 |
ঢাকা: উত্থান-পতনের দিক থেকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাজার বলে টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি গত ২ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ৫৫ শতাংশ কমে যায়। যদিও সে দেশের মানুষ ডিএসইর সূচক গত ৫৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উঠতে দেখেছে। এছাড়াও গত ১২ মাসের বেশি সময় ধরে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পোশাক শিল্পের বিকাশ গড়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। দ্রত উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে ২০০৫ সালে ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ বাংলাদেশকে ‘নেক্সট ১১’-এর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে যা তালিকায় ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সঙ্গে জায়গা করে নেবে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে ‘নাটকীয় উত্থান’ এবং ‘দ্রুত পতন’ নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য অশনীসংকেত বলে প্রতিভাত হয়েছে। যদিও এই বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুতবর্ধমান অভ্যন্তরীণ মূলধনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার হুমকির ব্যাপারে মোটেও সচেতন নয়।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ২৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। যাদের মাসিক আয় প্রায় ৪০ ডলার। যা দক্ষিণ চীনের তৃতীয় শ্রেণীর মজুরি হিসেবে বিবেচিত হয়। মজুরি কম হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বের পোশাক শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক শিল্প থেকে আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো টাকা (রেমিট্যান্স) বাংলাদেশের ৩৬টি ব্যাংকে জমতে থাকে। যার অধিকাংশ ব্যাংক নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত, ছোট এবং যাদের পেশাগত দিক ততোটা মজবুত নয়। যখনই মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে তখনই ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে আসতে শুরু করে এবং গ্রাহকদের আমানত বিনিয়োগ করে অধিক রিটার্ন পেতে শুরু করে। তখন থেকেই ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারের বড় বিনিয়োগকারীতে পরিণত হয়।
এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট ঋণের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা।
যেহেতু ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিল তাই পুঁজিবাজারের সূচকও ছিল সেসময় আকাশচুম্বি। প্রাপ্ত তথ্য মতে ২০১০ সালেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সাধারণ সূচক বাড়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি। এ ধরনের বৃদ্ধির ফলে বাজার সম্পর্কে জানে না এমন স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারী এবং কিছু জানাশোনা আছে এমন বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসতে থাকে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিও একাউন্টধারীর সংখ্যা ৫ লাখ থেকে ৩৫ লাখে পৌঁছোয়। সে সময় যারা বাজারে আসছিল তাদের কারও বাজার সম্পর্কে কোনও জ্ঞান ছিল না এবং বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তাই বাজারে এসেই সবাই শেয়ার কেনা শুরু করে।
আকস্মিকভাবে পুঁজিবাজারে এ ধরনের বৃদ্ধি থমকে দাঁড়ায়। ২০১০ সালের শেষের দিকে দেশের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের রশি টেনে ধরলো। যার ফলে বাজার থেকে ব্যাংক তাদের বিনিয়োগ উঠিয়ে নিল। ফলে গত বছরগুলোতে বাজার যা বেড়েছিল ২০১০ সালে তা পড়ে যায়। আর এখন শেয়ারবাজার পতনের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিলতার মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১২