্যে তোমার শারীরিক কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না— যেহেতু সেজন্যে তোমায় এখান থেকে ওখানে ঘুড়ে বেড়াতে হয় না, অথবা এমন-সব লোকের সঙ্গে গিয়ে দেখা করতে হয় না যাদের সঙ্গে আদপেই তুমি দেখা করতে চাও না। ঘর থেকে তরুণীটির পেছন-পেছন বেরুতে-বেরুতে তুমি এই কথাই ভেবেছো, আর তারপরই আবিষ্কার করেছো তরুণীটিকে অনুসরণ করতে হবে তোমার সজাগ কান দিয়ে, চোখ দিয়ে নয়, কারণ তুমি অনুসরণ করছো তার ঘাঘরার সরসর, তার তাফ্তার চেলির খশখশ, আর তুমি এখুনি আবার উদ্গ্রীব হ’য়ে উঠেছো আবার তার ওই চোখ দুটির ভেতর তাকাতে। তুমি ওই শব্দের পেছন-পেছন সিঁড়ি বেয়ে ওঠো অন্ধকারে, আর তুমি এখনও এই আবছায়ায় ঠিক অভ্যস্ত হ’য়ে ওঠোনি। তোমার মনে প’ড়ে যায় এখন নিশ্চয়ই বিকেল ছ’টা বাজে, আর যখন আউরা তোমার শোবার ঘরের দরজা খুলে দেয় আলোর বন্যা তোমায় চমকে দেয়— এই দরজাটারও কোনো খিল-টিল নেই— আর একপাশে স’রে দাঁড়িয়ে আউরা তোমায় বলে : ‘এটাই আপনার ঘর। ঘণ্টাখানেক বাদে, আমরা আশা করবো, আপনি রাতের খাবার খেতে আসবেন।’

সে চ’লে যায়, তাফ্তার সেই একই ক্ষীণ খশখশ করে, আর তুমি ফের তার মুখটা তাকিয়ে দেখতে পারনি।
তুমি বন্ধ ক’রে দাও দরজা, মুখ তুলে তাকাও স্কাইলাইটের দিকে, সেটাই ছাদ। তুমি মৃদু-মৃদু হাসো যখন আবিষ্কার করো কী এমন সন্ধ্যের আলো যা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।এরপর তুমি তার সঙ্গে বাড়ির বাকি অংশের অন্ধকারের তুলনা করো, আর তারপর ফের আপন মনে হেসে ওঠো যখন সোনার কাজ করা ধাতুর পালঙ্কের ওপর জাজিমটাকে একবার পরখ ক’রে দ্যাখো। তারপর তুমি সারা ঘরটাই ভালো ক’রে খেয়াল ক’রে দ্যাখো : লাল একটা পশমি ফরাশ, দেয়ালকাগজগুলো জলপাই রঙা, সোনারঙা। একটা আরাম কেদারা লাল মখমলে মোড়া, আখরোট কাঠের একটা পুরোনো ডেস্ক যার ওপরটা সবুজ চামড়ার, একটা প্রাচীন র্আগাঁদ বাতি যার নরম আলোয় ব’সে-ব’সে তুমি রাতের বেলায় তোমার গবেষণা চালাতে পারো, আর ঠিক ডেস্কের ওপরটাতেই বইয়ের তাক, তোমার হাতের নাগালের মধ্যেই। তুমি হেঁটে চ’লে যাও অন্য দরজাটায়, আর ঠেলতেই দরজাটা খুলে গিয়ে তোমাকে আবিষ্কার করতে দেয় এক পুরোনো ধরনের বাথরুম : চারটে পায়ার ওপর দাঁড় করানো একটা বাথটব, তার গায়ের চিনেমাটিতে আঁকা ছোটো-ছোটো ফুল; নীল রঙের একটা হাত ধোবার গামলা, এটাও চিনেমাটির; আর একটা পুরোনো ধরনের কমোড; কাপড় রাখার আলমারিটার দরজায় লাগানো ডিমের ছাঁচের আয়নাটায় তুমি নিজের দিকে তাকাও— ওই ওয়াড্রোবটাও আখরোট কাঠেরই— বাথরুমের বারান্দায়। তুমি নড়াও তোমার রোমশ ভুরু আর চওড়া পুরু ঠোঁট, আর তোমার নিশ্বাস আয়নাটার গায়ে কুয়াশার ছোপ মাখিয়ে দেয়। তুমি তোমার কালো চোখ দুটি বোজো, আর যখন তুমি ফের তোমার চোখ খোলো ততক্ষণে আয়নার উপরিতল সাফ হ’য়ে গিয়েছে। তুমি দম বন্ধ ক’রে থাকা থামাও, তোমার কালো শিথিল চুলে হাত বোলাও; তুমি ছুঁয়ে দ্যাখো তোমার ছিপছিপে পার্শ্বমুখ, তোমার কৃশ মেদবিহীন গাল; আর যখন তোমার শ্বাস প’ড়ে-প’ড়ে আয়নায় তোমার মুখটা আবার ঢাকা প’ড়ে গেলো, তুমি তখন তার নাম আওড়ালে আবার : ‘আউরা।’

বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে-শুয়ে দুটো সিগারেট টানবার পর, তুমি উঠে পড়ো, গায়ে চড়াও তোমার জ্যাকেট আর চুলে চিরুনি দাও। তুমি ঠেলে দরজাটা খোলো, মনে ক’রে রাখবার চেষ্টা করো কোন পথ ধ’রে ওপরে উঠে এসেছিলে। দরজাটা খুলেই রাখতে চাচ্ছিলে যাতে ওই অর্গাদ বাতির আলো তোমায় পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু সেটা মোটেই সম্ভব হ’লো না, কারণ দরজার স্প্রিংগুলো তোমার পেছনেই তক্ষুনি দরজা বন্ধ ক’রে দিয়েছে। তুমি হয়তো দরজাটা নিয়ে খেললে মজাই পেতে— টেনে খুলতে আর সেটা বন্ধ হ’য়ে যেতো। নিজে-নিজেই, বারে-বারে। তুমি অবশ্য তা করো না। তুমি বাতিটা হাতে ক’রে তোমার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারো। তুমি তাও করো না। এই বাড়িটা সবসময়েই ডুবে থাকবে অন্ধকারে, আর তোমাকে শুধু ছুঁয়ে-ছুঁয়েই সব জেনে নিতে হবে, স্পর্শের ডগায় নিয়ে আসতে হবে জ্ঞানকে। কোনো অন্ধের মতো হাতড়ে-হাতড়ে টলোমলো ক’রে তুমি তোমার রাস্তা খোঁজো, তোমার দুই হাত দুই দিকে ছড়ানো, দেয়াল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে টের পাবার চেষ্টা করছো রাস্তাটা, আর সেভাবেই দৈবাৎ তুমি বোতাম টিপে ফ্যালো, আলো জ্ব’লে ওঠে। থমকে থেমে দাঁড়াও তুমি, সেই লম্বা ফাঁকা হলঘরটার ঝলমলে মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে তুমি চোখ পিটপিট করো। হলঘরটার শেষ প্রান্তে তুমি দেখতে পেলে রেলিঙের খুঁটিগুলি আর ওই ঘোরানো সিঁড়ি।

নিচে নেমে যেতে-যেতে তুমি ধাপগুলি গোনো : সেনিওরা ইয়োরেন্তের বাড়ির আরেকটা দপ্তর সম্পর্কে তোমায় জানতে হবে, চট ক’রে। যেই তুমি দেখতে পেলে খরগোশটার লালচে চোখ দুটো, তুমি এক পা পিছিয়ে এসেছিলে, সে অবশ্যি তোমার দিকে পেছন ফিরে লাফিয়ে-লাফিয়ে চ’লে গেছে।

নিচের ঢাকা বারান্দায় থেমে অপেক্ষা করার মতো সময় তোমার হাতে ছিলো না কারণ একটা আদ্ধেক খোলা রঙিন কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আউরা তোমার অপেক্ষা করছিলো, তার হাতে ছিলো একটা ঝাড়লণ্ঠন। তুমি তার দিকে হেঁটে চ’লে আসো, তোমার মুখে হাসি, কিন্তু তুমি থমকে যাও, যখন তোমার কানে আসে একসাথে অনেকগুলো বেড়ালের করুণ মিঞাও-মিঞাও— হ্যাঁ, তুমি থমকে যাও, উৎকর্ণ, আউরার ঠিক পাশেই, শুধু-এটাই নিশ্চিতভাবে জেনে নিতে যে সত্যি এগুলো বেড়ালেরই ডাক— তারপর তার পেছন-পেছন এসে ঢোকো বৈঠকখানায়।

‘ওগুলো সব বেড়াল,’ আউরা তোমায় বলে। ‘শহরের এদিকটায় রাশি-রাশি ইঁদুর গিজগিজ করছে।’
তুমি বৈঠকখানার মধ্য দিয়ে যাও: মিইয়ে-যাওয়া রেশমি কাপড়ে আসবাবগুলো সাজানো; সামনে কাচ লাগানো আলমারি, তাতে সাজানো আছে চিনেমাটির মূর্তি, সুরেলা সব ঘড়ি, পদকভূষণ, কাচের গোলক; গালিচাগুলোর ওপর পারসিক নকশা; গ্রামের দৃশ্য আঁকা ছবি; সবুজ মখমলের পর্দা। আউরা সেজে আছে সবুজ পোশাকে।
‘আপনার ঘরটা। স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা তো?’
‘হ্যাঁ, তবে আমাকে আমার জিনিসপত্তর সব গিয়ে নিয়ে আসতে হবে...’
‘তার আর দরকার হবে না। সেগুলো আনতে এরই মধ্যে এ-বাড়ির ভৃত্য চ’লে গিয়েছে।’
‘খামকা এই ঝামেলা আপনাদের না-পোহালেও হ’তো।’
তুমি তাকে অনুসরণ ক’রে চ’লে আসো খাবার ঘরে। আউরা টেবিলের ঠিক মাঝ-খানটায় ঝাড়বাতিটা নামিয়ে রাখে। ঘরটা কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে ভেজা-ভেজা, ঠাণ্ডা। চার দেয়ালেই কালো কাঠের খুপি বসানো, গথিক কেতায় কাঠের গায়ে নকশা কাটা, সরল কাঠের গায়ে খাঁজ কেটে খিলেন বসানো, সঙ্গে বড়-বড় গোল-গোল গোলাপ আঁকা। বেড়ালগুলো তাদের মিঞাও থামিয়েছে এতক্ষণে। ব’সে প’ড়ে তুমি খেয়াল ক’রে দ্যাখো যে চারটে জায়গা সাজিয়ে দেয়া হয়েছে। দুটো মস্ত, ঢাকা রেকাবি আর একটা পুরনো মলিন-দেখতে বোতল।
আউরা একটি রেকাবির ওপর থেকে ঢাকনা সরায়। তোমার শ্বাসের সঙ্গে তোমার ভেতরে এসে ঢোকে মেটে আর পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ, তারপর তুমি পুরোনো বোতলটা তুলে নাও, স্ফটিকের পানপাত্রগুলো ভ’রে দাও ওই ভারি লাল তরলে। শুধু কৌতূহলবশেই তুমি মদিরা বোতলের গায়ের লেবেলটা প’ড়ে দেখতে চেয়েছিলে, কিন্তু নোংরা লেগে-লেগে লেবেলটা আর পড়াই যায় না, ধুলোয়  যেন ঢাকাই প’ড়ে গেছে। অন্য রেকাবিটা থেকে আউরা তোমার পিরিচে তুলে দেয় কতগুলো আস্ত টোম্যাটো, সরাসরি ঝাঁঝরিতে রেখে সেঁকা।
‘ক্ষমা করবেন,’ তুমি ব’লে ওঠো, বাড়তি দুটি আসনের দিকে তাকিয়ে, দুটো খালি চেয়ার, সামনে পিরিচ, ‘তবে কি আপনি কি আর-কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?’
আউরা তার পিরিচে টোম্যাটোগুলো দিয়েই চলে। ‘না। সেনিওরা কোন্সুয়েলো আজ রাতে একটু অসুস্থ বোধ করছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে খেতে বসবেন না।’
‘সেনিওরা কোন্সুয়েলো? আপনার পিশি?’
‘হ্যাঁ। খাবার পরে আপনি গিয়ে যদি তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করেন তো তিনি ভারি খুশি হবেন।’

তুমি চুপচাপ খেতে থাকো। সেই ঘন ভারি সুরাতে চুমুক দাও, মাঝে-মাঝে তোমার দৃষ্টি সরিয়ে আনো যাতে আউরা তোমার ওই মুগ্ধ দৃষ্টি ধ’রে না-ফ্যালে, যে-মোহিত দৃষ্টি তুমি চেষ্টা ক’রেও সামলাতে পারো না। তুমি তোমার মনের মধ্যে মেয়েটির শরীরের সর্বাঙ্গের একটা ছাঁচ তুলে নিতে চাও। যেই তুমি চোখ সরিয়ে নাও, অমনি সব তুমি ভুলে মেরে দাও আবার, আর এক অপ্রতিরোধ্য ঔৎসুক্য আবারও তোমায় তার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। যেমন সবসময় দেখেছো, সে তার চোখ নামিয়ে রেখেছে। যখন তুমি তোমার জ্যাকেটের পকেটে সিগারেটের প্যাকেটের জন্যে হাতড়াচ্ছো তোমার হাত হঠাৎ ছোঁয় সেই মস্ত চাবিটা, আর মনে প’ড়ে যায় অমনি, আর আউরাকে তুমি বলো : ‘ওহ্! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলুম যে আমার ডেস্কের একটা দেরাজ চাবি লাগানো আছে। তাতে আমার সব কাগজপত্র আছে।’
আর সে প্রায় ফিশফিশ ক’রে বলে : ‘তাহ’লে আপনি বেরুতে চান এখন?’ সে বলে, প্রায় তিরস্কারেরই ভঙ্গিতে।
তুমি ভারি অস্বস্তি বোধ করো, আর তোমার এক আঙুল থেকে চাবিটা ঝুলছে, তুমি তোমার হাত বাড়িয়ে দাও তার দিকে।
‘সে অবশ্য তেমন জরুরি নয়। কাজের লোক কাল সেসব কাগজের জন্যে যেতে পারে।’
কিন্তু সে তোমার স্পর্শ এড়িয়ে যায়, নিজের হাত দুটি সে কোলে ফেলে রেখেছে। অবশেষে সে চোখ তুলে তাকায়, আর আবারও একবার তুমি তোমার বোধবুদ্ধিকে প্রশ্ন ক’রে বসো, তোমার এই বিমূঢ় দশার জন্যে তুমি দায়ী ক’রে বসো ওই লাল মদকে, কারণ ওই উজ্জ্বল স্বচ্ছ সবুজ চোখ দুটি তোমার মাথা ঘুরিয়ে দেয়, আর আউরা উঠে দাঁড়াবার পর তুমিও উঠে পড়ো, তুমি তোমার হাতটা বুলিয়ে নাও গথিক চেয়ারটার কাঠের গায়ে, তার নগ্ন কাঁধ কিংবা তার নিশ্চল মাথাটিকে স্পর্শ করবার স্পর্ধা বা সাহস তোমার হয় না।

তুমি নিজেকে সংযত ক’রে রাখবার জন্যে চেষ্টা করো, আউরার কাছ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে তুমি তোমার পেছনের দরজার ওপাশে যে অস্ফুট আওয়াজ হচ্ছে সেটা শোনবার চেষ্টা করো— সে নিশ্চয়ই রসুইখানাটার দিকে গেছে কিংবা হয়তো ঘরটার দুই ভিন্ন অংশকে আলাদা ক’রে রাখবার দায়িত্বই তার : ঝাড়বাতিটার কাছে যেখানে সংহত আলোর একটা বৃত্ত, যা ঝলমলে ক’রে রেখেছে টেবিলটা আর একদিকের নকশাকাটা দেয়াল, আর তার চারপাশ ঘিরে অন্ধকারের একটা বৃহত্তর বৃত্ত। শেষটায় তুমি তার কাছে যাবার সাহস সঞ্চয় ক’রে নাও, তার হাতটা তোমার হাতের মধ্যে নিয়ে সেটা খুলে তার মসৃণ করতলে প্রতীক হিসেবে অর্পণ ক’রে দাও তোমার চাবির বলয়।
আউরা তার মুঠো বন্ধ ক’রে তোমার দিকে তাকায়, আর অস্ফুট স্বরে বলে, ‘ধন্যবাদ।’ তারপর সে উঠে দাঁড়ায় আর দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
তুমি ধপ ক’রে ব’সে পড়ো আউরার চেয়ারে, তোমার পা দুটো ছড়িয়ে, একটা সিগারেট ধরাও; এমন-একটা সুখের অনুভূতি হয় তোমার, যা তুমি আগে কখনও অনুভব করোনি। এমন-এক অনুভূতি যেটা তুমি জানতে যে তোমারই অংশ অথচ শুধু এখনই তাকে তুমি পুরোপুরি অনুভব করছো, তাকে ভেতর থেকে বাইরে বার ক’রে এনে তুমি মুক্ত ক’রে দিয়েছো এবার, কারণ এবার তুমি জানো যে তার একটা উত্তর পাওয়া যাবে, সেটা আদপেই হারিয়ে যাবে না... আর সেনিওরা কোন্সুয়েলো তো তোমারই অপেক্ষা ক’রে আছেন যাতে রাতের খাবার শেষ হ’লে তুমি...

তুমি খাবারঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসো, আর হাতে ঝাড়বাতিটা নিয়ে বৈঠকখানা আর হলঘরের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলো। যে প্রথম দরজার কাছে এসে তুমি পৌঁছোও, সেটাই ওই বৃদ্ধা মহিলার। তুমি তোমার আঙুলের গাঁট দিয়ে ঠোকো দরজাটা, কিন্তু কোনো উত্তরই আসে না। তুমি আবারও দরজায় টোকা দাও। তারপর ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খোলো কারণ তিনি তো তোমারই জন্যে অপেক্ষা ক’রে আছেন। তুমি সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকে পড়ো, সতর্ক, অস্ফুটস্বরে বলো : ‘সেনিওরা... সেনিওরা..’
তিনি তোমাকে শুনতেই পান না, কারণ তিনি তখন নতজানু হ’য়ে ব’সে আছেন সেই দেয়ালের সামনে যেখানে সব পূজার্চনার জিনিসগুলো সাজানো, তার দুই হাতের মুঠোয় বিশ্রাম নিচ্ছে তাঁর মাথা। তুমি একটু দূর থেকেই তাকিয়ে দ্যাখো তাঁকে : তিনি তাঁর রুক্ষ পশমি রাতকাপড় গায়ে সেখানে হাঁটু গেড়ে ব’সে আছেন, মাথাটা নুয়ে এসেছে তাঁর সরু কাঁধে; ভারি কৃশ, রোগা তিনি, প্রায় যেন শুকিয়েই গেছেন, যেন মধ্যযুগের কোনো ভাস্করমূর্তি; তাঁর পা দুটি কৃশ দুটি ছড়ির মতন, তারা শুধু ফুলে আছে রক্তের প্রদাহরোগে। যখন তুমি ভাবছো ওই রুক্ষ কর্কশ পশমে অনবরত ঘসা লাগছে তাঁর ত্বকের, তিনি আচমকা তাঁর মুঠো দুটি তোলেন, দুর্বলভাবে হাওয়ায় ঘুষি কষান, যেন তুমি পা টিপে-টিপে সন্তর্পণে তাঁর কাছে আসতে-আসতে যে-সব প্রতিমা বানিয়ে তুলছিলে তাদের সঙ্গেই লড়াই ক’রে চলেছেন : হেসুস ক্রিস্তো, মারিয়া, সান্ সেবাস্তিয়ান, সান্তা লুসিয়া, মুখ্যদেবদূত মিগেল, আর একটা পুরোনো পটের ওপর আঁকা ব্যঙ্গস্ফুরিত মুখের দানবগুলো, সেই শোক, সর্বনাশ আর ঘৃণাবিদ্বেষের দেবতত্ত্বের মূর্তিগুলোর মধ্যে ওই দানোগুলোই শুধু হাসিখুশি আর প্রফুল্ল, যেহেতু তারা তাদের বল্লমগুলো গেঁথে দিচ্ছে অভিশপ্তদের শরীরে, উপুড় ক’রে ঢেলে ফেলছে তপ্ত ধোঁয়া-ওঠা টগবগে জল ডেকচির পর ডেকচি তাদের ওপর, মেয়েদের ধর্ষণ করছে, মদ খেয়ে বেসামাল হ’য়ে পড়ছে, সন্তদের যে-সব জিনিস করবার স্বাধীনতা নেই, উপভোগ করছে সেই সমস্ত কর্ম বা অপকর্ম। তুমি সেই কেন্দ্রীয় চিত্রকল্পটির দিকে এগোও, যেটাকে ঘিরে আছে আমাদের শোকের দোলোরোসার চোখের জল, আমাদের ক্রুশবিদ্ধ প্রভুর দেহের রক্ত, শয়তান লুস্বেন-এর উল্লাস, মুখ্য দেবদূতের তীব্র রোষ। কোলাহলভর্তি বোতলে সযত্নে রাখা নাড়িভুড়িযকৃৎ, রুপোলি হৃদয়! সেনিওরা কোন্সুয়েলো, নতজানু ব’সে, তাঁর মুঠি পাকিয়ে ঘুষি কষিয়ে তাদের ভয় দেখাচ্ছেন, বিড়বিড় ক’রে তো-তো করে বলছেন কথাগুলো, তুমি আরো কাছে এসে যা-সব শুনতে পাও; ‘এসো, এসো, দেবধাম! গাব্রিয়েল, ফুঁ দাও তোমার শিঙায়! আহ্, জগৎ যে কত সময় নেয় মরতে!’

তিনি তাঁর বুক চাপড়াতে থাকেন, যতক্ষণ-না আছড়ে প’ড়ে যান এক প্রবল কাশির দমকে কাঁপতে-কাঁপতে ওই সব স্মৃতি আর মোমবাতির সামনে। তুমি তাঁর কনুই ধ’রে তাঁকে ওঠাও, আর যখন তুমি খুব সযত্নে নরম ক’রে ধ’রে-ধ’রে তাঁকে নিয়ে যাও তাঁর বিছানায় তুমি আশ্চর্য হ’য়ে যাও তাঁর একরত্তি দেহ দেখে— এত ছোটোখাটো! তিনি যেন বাচ্চা মেয়, প্রায় যেন কুঁকড়ে গেছেন, নুয়ে। তুমি বুঝে ফ্যালো তুমি সাহায্য না-করলে তাঁকে তাঁর বিছানায় ফিরে যেতে হ’তো হামাগুড়ি দিয়ে। তুমি তাঁকে ধ’রে শুইয়ে দাও ওই বিশাল বিছানায়, তারপর চাদর দিয়ে তাঁর শরীর ঢেকে দাও, অপেক্ষা করো কখন তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হ’য়ে আসে, আর ততক্ষণ তাঁর ওই পার্চমেন্টের মতো শীর্ণ গাল বেয়ে ঝ’রে পড়ে অঝোর ধারে অশ্রু।

‘ক্ষমা করবেন... ক্ষমা করবেন আমায়, সেনিওর মোন্তেরো। বুড়ি থুরথুরিদের তো... ভক্তির উল্লাস ছাড়া... আর-কিছুই বাকি থাকে না... অনুগ্রহ ক’রে আমার রুমালটা আমায় দিন তো!’
‘সেনিওরা আউরা আমায় বলেছিলেন যে...’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ঠিক। আমি একফোঁটাও সময় নষ্ট করতে চাইনি। আমাদের উচিত হবে যত শিগগির সম্ভব কাজ শুরু ক’রে দেয়া। ধন্যবাদ।’
‘আপনার একটু বিশ্রাম নেয়া উচিত।’
‘ধন্যবাদ।... এই-যে...’
বুড়ি তাঁর হাতটা তুলে নেন তাঁর জামার গলবন্ধের কাছে, বোতামগুলো খোলেন, মাথাটা নুইয়ে সেই খ’য়ে-যাওয়া-লাল ফিতেটা খুলে নেন, যাতে সেটা তিনি তোমার হাতে তুলে দিতে পারেন। ফিতেটা ভারি, কারণ তা থেকে ঝুলছে তামায় তৈরি একটা চাবি।
‘ওখানে, ওই কোণে... ওই তোরঙ্গটা খুলে নিন, তারপর ডানদিকের কাগজের তাড়াটা আমায় এনে দিন, ওই যেগুলো অন্য-সব কাগজের স্তুপের ওপরে আছে... ওগুলো একটা হলদে ফিতে দিয়ে বাঁধা।’
‘আমি ঠিক ভালো ক’রে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না...’
‘ও, হ্যাঁ... আসলে আমি তো অন্ধকারেই এত অভ্যস্ত হ’য়ে গেছি। আমার ডান দিকে... তোরঙ্গটার কাছে না-আসা অব্দি চলতে থাকুন। ওরা আমাদের চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়েছে, সেনিওর মোন্তেরো। ওরা আমাদের চারপাশে গ’ড়ে তুলেছে দেয়াল আর আলো আসার উপায় বন্ধ ক’রে দিয়েছে। ওরা চেয়েছিলো জোরজবরদস্তি ক’রে আমায় সবকিছু বিক্রি ক’রে ফেলতে বাধ্য করবে, কিন্তু কিছু বেচে দেবার আগে আমি বরং ম’রেই যাবো। এই বাড়িটা আমাদের জন্যে স্মৃতিতে স্মরণে ভর্তি হ’য়ে আছে। আমার মৃত্যুর আগে ওরা আমাকে এই বাড়ি থেকে বার ক’রে নিয়ে যেতে পারবে না। হ্যাঁ, ওটাই। ধন্যবাদ। আপনি এই অংশ থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। আমি আপনাকে অন্য অংশগুলো পরে দেবো। শুভরাত্রি, সেনিওর মোন্তেরো, বুয়েনোস নোচেস্। ধন্যবাদ, গ্রাসিয়াস। ওই যা : দেখুন, ঝাড়বাতিটা নিভে গিয়েছে। দরজার বাইরে নিয়ে গিয়ে সেটা জ্বেলে নেবেন, দোহাই। না, না, চাবিটা আপনি আপনার কাছেই রেখে দিতে পারেন। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।’
‘সেনিওরা, ওই কোণায়, একটা ইঁদুরের বাসা, গর্তের মধ্যে?’
‘ইঁদুর? আমি ওদিকটায় কখনও যাই না।’
‘বেড়ালগুলোকে আপনার এই ঘরেই এনে রাখা উচিত।’
‘বেড়াল? কোন্ বেড়াল? বুয়েনোস নোচেস্। শুভরাত্রি। আমি ঘুমুবো এবার। বড্ড ক্লান্ত লাগছে আমার।’
‘শুভরাত্রি। বুয়েনোস্ নোচেস্।’

[চলবে]

বি.দ্র : ১. ‘আউরা,’ ইংরেজিতে ‘অরা’ : সৌরভ ইত্যাদির সূক্ষ্ম বিকিরণ, সুরভিতরঙ্গ, সুবাসের হিল্লোল— দেহসৌরভ, অলৌকিক আভা। যদি কারও নাম হয়, স্ত্রীলিঙ্গে, হ’তে পারে : সুরভি সুবাসী।

২. লেখাটি প্রকাশ করা হলো ‘কাগজ প্রকাশনী’র সৌজন্যে।

বাংলাদেশ সময় ১৭৪০, মে ২৮, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান