 |
| ছবি: সোহেল সরওয়ার / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম : হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের স্মৃতিধন্য বন্দরনগর চট্টগ্রামে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে নাগরিক শোকসভা। মঞ্চের একদিকে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় হুমায়ূনের প্রতিকৃতি, অন্যদিকে বাঙালি কর্মবীরের জীবনের নানা গৌরবগাথা শুনে চোখ ছলছল করছিল হাজারো ভক্তের।
এ উপলক্ষে বৃষ্টিস্নাত বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন মুসলিম ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বসেছিল মুক্তিযোদ্ধা, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, শিল্পী, নাট্যজন, গবেষক, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতি কর্মীদের মিলনমেলা। কথামালা, স্মৃতিতর্পণ, কর্মকীর্তির মূল্যায়ন, শোক সংগীত আর হুমায়ূনের গান দিয়ে সাজানো ছিল অন্য রকম এ নাগরিক শোকসভা।
শোকসভা থেকে প্রয়াত হুমায়ূনকে নিয়ে সাম্প্রতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ, তার সৃষ্টিকর্ম সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সংরক্ষণ, তার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক মানের ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, কলেজিয়েট স্কুলের সড়কটিকে হুমায়ূনের নামে নামকরণের দাবি জানানো হয়।
শুক্রবার বিকেল সোয়া ৩টায় ‘পৃথিবীর মানুষেরা তোমরা ভালো থেকো, সুখে থেকো, আমি ছুটে যাচ্ছি আলোর দিকে..’ শীর্ষক এ সভার কার্যক্রম শুরু হয় শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে। প্রতিকৃতিতে প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন নাগরিক শোকসভা কমিটির আহ্বায়ক ও খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন।
এরপর একে একে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, উত্তরাধিকার, অরিন্দম, প্রমা, সংগীত ভবন, উচ্চারক, তির্যক, মোপলেস, মঞ্চ শিল্পী সংস্থা, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, গণায়ন, নির্মাণ আবৃত্তি অঙ্গন, লোক থিয়েটার, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, শেখ রাসেল শিশু-কিশোর মেলা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, মুকুল মেলা, সংগীত সমন্বয় পরিষদ, অনন্য সাংস্কৃতিক সংসদসহ অর্ধশতাধিক সংস্থা-সংগঠনের নেতারা।
খ্যাতিমান ভৌতবিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলাম হুমায়ূন আহমেদের নানা উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাশক্তির কথা তুলে ধরে বলেন, তরুণ প্রজন্মকে বই পাঠে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের নাটক-চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্য মাধ্যমেও টেনে এনেছেন। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, বাংলার মানুষ খুবই কম লোককে হুমায়ূনের মতো ভালোবেসেছিলেন। যা অভূতপূর্ব, অবিস্মরণীয়। তিনি এ অবস্থান দখল করেছিলেন অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। মানুষের জীবন ও প্রকৃতির মর্মমূলে ঢুকে সেগুলো পাঠক, দর্শক ও শ্রোতার কাছে এমনভাবে নিয়ে এসেছিলেন, তা ছিল অনন্য।
তিনি বলেন, হুমায়ূনের গল্পবলার ক্ষমতা অসাধারণ। কোটি মানুষের মধ্যে ১ জন বা ২ জনের এ ক্ষমতা থাকে। তিনি অমর স্রষ্টা, যিনি বাঙালির চিত্ত জয় করেছিলেন। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন। সত্যিকার অর্থে তিনি আলোর দিকে ছুটছেন, আমাদেরও আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
হুমায়ূন আহমেদকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন উল্লেখ করে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক বলেন, হুমায়ূন ছিলেন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। তিনি দীর্ঘ ৪০ বছরে ৩০০ বই লিখেছেন এটা সাংঘাতিক ব্যাপার। বাংলাদেশ হওয়ার পর বিদেশি সাহিত্য পড়ার পরিবর্তে পাঠককে দেশি বই পাঠে মনোযোগী করেছিলেন তিনি।
এমএ মালেক হুমায়ূনের ‘হিমু’ বইয়ের মুখবন্ধটি আবেগস্পর্শী ভাষায় পড়ে শোনান।
কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে জসীম উদ্দীনের ‘কবর’-এ হুমায়ূনের নাতির ভূমিকায় অভিনয়ের স্মৃতি তর্পণ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক বলেন, হুমায়ূনের শক্তিকে বিভেদের পথে নয় ঐক্যের পথে নবজাগরণের পথে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বন্ধ্যা রাজনৈতিক সময়ে তরুণদের বইমনস্ক করতে পেরেছিলেন।
তিনি বলেন, শরৎচন্দ্রকে ছাপিয়ে গেছে হুমায়ূন। নিজস্ব একটি পরিমল গড়ে তুলে তিনি বাঙালির হৃদয় জয় করেছিলেন। তার রচনায় শৈশবের পঠন-পাঠনের গভীর ছাপ ছিল। পরবর্তী জীবনে সত্যজিৎ রায় দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন।
চট্টগ্রাম সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক পরিষদের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম নিপু বলেন, জীবিত হুমায়ূনের চেয়ে প্রয়াত হুমায়ূন অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি টেলিভিশন-সিনেমার দর্শকও সৃষ্টি করেছেন।
হুমায়ূনকে হ্যামিলনের বংশীবাদক উল্লেখ করে দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের নগর সম্পাদক এম নাসিরুল হক বলেন, বইবিমুখ বাঙালিকে তিনি বইমুখী করেছিলেন। তিনি যে অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন তার সদ্ব্যবহারে এগিয়ে আসতে হবে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও কবি রাশেদ রউফ বলেন, হুমায়ূন ছিলেন প্রকৃতি প্রেমী। তারই বহিঃপ্রকাশ নুহাশ পল্লী। মৃত্যু যে কত যশময় কীর্তিময় হতে পারে, গণমানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে তার প্রমাণ দিয়েছেন হুমায়ূন। তিনি আনন্দের নিত্যসঙ্গী। তার দেওয়া আনন্দ যুগ যুগ ধরে চির জাগরূক হয়ে থাকবে।
আবৃত্তিকার রণজিৎ রক্ষিত বলেন, হুমায়ূন শুধু সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, তিনি বহুমাত্রিক কারিগর। তিনিই একমাত্র সৃষ্টিশীল মানুষ, যিনি দুঃসময়ে টিয়া পাখির মুখ দিয়ে বলাতে পেরেছিলেন ‘তুই রাজাকার’।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগষ্টের পরে যখন বাংলাদেশের সব কিছু একের পর এক নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছিল সেই দুঃসময়ে হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আশা সঞ্চার করেছিলেন।
অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা কমরেড শাহ আলম, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ হায়দার, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অশোক দাশ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসাইন কবির, চট্টগ্রাম নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মাজহারুল হক শাহ, শিক্ষক সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ লকিতুল্লাহ, নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি সঞ্চিতা দত্ত, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সদস্য সাইফুল আলম, শিল্পী সুজিত রায়, আমেরিকা প্রবাসী কামাল উদ্দিন রহমান পেয়ারু, ওস্তাদ স্বর্ণময় চক্রবর্তী, আবৃত্তিকার অঞ্চল চৌধুরী ও রাশেদ হাসানের সঞ্চালনে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন শোকসভা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবি কামরুল হাসান বাদল।
অনুষ্ঠানে শোকসংগীত ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে...’ পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কাবেরী সেনগুপ্তা। এ ছাড়া অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠে হুমায়ূনের গান ‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছ নাকি’ এবং আলাউদ্দিন তাহের কণ্ঠে ‘ও কারিগর দয়ার সাগর ওগো দয়াময়’ ছিল চমৎকার।
নাগরিক শোকসভা উপলক্ষে কামরুল হাসান বাদলের সম্পাদনায় স্মারক প্রকাশনা ‘মেঘের ওপর বাড়ি’ প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ সময় : ১৯৫৫ ঘণ্টা, আগস্ট ০৩, ২০১২
এআরএম/ সম্পাদনা : সুকুমার সরকার, কো-অর্ডিনেশন এডিটর
kumar.sarkerbd@gmail.com