 |
মনে নেই ঠিক দিনটা... মনে হয়, হয়ত জন্মান্তরেরও আগে দেখেছিলাম স্বপ্নটা… কিংবা হয়তো বোধের কালের শুরু থেকেই এই চেতনা আমার মজ্জাগত... স্বপ্নটা বলি? এক শেষ না জানা লাল মাটির পথ, সবুজের তীব্রতায় প্রায় নীল হয়ে ওঠা পাইন গাছের সারি তার দু’ধার জুড়ে। হয়ত তার শেষে আছে স্ফটিক স্বচ্ছ জলের নদী! আমি সে পথে হাঁটছি... চিত্রকল্পে পাশে কাউকে পেতেই ভালো লাগে। কি আশ্চর্য! তার অবয়ব পূর্ণতা পেতে চায়না। এ আমার ভাবনার বড় দীনতা! কত চাইলাম একটি মুখ বসাতে, আজ অবধি পারলাম কই? সে পথে হাঁটছি তো হাঁটছিই... ফুরোয় না, ফুরোতে চায় না... আমার কিন্তু ভালোই লাগে হাঁটতে... এই যে হাঁটছি, কত কিছু ফেলে যাচ্ছি, কত কী জমাচ্ছি জীবনের স্মৃতি করে! কিছু ভুলছি, কতক ভুলতে চাইছি... যা ভালবাসি তার সঞ্চয়ে পুলক কুড়াচ্ছি। এই তো জীবন!
কলেজে একবার যেমন খুশি তেমন সাজোতে ডাক হরকরা সেজেছিলাম। কি উত্তেজনা আমার! তারচেয়ে বেশি আমার মা’র। পুরস্কারও জুটলো বটে! তারপর ভুলে গেলাম রঙিন থেকে রংহীন হয়ে ওঠা জীবনের পথে চলতে গিয়ে... মাঝে মাঝে মনে হয়, পারতাম যদি হতে সত্যি এক ডাকপিয়ন! কি মজাই না হতো! প্রেমিক প্রবরের প্রেম নিবেদন থেকে চাকরি প্রাপ্তির খবর স-ও-ব যেত আমার হাত বেয়ে। অপূর্ণতা আর আশাহীনতার খবরও থাকত বটে! এ বেলা সে ভাবনা থাক!
হাওয়াই মিঠাই ভীষণ টানতো আমায়! খাওয়ার চেয়ে তার ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ই বুঝি টানতো বাশি... ফুরিয়ে যাওয়াকে এতো কেন ভয় পেলাম অর্থহীন এই জীবনে? তাই জন্যই কি আইসক্রিম বা চকোলেটের দোকানদার হওয়ার চেয়ে টাকা জমিয়ে আস্ত একটা হাওয়াই মিঠাই মেশিনই কিনে ফেলতে চেয়েছিলাম! যাতে শুধুই গড়তে পারি?
কত এলোমেলো আর অগোছালো আমার ভাবনারা! এই তা লাল মাটির পথ বেয়ে চলছে তো এই উড়ে গেলো কাশ্মিরের আকাশে... শাদা শাদা মেঘ ধরতে... কিংবা রাতের ডাল্ লেক-এ ভাসমান কাঠের ঘরের বারান্দায় আমায় নিয়ে দাঁড় করালো চাঁদের মুখোমুখি... বড্ড হতচ্ছাড়া, নচ্ছাড় এ মন! আচ্ছা, ভাবনাগুলো কি এমনই হয়? সবারই? কি জানি!
মনকে শুধাই, ‘মন তুমি কার?’ ও হাসে। বলে, ‘আমি কি তোমারও?’ এ কেমনতরো কথা হলো হে বাপু! আমার মন আমার নয়! কেনরে? এক মন এক জনমে নিজেকেই নাগাল পেতে দেয় না কেন? কেন তার মেঘের বাড়ি, কেনই বা তার শূন্যে ছড়াছড়ি...
আমার সোনারঙিন বিকেলগুলোকে হারিয়ে ফেলছিলাম কি নিদারুণ অবহেলায়! কাজ, বাস্তবতা আর ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে। বিকেলগুলো এলো সেদিন আমার জানুতে নত হয়ে। কাতর গলায় বলল, ‘তুমি এমন কেন রাণী? কি দেইনি তোমায়? সব পেয়ে যাওয়ার নিদাম ক্ষণ, স্কুল ফেরার পথে ‘‘বিশেষ’’ হয়ে ওঠা পাড়ার ওই নিতান্ত সাধারণ কিশোরের তোমায় দেখার তৃষ্ণার মুহূর্তটুকুন অথবা পড়ার টেবিলে বইয়ের নিচে হুমায়ূনকে পাওয়ার চেষ্টা... সবই তো দিয়েছি! তবু কেন হেলায় তুচ্ছ করলে গো!’ বুঝলাম, কি ভুলটাই না করে যাচ্ছি কত মহাকাল ধরে! বৃদ্ধ হচ্ছি কেবল... বড় আর হতে পারছি না... মনকে তো পাই না... তাই বিকেলগুলোকে আশ্বস্ত করলাম, তাদের আমি হবো! সে পথ বেয়ে মনকেও হয়তো পাবো কখনো! হয়তো তা বন্দী আছে কোনও এক মায়াবী জাদুকরের কালো বাক্সে। কোনও একদিন বন্দী সে মনটা আকাশে উড়াল দেবে স্বপ্নের বিশাল ফিনিক্স পাখিটা হয়ে... স্বপ্ন দেখতে তো আর বারণ নেই...
বাংলাদেশ সময়: ১৫৫১ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১২
সম্পাদনা: তানিম কবির